জ্বালানি প্রতীকী হস্তান্তর নিয়ে রূপপুরে উৎসব

বাংলাদেশের জন্য আজ এক স্মরণীয় দিন। নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সনদ এবং প্রতীকী ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্রেশ ইউরেনিয়াম ফুয়েল’ গ্রহণ করবে বাংলাদেশ।

রাশিয়া থেকে আনা পারমাণবিক জ্বালানি বিশেষ বিমানে ঢাকায় আসার পর গত ২৯ সেপ্টেম্বর তা কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় রূপপুর প্রকল্প এলাকায়। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিও ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশনের (রসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ সশরীরে উপস্থিত থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের কাছে পারমাণবিক জ্বালানির মডেল হিসেবে প্রতীকী ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করবেন। এ ছাড়া আইএইএর পক্ষ থেকে একটি সনদ দেওয়া হবে বাংলাদেশকে।

ইউরেনিয়াম সনদ ও প্রতীকী ইউরেনিয়াম হস্তান্তর অনুষ্ঠানকে সফল করতে রূপপুরে অবস্থান করছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।

গতকাল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) ২ শতাংশ অবদান রাখবে। সঞ্চালন লাইনসহ অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পরই পরীক্ষামূলক শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন। উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগণ এ প্রকল্প থেকে উপকৃত হবে।

এর আগে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর এত বড় প্রাপ্তি এর আগে বাংলাদেশে হয়নি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৩৩তম পারমাণবিক দেশের মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

এটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় পাওয়া উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এককভাবে নয়, সারা দেশের মানুষ এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যেভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে, সেজন্য আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। দেশের মানুষের সহযোগিতার কারণেই আজ আমরা এ প্রকল্প পরিসমাপ্তির দিকে নিয়ে যেতে পেরেছি।’

প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবর বলেন, ‘এ প্রকল্পের প্রতিটি যন্ত্র সর্বোচ্চ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে নকশা অনুযায়ী বসানো হয়েছে। এজন্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সনদ নিতে হয়েছে এবং কাজের মান দেখে তারা ইতিমধ্যে সন্তোষও প্রকাশ করেছে।

ইউরেনিয়ামের আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের আয়োজন ঘিরে ঈশ্বরদীতে প্রকল্প এলাকায় উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। এ উৎসবের ছোঁয়া লেগেছে পুরো পাবনায়। সর্বত্র সাজ সাজ রব। বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে রূপপুর প্রকল্প ও গ্রিনসিটি এলাকা। আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণে ঐতিহাসিক এই ক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে চাইছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে ঈশ্বরদীতে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ, বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে রূপপুর জুড়ে প্যান্ডেল নির্মাণ, ফেস্টুন টানানো, দেয়াল অঙ্কনসহ নানা সাজসজ্জা করা হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন চলছে রূপপুর প্রকল্প থেকে গ্রিনসিটি পর্যন্ত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন আয়োজন।

রূপপুর গ্রিনসিটি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সামনের দেয়ালে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে নানা ধরনের চিত্রকর্ম।

চিত্রশিল্পী টিপু সুলতান বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হবে বলে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, সেসব ভ্রান্ত ধারণা পাল্টে দিতেই আমার এ চেষ্টা। প্রকল্পের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো প্রভাব পড়বে না, সে বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের দেশের অর্জনগুলো এ চিত্রকর্মে স্থান পেয়েছে।’

ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মিন্টু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে সব বাধা পেরিয়ে রূপপুর প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের পথে। চালু হওয়ার আগেই আমাদের এলাকার মানুষ এর সুফল ভোগ করছে। রূপপুর তথা ঈশ^রদীবাসীকে প্রধানমন্ত্রী সারা বিশ্বের ইতিহাসের গৌরবে স্থান দিয়েছেন। আমরা গর্বিত, কৃতজ্ঞ।’

১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচের এ প্রকল্পে ৯০ ভাগ টাকা ঋণ দিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কয়েকটি চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রুশ ঠিকাদার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি এটি পরিচালনার জন্য জনবলও তৈরি করে দিচ্ছে রাশিয়া।