বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিসহ অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে রাজনৈতিকভাবে দাবি জানাচ্ছে, একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য। যাতে নির্বাচন সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এবং সুষ্ঠু হয়। কিন্তু সরকার বিষয়টি এখনো আমলে নেয়নি। তারা বলছে, সংবিধানে সেই সুযোগ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সুযোগটা মূলত কীসের ওপর নির্ভর করে? ইতিপূর্বে দেখা গেছে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি অটল রয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত একটা রাজনৈতিক সমাধানে আসা উচিত। আমাদের সবারই দায়িত্ব রয়েছে, দেশের মানুষকে শান্তি ও স্বস্তিতে রাখার। বিশেষ করে, সরকারকে এই দায়িত্ব বেশি নিতে হবে। কারণ হচ্ছে, তারাই দেশের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছেন। তাদের সেই সুযোগও রয়েছে।
বর্তমান সরকার চাইলেই কিন্তু একটা নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে পারে। এটা তো জটিল কিছু না প্রয়োজন হলে, তারা সংবিধান পরিবর্তন করবেন। সংসদে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের রয়েছে। এটা কোনো বিষয়ই না। আসলে এ নিয়ে সদিচ্ছা থাকতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে, দেশের সার্বিক কল্যাণের জন্যই একটি সর্বজনীন রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। এটাতো ঠিক দেশের অধিকাংশ মানুষ একটা গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। কারণ গত ১৫ বছর ধরে, শুধু সংসদ নির্বাচন নয়, স্থানীয় সরকারসহ অন্য যে সমস্ত নির্বাচন হয়েছে সেসব নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ব্যাপক কারচুপির। সোজা কথায় বলতে গেলে, ভোট দখল করে ঐ নির্বাচন হয়েছে। এভাবে দেশটাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, এখন আর কোনো নির্বাচন হয় না। বিশেষ জায়গা থেকে নির্দেশনা পাঠানো হয়। এরপর সেই অনুযায়ী তৈরি হয় ভোটের ফল। অথচ একসময় উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হতো।
মানুষ যখন জনগণের রায় পেয়ে নির্বাচিত হন, তখন ভোটারদের প্রতি একটা কমিটমেন্ট থাকে। এখন কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই কমিটমেন্টটা নেই। এর ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক এবং সামাজিক একটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যে কারণে বলি, ভোট সবসময়ই নিরপেক্ষ হওয়া দরকার। প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভয়ংকরভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। এই তারাই দীর্ঘ ১৫ বছর বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। ফলে সেই প্রশাসন, সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে বর্তমান সরকারের অধীনে কোনোভাইে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ তারাই চাইবে, বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে। নির্বাচনে তারা প্রভাব বিস্তার করবে। নির্বাচন কেন্দ্র থেকে শুরু করে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই নিজেদের মতো করে সাজাবে। যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়া উচিত। চলতি অক্টোবরেই যদি সংসদে একটি বিশেষ বিল পাস করা যায়, তাহলেই তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়। আমরা সাম্প্রতিককালে লক্ষ করছি, বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দল যখন ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সমাবেশ করেছে, তখন বর্তমান সরকারি দলও একই সময়ে শান্তি সমাবেশ করেছে। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমনটি আগে দেখিনি। এখন তা শুরু হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। গণতন্ত্রের জন্য বিষয়টি কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি কখনো দেখিনি। এখন এটি শুরু হয়েছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের পর, ঘরে ঘরে রাজনৈতিক বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এরকম তো আগে কখনো হয়নি, তাহলে! শুধু গ্রামে না, দেশের সর্বত্রই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিভক্তি। একইসঙ্গে এই বিভক্তি, প্রশাসনেও। যারা বর্তমান সরকারের সমর্থক নয়, তারা বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্যই একটি সমাধান দরকার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে সুষ্ঠু ভোট এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি গণবান্ধব নেতৃত্ব তৈরির উদ্দেশে। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তানি জান্তারা সেটি মানেনি। ফলে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা গণতন্ত্র, সাম্য এবং মানবাধিকার এখন কথার কথা। সে কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রথম কাজ হচ্ছে, মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। একটি জরিপে দেখলাম সংসদে প্রধানমন্ত্রীর স্তুতি করতেই সংসদের ২০ ভাগ সময় চলে গেছে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের অর্থ খরচ করে কিন্তু সংসদ চলে। এর মানে হচ্ছে, এই অর্থ জনগণের। অথচ এমনটি তো হওয়ার কথা ছিল না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে, সাংবাদিকরা যে কোনো সমালোচনা করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীও হাসিমুখে সেই প্রশ্নের উত্তর দেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে সংবাদ সম্মেলন হয়, সেখানে শুধু তার প্রশংসা। কোনো যৌক্তিক সমালোচনা করার সাহসও কারও নেই। অথবা সেই সাহস তারা হারিয়ে ফেলেছেন। আগে তারা প্রধানমন্ত্রীর ৫-১০ মিনিট প্রশংসা করবেন, তারপর একটি প্রশ্ন করবেন। যদি কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করেনও, সেটি একেবারেই নির্দোষ একটি প্রশ্ন। যাতে প্রধানমন্ত্রীর ন্যূনতম মন খারাপ না হয়। সেখানে তাদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়, যারা বর্তমান সরকারের আস্থাভাজন বা উচ্ছিষ্টভোগী। খুব সতর্কভাবে তালিকা করে, সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিরোধী মতের বা স্বাধীন মতের কোনো সাংবাদিক কি সেই সম্মেলনে আমন্ত্রণ পান? এসব কিন্তু সাংবাদিকতার জন্যই ক্ষতিকর। আসলে সাংবাদিকদের কী ধরনের প্রশ্ন করা উচিত, তারা কী করছেন এটা লক্ষ করলেই পরিষ্কার হওয়া যাবে। এখন সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে পুকুরে সাঁতার কাটতে বলা হচ্ছে। এই রকম পরিস্থিতি গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর অশনি সঙ্কেত।
তারা দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা ভাববেন, মানুষের গণতান্ত্রিক চাওয়াকে উপলব্ধি করবেন এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নের কথা ভাববেন। কিন্তু এখন কি তাই হচ্ছে? এটা নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতে, শান্তিপূর্ণ রাজনীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এ রকম একটা অবস্থায় কোনোভাবেই দলীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। এখন ভয়ের সংস্কৃতির উত্থান হচ্ছে। শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কেউ যে কিছু বলবে, সেই সৎসাহস হারিয়ে ফেলেছে। দেশ থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। বর্তমানে এই অঙ্ক আরও বেড়েছে। এটা আগের হিসাব। এখন তো দুর্নীতির মচ্ছব চলছে। প্রায় সব ব্যাংক ফোকলা করে ফেলা হয়েছে। সেই টাকা দেদার পাচার হচ্ছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট। সেখানে দেশের প্রচুর টাকা নষ্ট হয়েছে। এখন যত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে, সব তো ঋণের টাকায়। আগামী বছর থেকে এই সব ঋণের টাকার সুদ দিতে হবে। ছোট্ট একটা দেশ আমাদের। এর মধ্যেই ১৮ কোটি মানুষ। তখন দেশের অর্থনীতির যে কী অবস্থা দাঁড়াবে, সেটি ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। মনে হচ্ছে শ্রীলঙ্কায় যে অবস্থা হয়েছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা হবে। যে কারণে আমি বারবার বলব, বর্তমান সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা মেঠো বক্তৃতা বাদ দিয়ে, মূল সমস্যা সমাধানের পথে হাঁটবেন। মনে রাখতে হবে, আমাদের হাতে কিন্তু একদম সময় নেই। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দিনশেষে কিন্তু আমরা আমাদেরই। সেটা আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি হোক। দেশটা তো আমাদের। আমরা যাতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারি, সেই চেষ্টা সবারই করা উচিত। একটি বিষয় খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং লজ্জার যে, আমাদের ‘স্যাংশন’ খেতে হয়। বুঝে নিতে হবে, দেশের অবস্থা কোন পর্যায়ে গেলে এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়? রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এমন কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যদি বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অনতিবিলম্বে মেনে নেয়, তাহলে ভালো। না হলে, এ মাসেই নিশ্চিতভাবেই গণঅভ্যুত্থান হবে। কারণ যা হওয়ার এই মাসেই হবে। আমি মনে করি না, এই দাবিকে উপেক্ষা করে সরকার কিছু করতে পারবে।
সামনের মাসেই নিয়মানুযায়ী ইলেকশন শিডিউল ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু তারা পারবে বলে মনে হয় না। নিঃসন্দেহে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই সরকারের পতন হবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে জনগণের সরকার।
লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব