যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপানসহ বিশ্বে ৩২টি দেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করছে। সেই তালিকায় এবার নাম লেখাল বাংলাদেশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জ্বালানি সনদ হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার ক্লাবের ৩৩তম সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি লাভ করল।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় জমকালো এক অনুষ্ঠানে জ্বালানি সনদ ও ইউরেনিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি ঢাকার গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মস্কো থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভিয়েনা থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি অংশ নেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ সশরীরে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তরের জন্য জ্বালানি সরবরাহের সনদ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের হাতে তুলে দেন। একই সঙ্গে তার হাতে জ্বালানি সরবরাহের একটি মডেল তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় পারমাণবিক জ্বালানি গ্রহণের মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সফল পরিণতি লাভ করেছে। আজ বাংলাদেশের জনগণের জন্য অত্যন্ত গর্বের দিন এবং আনন্দের দিন। আজ থেকে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের কাতারে শামিল হলো এবং বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী নিউক্লিয়ার ক্লাবের কার্যকর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলো। অচিরেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘পরমাণু শক্তি শান্তি রক্ষায় ব্যবহার করব। বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্রের সাধারণ ও সম্পূর্ণ নির্মূল এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তির বাস্তবায়নের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইনপ্রণয়ন করেছি এবং একটি স্বাধীন পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছি আমরা। এই কর্তৃপক্ষ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।’
বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘বন্ধুপ্রতিম রাশান ফেডারেশনের সরকার এবং জনগণের প্রতি, যারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে অসামান্য সহযোগিতা করেছিলেন এবং আমাদের এই স্বপ্নের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেজন্য কৃতজ্ঞতা।’
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ায় রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাশান ফেডারেশনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তারা আমাদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। রাশিয়ার সহযোগিতায় আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছি। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবলকে রাশান ফেডারেশন যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কাজ শুরু করেছিলেন। আইএইএকে ধন্যবাদ জানাই, আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করে যেতে চাই। বিশেষ করে রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ।’
‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ তারা আমাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। বন্ধুপ্রতিম ভারতেও আমাদের কিছু জনবলকে প্রশিক্ষণের জন্য আমরা সেখানে প্রেরণ করেছি,’ যোগ করেন শেখ হাসিনা।
সরকারপ্রধান বলেন, ‘২০১৭ ও ২০১৮ সালে আমি এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের কংক্রিট ঢালাইয়ের উদ্বোধন করি। ২০২১ ও ২০২২-এ এই কেন্দ্রের যথাক্রমে ইউনিট-১ ও ইউনিট-২-এর রি-অ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল স্থাপন করি। আজ এই কেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি সংযুক্ত হলো।’
তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের দুর্যোগে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে দিকটা খেয়াল রেখে এই প্ল্যান্টের ডিজাইন প্রণয়ন এবং নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। তা ছাড়া, ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য রাশান ফেডারেশনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। রাশান ফেডারেশন এসব ব্যবহৃত জ্বালানি তাদের দেশে ফেরত নিয়ে যাবে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে আগামীতে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। এই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার আরেকটি পদক্ষেপ।
পারমাণবিক শক্তি অর্জনে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, এই প্রকল্পে উভয় দেশেরই স্বার্থ রয়েছে এবং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় বিরাট অবদান রাখবে। শেখ হাসিনা সফলভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে তার বাবার কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, রাশিয়ার পরীক্ষিত বন্ধু বাংলাদেশ। সমতা ও সম্মান এই বন্ধুত্বের ভিত্তি। রাশিয়া শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে নয় প্রকল্পের পুরো সময়কাল সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতাও করে যাবে এবং জ্বালানিও সরবরাহ করে যাবে।
তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশের বর্ধনশীল অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পে সরাসরি ২০ হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ছাড়া অন্য অনেক কোম্পানি এই প্রকল্পে কাজ করছে। সেটাও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখছে।
পুতিন বলেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৪ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৬ সালেই উৎপাদনে আসবে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশ পূরণ করবে। এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে। ফলে দেশের পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করে বলেন, ‘বিশেষ এই মুহূর্তটির জন্য আমরা অনেক দিন অপেক্ষায় ছিলাম। এটি শুধু পাবনার জনগণের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্য একটি উৎসব। আজকে আমরা জ্বালানি ডেলিভারি সনদ গ্রহণ করেছি। যার মাধ্যমে বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের অর্জনের স্বীকৃতি মিলল। বাংলাদেশের মানুষ তাদের জীবনযাত্রায় প্রাণচঞ্চল এবং বর্ণিল। এ ঘটনাটিকে আমরা বর্ণিলভাবে উদযাপন করছি। পুরো জাতির মধ্যেই আজকে উৎসবের আমেজ।’
এর আগে রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচিতি তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক পরমাণুবিজ্ঞানী ও প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আলী হোসেন।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে প্রথমবারের মতো দেশে আসে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম। পরদিন কড়া নিরাপত্তায় সেই জ্বালানি পাঠানো হয় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে। যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই সেখানে ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ করা হয়। গতকাল বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক জ্বালানি বুঝিয়ে দেয় রাশিয়া। সেই সঙ্গে দেশটি বাংলাদেশের কাছে জ্বালানি সনদ হস্তান্তর করেছে। এর ফলে রূপপুর এখন প্রকল্প থেকে পারমাণবিক স্থাপনায় উন্নীত হয়েছে। স্থাপনাটি এখন আইএইএর পুরোপুরি নজরদারির আওতায় এলো।
জ্বালানি সনদে বলা হয়েছে, সব নিরাপত্তা মানসম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করে জ্বালানি হস্তান্তর করা হয়েছে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য জ্বালানি প্রস্তুত করেছে রাশিয়ার নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্ট (এনসিসিপি), যা রসাটমের জ্বালানি ডিভিশনের অধীনে একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সক্রিয় নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে জ্বালানির প্রস্তুত ও পরিবহন কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান রাশিয়া থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন সূত্রমতে, পারমাণবিক জ্বালানি গ্রহণের পরই নির্মাণাধীন রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি আইএইএর নজরদারির মধ্যে চলে এসেছে। প্রথম চালানের জ্বালানি রূপপুরে পৌঁছানোর পর এর সংখ্যা গণনা ও অন্যান্য নিরীক্ষার পর তা আইএইএকে জানানোর পর তাদের সিলগালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ কক্ষে। এখান থেকে জ্বালানি অন্যত্র নেওয়ার ক্ষমতা আর বাংলাদেশের নেই। পরে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আইএইএর অনুমতি নিতে হবে। বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী আন্তর্জাতিক ওই সংস্থাটির অনুমতি ছাড়া রূপপুরের ওই এলাকায় প্রবেশেরও কোনো সুযোগ নেই।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আগে সারা বিশ্বে নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দিন দিন এটি নিরাপদ হয়ে উঠছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩+ প্রজন্মের রুশ ভিভিইআর রি-অ্যাক্টর ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো সব আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে সক্ষম।
পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরেনিয়ামের শক্তি অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় অনেক গুণ বেশি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম হলো কয়লা ও জ্বালানি তেলের চেয়ে সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী তিন বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে জ্বালানি ব্যবহার হবে তা রাশিয়া বিনামূল্যে সরবরাহ করবে। একবার জ্বালানি লোড করার পর প্রথম তিন বছরের জন্য বছরে একবার করে (এক-তৃতীয়াংশ) এবং পরে দেড় বছর পরপর জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। ফলে জ্বালানির কারণে দেশের অন্যান্য কেন্দ্র যেভাবে বন্ধ থাকে এখানে ওই ধরনের কোনো সংকট তৈরি হবে না।