বহুরকম চেষ্টা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র শোনেনি

এক দফার আন্দোলনের জন্য ঘোষিত রোডমার্চের কর্মসূচি শেষ করেছে বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে সর্বশেষ এ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, আমেরিকা থেকে ঘুরে এসেছেন খালি হাতে। বহুরকম চেষ্টা করেছেন ভিসানীতি বাতিলের। তারা (যুক্তরাষ্ট্র) শোনেনি। বাংলাদেশের মানুষও আপনাদের কথা শোনে না। কথা পরিষ্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। তারা (সরকার) আজকে ভয় দেখায়, ভয়ে কাজ হবে না। আমরা ভোট দিতে চাই।

এ সময় সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্তি, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ এক দফা দাবিতে যুগপৎ কর্মসূচির ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল। পাঁচ দিনের নতুন কর্মসূচিতে রয়েছে ৯ অক্টোবর খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে ঢাকাসহ সারা দেশে জেলা ও মহানগরে সমাবেশ অথবা মিছিল, ১২ অক্টোবর ঢাকায় ছাত্র কনভেনশন, ১৪ অক্টোবর ঢাকাসহ সারা দেশে জেলা ও মহানগরে অনশন, ১৬ অক্টোবর ঢাকায় যুব সমাবেশ এবং ১৮ তারিখ ঢাকায় সমাবেশ।

এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর বিএনপি সিলেট বিভাগ, ২৩ মার্চ বরিশাল বিভাগ, ২৬ সেপ্টেম্বর খুলনা বিভাগ, ২৯ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ বিভাগে এবং ৩ অক্টোবর ফরিদপুর বিভাগে রোডমার্চের কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।

গতকাল সকালে কুমিল্লার বুড়িচং এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী রোডমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে। ভোট চুরি আর করতে দেওয়া হবে না। হাসিনার অধীন আমরা নির্বাচনে যাব না। এখন আমাদের এক দফা দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে ২২ জনকে গুলি করে মেরেছে, সাতশ মানুষকে গুম করেছে, সহস্র মানুষকে হত্যা করেছে। চাঁদপুরের এক মন্ত্রীর সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, নদী থেকে ওই মন্ত্রীর সহায়তায় ৬ হাজার কোটি টাকার বালু লোপাট করা হয়েছে।

বুড়িচং উপজেলার কালাকটুয়া খন্দকার ফুড গ্যালারি মাঠে রোডমার্চের উদ্বোধনের পর ফেনী ও চট্টগ্রাম মিরসরাইয়ে দুটি পথসভা শেষে চট্টগ্রাম নগরে বিএনপির কার্যালয়ে সমাবেশের মধ্য দিয়ে রোডমার্চ শেষ হয়। রোডমার্চে অংশ নেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয়, জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের হাজারও নেতাকর্মী। কুমিল্লার সমাবেশ শেষে রোডমার্চটি বেলা সোয়া ১১টার দিকে চট্টগ্রামের দিকে রওনা হয়। রোডমার্চ ঘিরে সকাল থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসেন। সমাবেশস্থলে জায়গা না পেয়ে অনেক নেতাকর্মী গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রামগামী সড়কে অবস্থান নেয়। এতে সড়কে যানজটে যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

এ সময় সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত ছিল পুরো এলাকা। মহাসড়কের সুয়াগঞ্জ এলাকায় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী, পদুয়ার বাজার এলাকায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপি থেকে আজীবন বহিষ্কৃত মনিরুল হক সাক্কুকে অংশ নিতে দেখা যায়। সাক্কু সাংবাদিকদের বলেন, দলের দুঃসময়ে মাঠে থাকতে হবে। আমি আদি বিএনপি।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে দলের কেন্দ্রীয় নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সাবেক সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন, কুমিল্লা বিভাগীয় সম্পাদক মোস্তাক মিয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

পরে রোডমার্চ ফেনীর মহিপালের দিকে রওনা হয়। রোডমার্চের অগ্রভাগ পথসভার স্থলে পৌঁছানোর আগেই ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী জেলা থেকে আসা নেতাকর্মীরা ব্যানার ও ফেস্টুনসহ অন্তত ৩০০টি পিকআপ, ২৫০টি মাইক্রোবাস ও সাত শতাধিক মোটরসাইকেল মহিপাল ফ্লাইওভারের দক্ষিণাংশে সমবেত হন।

জেলা বিএনপি আয়োজিত এ পথসভায় মির্জা ফখরুল বলেন, ফেনীর মেয়ে খালেদা জিয়া আজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। বর্তমানে সারা দেশে খুন, গুম ও লুটের রাজত্ব চলছে। দেশের মানুষ এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চায়। আমরা জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে তুলে দিতে চাই, বিএনপিকে জনগণ রায় দিলে ক্ষমতা যাবে। আজকেও ওবায়দুল কাদেরের বাড়ির সামনে বিএনপি নেতাকর্মীদের গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এ সন্ত্রাস করে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। এ আন্দোলনে ২৮ জন প্রাণ হারিয়েছে।

প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা এখনো সহিংসতার দিকে যাইনি। প্রতিবাদ করছি শান্তিপূর্ণভাবে। কিন্তু আগের মতো গ্রেপ্তার, গুম, খুন, বানোয়াট মামলা যদি বন্ধ না করেন প্রতিবাদ নয়, প্রতিরোধ করা হবে।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহারের সভাপতিত্বে পথসভায় কুমিল্লা-ফেনী-মিরসরাই-চট্টগ্রাম রোডমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির দলনেতা মোহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় নেতা বরকতউল্লা বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি, রেহানা আক্তার রানু, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

পথসভা শেষে রোডমার্চ চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করলে ফেনীর মোহাম্মদ আলী থেকে কসকা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার সড়কে যানজট তৈরি হয়। এতে দূরপাল্লার যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

পথসভায় যোগ দিতে দুপুরে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা, বান্দরবান, লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া এলাকাগুলোয় বিএনপির গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় গাছবাড়িয়া এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় ১৫-২০টি গাড়ি (মাইক্রোবাস, মিনিবাস ও বাস) ভাঙচুর করা হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও সাধারণ শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার বাগিচাহাট ও বড়পাড়া (কসাইপাড়া) এলাকায়ও একই ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।

রাতে চট্টগ্রাম পৌঁছে রোডমার্চ কর্মসূচির শেষ সমাবেশ থেকে মির্জা ফখরুল ৯ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দিনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

* প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক কুমিল্লা, চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি, ফেনী প্রতিনিধি, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি