টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দল দেশ ছাড়ার আগে থেকেই যে দুশ্চিন্তা সঙ্গী, ২০ দলের আসরের শেষ আটে জায়গা করে নিয়েই সেই দুশ্চিন্তা বিন্দুমাত্র কমেনি। ব্যাটিং নিয়ে, বিশেষ করে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের রান পাওয়া নিয়ে আশঙ্কাটা থেকেই যাচ্ছে।
ব্যাটিংটা যত ভোগাচ্ছে, ঠিক ততটাই আশা দেখাচ্ছে বোলিং। দুই তরুণ তুর্কি তানজিম হাসান সাকিব আর রিশাদ হোসেনের সঙ্গে অভিজ্ঞ মোস্তাফিজুর রহমান মিলে ব্যাটিং ব্যর্থতার ভর্তুকি দিয়েছেন গ্রুপ পর্বের ৪টা ম্যাচেই। বোলারদের সাফল্যই বাংলাদেশকে নিয়ে এসেছে সুপার এইটে, যে পথটাকে মাসখানেক আগেও মনে হচ্ছিল অসম্ভব।
বোলারদের মধ্যে শুরুতেই বলতে হয় তানজিম সাকিবের কথা। বিশ্বকাপের দল ঘোষণার সময় তানজিম সাকিব কেন, সাইফ উদ্দিন কেন নয় এই নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তরই দিতে হয়েছিল নির্বাচক কমিটিকে। মূল একাদশে তার জায়গাও ছিল অনিশ্চিত, শরিফুল ইসলামের হাতের চোট দুয়ার খুলে দেয় তানজিম সাকিবের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১ উইকেট, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩ উইকেট, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১ উইকেট নেওয়ার পর নেপালের বিপক্ষে ৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে তানজিম সাকিব হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের প্রধান বোলার। তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পাওয়ার প্লেতে উইকেট তুলে নেওয়া, যে জায়গাটাতে লম্বা সময় ঘাটতি ছিল বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে। নেপালের বিপক্ষে তার ২৪ ডেলিভারির ২১টিই ছিল ডট বল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও সাকিবের বোলিং থামিয়ে দিয়েছিল প্রোটিয়াদের বিস্ফোরক ব্যাটিং।
শুরুতে উইকেট নেওয়ার কাজটা সাকিব করছেন, মাঝে উইকেট তোলার কাজটা সেভাবে করে যাচ্ছেন রিশাদ। ৪ ম্যাচে তার ৭ উইকেট। শ্রীলঙ্কা ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দুই ম্যাচেই ৩-এর নামতা পড়ে নিয়েছেন ৬ উইকেট, সবগুলোই এসেছে ইনিংসের মাঝপথে। দুটো ম্যাচেই এই লেগস্পিনার নিজের প্রথম স্পেলে ছিলেন খরুচে। হয়তো উইকেটের গতি-প্রকৃতি বা ব্যাটসম্যানের ধরন বুঝতেই এই মূল্যটা চুকিয়েছেন রিশাদ। দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে এসে স্রেফ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ছিল একই ওভারে জোড়া শিকার। ডাচদের বিপক্ষেও তাই। যখনই প্রতিপক্ষ একটু চড়াও হতে চেষ্টা করে, যখনই রান-রেটটা বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টায় থাকে, তখনই রিশাদকে বোলিংয়ে আনেন অধিনায়ক আর রিশাদও যথার্থ প্রতিদান দেন।
আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে খেলে আসার পর দেখা যাচ্ছে অন্য এক মোস্তাফিজকে। ওয়াইড-ইয়র্কার করাটা রপ্ত করেছেন দারুণ ভাবে। ডেথ ওভারে কৃপণ বোলিং করে ছোট লক্ষ্যকেও কঠিন করে তুলছেন প্রতিপক্ষের জন্য। প্রয়োজনীয় সময়ে এনে দিচ্ছেন ব্রেক থ্রু। মোস্তাফিজ ৪ ম্যাচে নিয়েছেন ৭ উইকেট, ১৬ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ৫৪ রান, ওভারপ্রতি গড়ে রান দিয়েছেন মাত্র ৩.৩৭।
নতুন এবং পুরাতনের এই মোহনায় শেষবেলায় যোগ দিয়েছেন সাকিব আল হাসানও। প্রথম ৩ ম্যাচে বোলিং করলেও উইকেট পাননি সাকিব, নেপালের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে তার জোড়া শিকার। আগের ম্যাচে ব্যাটিংয়ে হাফসেঞ্চুরি, পরের ম্যাচে এক ওভারে ২ উইকেট নিয়ে ম্যাচটা শেষ করেছেন সাকিব। সুপার এইটের আগে বাংলাদেশের ‘সুপারম্যান’ ছন্দে ফিরছেন, এটাই সবচেয়ে স্বস্তির খবর।
গ্রুপ পর্বে ৪ ম্যাচের ৩টি জিতেছে বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে যাওয়া একমাত্র ম্যাচেও জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিলেন বোলাররাই। যেটা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগাতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা। সুপার এইটের তিন ম্যাচেও কি বোলাররা ধরে রাখতে পারবেন সাফল্যের এই ধারা? সামনে প্রতিপক্ষ আরও কঠিন, চ্যালেঞ্জটাও বেশি। সুপার এইটে হবে বোলারদেরও অগ্নিপরীক্ষা, সেখানে তাদের সাফল্য বা ব্যর্থতাই ঠিক করে দেবে আসরে কতটা এগিয়ে যেতে পারবে বাংলাদেশ।