মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলোকচিত্রী ছিলেন সুজিৎ কুমার রায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুজিবনগর সরকারের আলোকচিত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর [আইএসপিআর] এর গোড়াপত্তনের কথা লিখতে গেলে সুজিৎ রায়ের নাম স্মরণে নিতে হয়। দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালের জুন মাসে পুরোনো হাইকোর্ট বিল্ডিংয়ে আইএসপিআর প্রতিষ্ঠিত হয়। সুজিৎ রায় ছিলেন আইএসপিআরের প্রতিষ্ঠাকালীন আলোকচিত্রী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আইএসপিআরের চীফ ক্যামেরাম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাত্র ৪৭ বছরের জীবন ছিল তার। এই সামান্য সময়ে সরকারি চাকরির বাইরে তিনি একজন সৃষ্টিশীল আলোকচিত্রী হিসেবে তার সমসাময়িকদের কাছে নন্দিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার তোলা অসংখ্য ছবি ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় ছাপা হয়। পরবর্তী সময়ে মিড বাংলাদেশসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনায় তার তোলা ছবি ছাপা হয়েছে। তিনি সাপ্তাহিক পূর্বানী, অধুনালুপ্ত সান্ধ্য দৈনিক আওয়াজের স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবেও কাজ করেন। মুজিবনগর সরকারের একজন নিয়োগপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী হয়েও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে তার ৫০ বছর সময় লাগে। ২০২২ সালে গেজেটে তার নাম প্রকাশিত হয়।
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো সুজিৎ রায়ের একটি সাদাকালো পোর্ট্রেট দেখতে পাই। কয়েকজন পথিকৃৎ আলোকচিত্রীর মধ্যে তার পোর্ট্রেটটিও আছে। মো. রফিকুল ইসলামের ‘সাদাকালো ও রঙিন : ডার্করুম টেকনিক’ বইয়ের শেষ প্রচ্ছদেও সুজিৎ রায়ের একটি পোর্ট্রেট ছাপা হয়। স্বাভাবিকভাবেই তাকে নিয়ে আমার আগ্রহ জন্মে। কয়েকজন প্রবীণ আলোকচিত্রীর কাছে তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে থাকি। কিন্তু কেউই সুজিৎ রায়ের পরিবারের কারও সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেন না। গত ২৮ মে কলকাতার বর্ন অ্যান্ড শেফার্ড ও ঢাকার জায়েদী’স ফটোগ্রাফার্সের আলোকচিত্রী শেখ জিলানীকে জানতে তার ছেলে শেখ জি জাহাঙ্গীরের সাক্ষাৎকার নিই। তার কাছেই সুজিৎ রায়ের মেয়ের সন্ধান পাই। শেখ জি জাহাঙ্গীর জানান, ‘ল²ীবাজারে সোহরাওয়ার্দী কলেজের উল্টোপাশের একটি বহুতল ভবনে সুজিৎ বাবুর মেয়ে থাকেন।’
এই তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৬ জুন সন্ধ্যায় লক্ষীবাজারের ৬৩ সুভাষ বোস অ্যাভিনিউর ‘হিজেল প্যালেস’ নামের একটি ১২তলা ভবনে গিয়ে হাজির হই। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে নাম-পরিচয় না বলতে পারলে ঢাকায় কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমার ব্যাকুলতা দেখে নিরাপত্তাকর্মী আমাকে উপরে ওঠার অনুমতি দিলেন। কয়েকটি ফ্ল্যাটে খোঁজ নেওয়ার পর একজন বললেন, দশ তলায় গিয়ে দেখতে পারেন। ১০/বি নম্বরের ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজাতেই মাঝবয়সী এক নারী দরজা খুললেন। সুজিৎ বাবুর খোঁজে এসেছি বলতেই তিনি বললেন, ‘আমিই তার মেয়ে। আমার নাম জয়া রানী রায়।’ আমার পরিচয় পেয়ে বললেন, ‘চলেন আপনাকে মায়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাই।’ তৃতীয় তলায় ৩/বি নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন তার মা সন্ধ্যা রানী রায়। এই ফ্লাটের ড্রয়িং রুমে সুজিৎ বাবুর সেই সাদাকালো ছবিটি টাঙানো। জয়া রায় তার বাবা সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন। আমি তার কথাগুলো মোবাইল ফোনে রেকর্ড করি। জয়া রায়ের বর্ণনায় পাওয়া যায় সুজিৎ রায়ের বৃত্তান্ত।
১৯৪৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের মাতৃসদন হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন সুজিৎ রায়। তার ডাক নাম অলক। পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের ব্যাঙাডোবা গ্রামে। তার পিতা সুবোধ কুমার রায় স্বদেশি ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারণে কয়েক দফা কারা ভোগ করেন। তিনি জেলখানায় বসে পড়াশোনা করে পরবর্তী সময়ে এমএ পাস করেন। তিনি সিলেট থেকে ‘পল্লীবাণী’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। এই নামে তার একটি প্রেসও ছিল। প্রেসটি তিনি তার শ^শুরের কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন। সাত বছর বয়সে মাকে হারান সুজিৎ রায়। তার মা যুথিকা রায় ছিলেন ঢাকার রায়েরবাজারের জমিদার পরিবারের মেয়ে। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় এই পরিবারটি দেশান্তরিত হয়। তিন ভাইবোনের মধ্যে সুজিৎ রায় ছিলেন বড়। মায়ের মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই চম্পক রায় ও ছোট বোন শুক্লা রায়কে ভারতে নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সুজিৎ রায়কে রাখা হয় বাবার কাছে। বাবার কাছেই তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ১৯৬১ সালে পগোজ স্কুল থেকে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ ও পরবর্তী সময়ে বিএ পাস করেন। সুজিৎ রায়ের বাবা ছিলেন প্যারিদাস রোডে জগন্নাথ কলেজের আবাসিক হল ‘বাণী ভবন’ এর দায়িত্বে। ফলে বাণী ভবনেই সুজিৎ রায়ের বেড়ে ওঠা। মা ছিল না বলে তার কাছে বাবাই ছিল সব। স্কুলে পড়ার সময়ই ছবি তোলার প্রতি আকৃষ্ট হন। বাবাকে বলেন ক্যামেরা কিনে দিতে। বাবা বললেন, ‘আগে ম্যাট্রিক পাস করো।’ মেট্রিক পাস করার পর বাবা তাকে একটা ক্যামেরা কিনে দেন। সেই শুরু। বাবার দেওয়া ক্যামেরাটাকে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ মনে করতেন তিনি।
জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময়ই ৫ নর্থবুক হল রোডে মায়ের নামে একটি স্টুডিও খোলেন সুজিৎ রায়। তিনি তার স্টুডিওটির নাম রাখেন ‘যুথিকা ফটোগ্রাফার্স’। তার কোনো গুরু ছিল না। নিজে নিজেই ছবি তোলা, ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্ট করতে শেখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তার স্টুডিওটি ধ্বংস করে। মুক্তিযুদ্ধের পরে ঢাকায় ফিরে ৩ পাতলা খান লেনে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে নীচ তলায় যুথিকার কার্যক্রম শুরু করেন। অনেকটা নির্জনতার মধ্যে থাকতে পছন্দ করতেন সুজিৎ রায়। পৈতৃক বাড়ির সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগও ছিল না। ফলে তার গ্রামের বাড়িটাও বেদখল হয়ে যায়। সুজিৎ রায় ১৯৬৯ সালে সন্ধ্যা রানী রায়ের সঙ্গে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুজনের বয়সের ব্যবধান ছিল ১৬ বছর। তাদের এক ছেলে, দুই মেয়ে। বড় ছেলে সত্যজিৎ রায় বর্ধমানে থাকেন ও সেখানে প্রেসের ব্যবসা করেন। মেয়ে জয়া রানী রায় আইএসপিআরে কর্মরত এবং ছোট মেয়ে শুভা রায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক।
গল্পে গল্পে জয়া রায় জানালেন, ‘১৯৯০ সালের ৬ অক্টোবর ক্যান্সার ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাবা। বাবা যখন মারা যান, আমি তখন ছোট ছিলাম। কিন্তু স্মৃতিগুলো জ¦লজ¦লে। আমরা তখন ল²ীবাজারে সংগীতশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। তখন সকাল ৭টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অফিস ছিল। ৩টার দিকে বাবা বাসায় আসতেন। বিকেলে ছবি তুলতে বের হতেন। রাত ৯টার পর ডেভলপ করতে বসতেন। ফিল্ম শুকানোর পর ছবি প্রিন্ট করতে করতে রাত ১২টা। এরপর ভেজা ছবি রসিতে ঝুলিয়ে দিতেন। ডেভেলপ করার জন্য বাসায় কোনো ডার্করুম ছিল না। অন্ধকার ঘরে ডেভেলপ করতেন। কাচি দিয়ে ফিল্ম কেটে পলিথিনে ঢুকাতেন। বাবা এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করতেন। ডালিম ফলের মধ্যে আমার ছবি বসাতেন। ছোট একটা ফুল এমন করে তুলতেন খুব বড় দেখাতো। বাবা কোনো পুরস্কারের জন্য ছবি পাঠাতেন না। তিনি বলতেন, যদি আমি ভালো ফটোগ্রাফার হই, তাহলে মানুষ এমনিতেই আমার কথা বলবে। কয়েক বছর আগে শিল্পকলায় গিয়ে হঠাৎ দেখি আর্ট গ্যালারিতে বাবার ছবি টাঙানো। দেখে বুকটা ভরে গেল।’
সুজিৎ রায়ের নেগেটিভগুলো কোথায় জানতে চাইলে জয়া রায় জানান, অনেক বছর আগে ন্যাশনাল আর্কাইভ থেকে লোক এসেছিল বাবার নেগেটিভের খোঁজে। তখন আমরা বিষয়টি বুঝতে পারিনি। দীর্ঘ দিন নেগেটিভগুলো বাসায় থেকে থেকে নষ্ট হয়েছে। গল্প শেষে সন্ধ্যা রায়ের মুখখানা দেখতে চাইলাম। কিন্তু ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েন সন্ধ্যা রায়।
লেখক : দেশ রূপান্তরের আলোকেচিত্র সম্পাদক