ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। একজন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন, আরেকজন গত দুই আসরের রানার্সআপ। ২০১৯ বিশ্বকাপ আসরের পর দল হিসেবে ক্রিকেট খেলার ধরনই বদলে দিয়েছে দলটি। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ইংলিশদের টেস্ট দলের কোচ হয়ে আসার পর উপহার দেন বাজবল দর্শন। সেটির ছোঁয়া লাগে ইংলিশদের বাকি সব খেলাতেও। টি২০ স্বভাবতই মারকাট খেলা। তার পাশাপাশি ওয়ানডেতেও বিশ্ববাসী এখন উপভোগ করে ইংলিশ ব্যাটারদের তান্ডব।
ইয়ন মরগানের অবসরের পর ইংল্যান্ড বোর্ড তাদের ওয়ানডে ও টি২০ ফরম্যাটের নতুন অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেয় জস বাটলারকে। অধিনায়ক হিসেবে জস বাটলার বেশ ধীরস্থির প্রকৃতির এবং পরীক্ষিত। তার প্রমাণ তিনি রাখেন ওই বছরই, টি২০ বিশ্বকাপে। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত সেই আসরের ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে টি২০ ফরম্যাটে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ বাড়ি নিয়ে আসেন বাটলার। জস বাটলারের ওয়ানডে অধিনায়কত্ব শুরু আমস্টারডামে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয় দিয়ে। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত বাটলার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভার সামলে চলেছেন দলটির। তার অধীনে ইংল্যান্ড ওয়ানডে ফরম্যাটে এতটাই শক্তিশালী যে কাকে ছেড়ে কাকে একাদশে খেলাবেন তাই নিয়ে পড়তে হয় দ্বিধায়। বেন স্টোকসের ফিরে আসা, জেসন রয়ের বদলে হ্যারি ব্রুকের স্কোয়াডে ঢোকা এমন সব মধুর বিড়ম্বনা ইংল্যান্ড শিবিরে। সব কিছু পাশ কাটিয়ে গত বিশ্বকাপ জয়ের সুখস্মৃতি নিয়ে এবারের আসর শুরু করছে ইংল্যান্ড। ডাভিড মালান, জনি বেয়ারস্টো, হ্যারি ব্রুকের পাশাপাশি ইংলিশ ভক্তরা তাকিয়ে থাকবে অধিনায়ক জস বাটলারের ব্যাটের দিকে।
গত আসরের ফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ডের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান আসে বাটলারের ব্যাট থেকে। সেই ম্যাচে ৬০ বলে ৫৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। পঞ্চম উইকেট জুটিতে বেন স্টোকসের সঙ্গে বেঁধেছিলেন ১১০ রানের জুটি। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের পথে ওই জুটির মাহাত্ম্য ছিল অপরিসীম। পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যাট হাতে জ্বলে উঠেছেন বাটলার। কিউইদের বিপক্ষে ২৪ ম্যাচে ৪১ গড়ে ৭৩৮ রান করেছেন তিনি। স্ট্রাইক রেট চোখে লাগার মতো, ১২৭.২৪। ৪টি হাফসেঞ্চুরির সঙ্গে আছে একটি সেঞ্চুরি। ২০১৫ সালে এজবাস্টনে মাত্র ৭৭ বলে ১২৯ রানের ঝড়ো ইনিংসটি খেলেছিলেন।
বাটলার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের খুব পরিচিত মুখ। আইপিএলে এখন তিনি খেলছেন রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে। সেই সুবাদে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের আবহও তার জানা। এই মাঠে ৩ ম্যাচে ৭২.৫০ গড়ে তার রান ১৪৫। হাঁকিয়েছেন একটি সেঞ্চুরিও।চার বছর আগের বাউন্ডারি গণনার নিষ্ঠুর নিয়মের বলি হয়ে, না হেরেও হার মেনে নিতে হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের। বিশ্বকাপ ফাইনাল তার আগের ২০১৫ আসরেও হেরে গিয়েছিল তারা। তবে ২০১৯ আসরে ইংল্যান্ডের ওই জয় প্রসঙ্গে জো রুট বলেছিলেন, ‘ওই বিশ্বকাপ জেতার কোনো অধিকার আমাদের ছিল না। কিন্তু সেটিই এই জয়টিকে আরও মধুর করে তুলেছে।’ ইংলিশদের ওই মধুর অভিজ্ঞতা এতদিন বিষের মতো ঠেকার কথা কিউইদের। সেগুলো ভুলিয়ে, গত চার বিশ্বকাপে টানা সেমিফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতাকে পাথেয় করে আজ মাঠে নামবে নিউজিল্যান্ড।
ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড এ পর্যন্ত ৯৫টি ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয়েছে। তাতে ইংলিশদের ৪৫টি জয়ের বিপরীতে কিউইদের জয় ৪৪টি। ২টি খেলা টাই হয়েছে, ফল আসেনি ৪টি ম্যাচের। বিশ্বকাপের মঞ্চেও দুই দল সমানে সমান। ১০ ম্যাচে উভয়ের জয় ৫টি করে। তবে আজকের ম্যাচে কিউইদের জন্য ইংলিশদের বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইনআপের লাগাম টেনে ধরাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ উতরাতে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে হবে ট্রেন্ট বোল্টকে।
এমনিতেই এই ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনকে পাচ্ছে না কিউইরা। একাদশে দেখা যাবে না অভিজ্ঞ পেসার টিম সাউদিকে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেন্ট বোল্টের সঙ্গে ম্যাট হেনরি আর লকি ফার্গুসনকে দেখা যেতে পারে কিউই পেস ডিপার্টমেন্টে। নতুন বলে বর্তমান বিশ্বের সেরা বোলারদের একজন হলেন ট্রেন্ট বোল্ট। নতুন বলে বাঁহাতের সুইং জাদুতে খেলার শুরুতেই উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারেন তিনি। ৩৪ বছর বয়সী বোল্টের এটি তৃতীয় বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের আসরগুলোতে তার নামের পাশে আছে ৩৯টি উইকেট। ইকোনমি রেট ৪.৬২। সেরা পারফরম্যান্স ২৭ রানে ৫ উইকেট।
ইংলিশদের বিপক্ষে ট্রেন্ট বোল্ট কিউই জার্সি গায়ে খেলতে নেমেছেন ১৪ বার। ২৭ বার ইংলিশ ব্যাটারদের সাজঘরে ফিরিয়েছেন তিনি। তবে বোল্টের মনে কিছুটা দুঃখ থাকার কথা গত বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে। ওই ম্যাচে ৬৭ রান খরচা করে ১০ ওভার বল করেও কোনো উইকেট পাননি তিনি। গত মাসেই ইংল্যান্ড সফরে ওদের বিপক্ষে বোল্টের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকারের জ্বলজ্বলে স্মৃতি আশার পালে হাওয়া লাগাবে। আইপিএলের সুবাদে ভারতের কন্ডিশন ট্রেন্ট বোল্টেরও চেনা। কিউইদের জার্সিতে একে অপরের প্রতিপক্ষ হলেও আইপিএলে বাটলার ও বোল্ট দুজনেই রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলেন। নরেন্দ মোদি স্টেডিয়ামে ৩টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে বোল্টের। নিয়েছেন ৩টি উইকেটও। এক সঙ্গে আইপিএলে দীর্ঘসময় কাটানোয় বাটলারের খুঁত বের করাটা সহজই হবে বোল্টের জন্য।
ট্রেন্ট বোল্টের এটিই হয়তো শেষ বিশ্বকাপ। নিউজিল্যান্ডের বাকি সব খেলোয়াড়ের মতো তিনিও চাইবেন শেষটা রাঙিয়ে যেতে। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরা অবস্থায় তোলা ছবিটি বড় করে নিজের ড্রইংরুমে সাজিয়ে রাখতে। সেই স্বপ্নপূরণের পথে প্রথম ধাপে আজকের ম্যাচে ইংলিশদের একাই কাবু করে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। তবে ঘটনা যাই ঘটুক, লড়াইয়ের মাঝের লড়াইটা জমে উঠুক এই দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের, ক্রিকেটভক্তদের মনের আকাক্সক্ষা এমনটাই।
ক্রিকেটের সবচেয়ে উত্তেজনার মঞ্চ ওয়ানডে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। চার বছরের অপেক্ষার পর ভারতের মাটিতে যা আবার বসতে যাচ্ছে আজ থেকে। এ পর্যন্ত পৃথিবী সাক্ষী হয়েছে ১২টি বিশ্বকাপ ফাইনালের। তার মধ্যে সবচেয়ে রুদ্ধশ্বাস ফাইনালটি ছিল ২০১৯ আসরের। প্রথাগত ৫০ ওভার এবং তারপর সুপার ওভারেও খেলার ফল না আসায় শেষ পর্যন্ত বাউন্ডারির হিসাবে নিউজিল্যান্ডকে কাঁদিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে তোলে ইংল্যান্ড। সেই স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে বিশ্বকাপের উত্তেজনার বারুদে আগুন লাগাতেই যেন এবারের আসর শুরু হচ্ছে এই দুই দলের খেলা দিয়ে। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে বেলা আড়াইটায় থ্রি লায়ন্সের সঙ্গে কিউইদের আরেকটি জমজমাট লড়াই উপভোগ করবে বিশ্ব। সেই সঙ্গে লড়াইটা জমে উঠবে জস বাটলার ও ট্রেন্ট বোল্টের মধ্যে।