প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের বেশিরভাগ আর ফিরে আসেন না। সম্প্রতি এ প্রবণতায় যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। অনেকে পিএইচডি বা উচ্চতর ডিগ্রির জন্য শিক্ষা-ছুটি নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর ফেরেন না। কেউ ফিরে এলেও কিছুদিনের মধ্যে আবার বিদেশে চলে যান। বিদেশে চলে যাওয়ার বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ আঁকড়ে থাকেন। তারা আসলে অন্যদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করছেন।
কেন মেধাবী শিক্ষকরা দেশ ছাড়ছেন, এ প্রশ্নের উত্তর অনির্দিষ্ট। যারা শুধু শিক্ষকতা আর নিজেদের গবেষণা নিয়ে থাকতে চান, দেশে তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনীতিতে না জড়ালে তাদের পদোন্নতি ও বিভিন্ন দায়িত্ব পেতে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। মেধাবী শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় নগণ্য। এটা তাদের বিদেশমুখী হতে আকৃষ্ট করে। আমাদের দেশের অনেক মেধাবী শিক্ষক বিদেশের ল্যাবে বসে উন্নতমানের গবেষণা করছেন। এর প্রতিফলন বিশ্বের নামকরা অনেক বিজ্ঞান সাময়িকীতে দেখা যায় প্রায়ই।
এমন পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার দেশে প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৩’। ইউনেসকো এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘কাক্সিক্ষত শিক্ষার জন্য শিক্ষক : শিক্ষকস্বল্পতা পূরণ বৈশ্বিক অপরিহার্যতা’।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেধাবীদের ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কম। ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটিজও ভালো নয়। আমি বলব, মেধাবীদের ধরে রাখতে দুটি কাজ করা জরুরি। প্রথমত শিক্ষক নিয়োগের ক্রাইটেরিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। পিএইচডি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ করা যাবে না। তাদের বেতন-ভাতাও বেশি হবে। এতে যে আসবে সে সিদ্ধান্ত নিয়েই আসবে। ফলে সে আর বিদেশে যাবে না। দ্বিতীয়ত শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো চালু করতে হবে।’
ইউজিসির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২৪৫। ওই বছর কর্তব্যরত ছিলেন ১১ হাজার ৬৯১ জন। বাকি ৩ হাজার ৫৫৪ জন অনুমোদিত বা অনুমোদন ছাড়া ছুটিতে ছিলেন। সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ১০৬ জন ছিলেন শিক্ষা-ছুটিতে। ৮৫ জন প্রেষণে বা লিয়েনে, বিনা বেতনে ৯২ জন, অনুমোদন ছাড়া ছুটিতে ৬৪ এবং খ-কালীন, চুক্তিভিত্তিতে বা অন্যভাবে বিভিন্ন জায়গায় ছিলেন ১ হাজার ১৯৮ জন।
ইউজিসি সূত্র জানায়, শিক্ষা-ছুটিতে থাকা শিক্ষকরা মূলত বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য গিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৪৮৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ৩২৯ জন ছিলেন শিক্ষা-ছুটিতে। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ১৬৪, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৬, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০২, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৮, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৭, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৪, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২ জন।
অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আমাদের দেশে একজন প্রভাষকের মূল বেতন ২২ হাজার ও অধ্যাপকের ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা। অধিকাংশ দেশেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রভাষকের পদ নেই। তাদের শুরু সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। ভারতে সহকারী অধ্যাপকদের বেতন স্কেল ৫৫ হাজার ও অধ্যাপকের ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। পাকিস্তানে সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন ১ লাখ ৪ হাজার ও অধ্যাপকের ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। শ্রীলঙ্কায় সহকারী অধ্যাপকের বেতন স্কেল ১ লাখ ৫ হাজার ও অধ্যাপকের ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। নেপালে প্রভাষকের বেতন স্কেল ২৮ হাজার আর অধ্যাপকের ৬৫ হাজার টাকা। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন আরও কয়েকগুণ বেশি। সম্মানেও তারা এগিয়ে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই নয়, আমাদের দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষকরাও বেতন-ভাতা ও মর্যাদায় পিছিয়ে আছেন। প্রাথমিকের সাড়ে তিন লাখ সহকারী শিক্ষক এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মর্যাদা পান। আর মাধ্যমিকের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলেও সেখানে সরকার শুধু মূল বেতন দেয়। তারা বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য সুবিধা পান না। অনেক নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।