বিশ্বাসের রেণু ছড়িয়ে স্তুতির চূড়ায় সাকিব

ঠিক যেভাবে চাচ্ছিলেন সেভাবেই যেন সব অঙ্ক মিলে যাচ্ছিল সাকিব আল হাসানের। নিজের তৈরি করা ছকে একে একে ধরা পড়ছিল শিকার। কখনো স্পিনার, কখনো পেসারকে বোলিংয়ে এনে পাচ্ছিলেন সাফল্য। আবার কখনো নিজে ২২ গজে আক্রমণে এসে মাতিয়ে তুলেছেন গোটা দলকে। সঙ্গে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশকে।

ধর্মশালার সবুজ গালিচায় এ যেন এক অন্যরকম সাকিব। যিনি কিনা শুধু নিজের উইকেটের সাফল্য উদযাপন করেননি বরং গোটা দলকে নিয়ে এক উজ্জীবনী ছবি এঁকেছেন যা কিনা তার খোলসের বাইরে আসা চরিত্র। নিজের বোলিং, দলের বোলিং পরিবর্তন, নিখুঁত ফিল্ডিং পজিশন, আগ্রাসী মনোভাব আর অসাধারণ নেতৃত্বগুণে সাকিব হয়ে উঠেছিলেন দলের প্রাণভোমরা।

সাফল্য উদযাপনে যার যারপরনাই অনীহা সে-ই কিনা মিরাজের উইকেটে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে করেছেন আনন্দ ভাগাভাগি। তাসকিনের কাছে গিয়ে চিৎকার করে মেতে উঠেছেন উন্মাদনায়। ছোট ছোট এই চিত্রগুলোই আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৬ উইকেটে পাওয়া জয়কে আরও বড় করে তুলেছে।

এই আনন্দের শুরুটা সাকিবের হাত ধরেই। ইব্রাহিম জাদরানকে নিয়ে। শর্ট কাভার রেখে, মিড উইকেট ও ফাইন লেগ বৃত্তের ভেতরে এনে অফস্টাম্পের বাইরে টানা বোলিং করেন। ইব্রাহিম সøগ সুইপে ব্যতিক্রমী কিছু করতে গিয়ে ক্যাচ দেন স্কয়ার লেগে। সাকিবের ব্রেক থ্রু। বাঁহাত মুষ্টি করে শূন্যে ঘুষি ছুঁড়ে ইয়েস বলে চিৎকার। এরপর শর্ট কভারে থাকা লিটনকে জড়িয়ে ধরে বুনো উল্লাস। ধর্মশালার সবুজ ক্যানভাসে তখন বল ঘুরছিল। সাকিবের মুখের হাসিও চওড়া হচ্ছিল। উইকেটের চারপাশে প্রহরী রেখে মিরাজ ও সাকিব জুটি বেঁধে চালালেন আক্রমণ। তাতে মিলে যায় আফগানিস্তানের অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহিদির উইকেট।

তাসকিন নতুন বলে আঁটসাঁট থাকলেও পুরনোতে ফিরে নবীকে বোল্ড করেন। মোস্তাফিজের বিভ্রান্তিকর সেøায়ারে রহমানউল্লাহ গুরবাজ ডিপ কভারে ক্যাচ দিলে সাকিবকে লাফাতেও দেখা যায়। ম্যাচটা যে ধীরে ধীরে তার হাতের মুঠোয় চলে আসছিল সবটাই যেন বুঝে যাচ্ছিলেন।

বাংলাদেশের আমন্ত্রণে ব্যাটিংয়ে নেমে বিনা উইকেটে ৪৭ রান তুলে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেওয়া আফগানিস্তান পরের ১০৯ রান তুলতেই সবকটি উইকেট হারিয়েছে। যা সম্ভব হয়েছে সাকিবের বিশ্বাসের কারণে। বাংলাদেশের নেতা বিশ্বাস করছিলেন একটা ব্রেক থ্রু, একটা বোলিং স্পেল ম্যাচের পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারবে। সেই বিশ্বাসের রেণু ছড়িয়ে পড়ে গোটা ড্রেসিংরুমে, মাঠে থাকা এগারজনে। পরের গল্পটা তো সবারই জানা।

২৫ রানে ৩ উইকেট আর ব্যাটিংয়ে ৫৭ রান নিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়া জয়ের কৃতিত্ব দিয়ে স্তুতিতে ভাসিয়েছেন ওই সাকিবকেই, ‘সাকিব ভাই একটা কথা বলেছিলেন নেগেটিভ মানসিকতা নিয়ে বল করলে কখনো সফল হওয়া যাবে না, ইতিবাচক থাকতে হবে। ওরা যদি মেরে দেয়, সমস্যা নেই। ওরা যেন তোকে চার্জ করে মারে। ভালো জায়গা বল করতে থাক, ভালো হবে। এই ছোট ছোট কথা অনেক কাজে দেয়।’

আইসিসি ইভেন্ট মানেই সাকিবের অন্য এক রূপ। ইতিহাসে জড়ানো ৬০৬ রান ও ১১ উইকেটের সাফল্যগাথার কীর্তি অক্ষয় কালিতে লিখা। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন তেতে থাকা সাকিবকেই দেখা মিলবে শরিফুল আভাস দিয়ে রাখলেন, ‘আমরা সবাই জয়ের জন্য নেমেছি। এই কারণেই। সাকিব ভাই হয়তোৃ একটু তো উদযাপন হবেই।’   

নিজের পঞ্চম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে এক অবিশ্বাস্য কীর্তি থেকে এক পা পিছিয়ে ছিলেন সাকিব। আগের চার বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচে চারটি ফিফটি রাঙা হয়েছে তার ব্যাটে। ধর্মশালায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে সেই সুযোগটি পাননি। ম্যাচ সেরা মিরাজ যখন রহমত শাহর উড়ন্ত ক্যাচে পরিণত হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরেছেন তখন জয় থেকে ৩৩ রান দূরে বাংলাদেশ। সাকিবের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল কেবল দলকে ঠিকঠাক জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। সেটা অবশ্য পারেননি। ৩০ রানে ৩ উইকেটের সঙ্গে তার বিশ্বকাপ শুরু ১৪ রানে। তাতে থোরাই কেয়ার তার।

ধর্মশালার খোলা মাঠে বাংলাদেশের উদযাপন ছিল সামান্যই। সেটা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে রূপ নিয়েছিল ড্রেসিংরুমে। ক্রিকেটাররা যেখানে অনেক দিন পর গলা ছেড়ে গেয়েছে ‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয়’। ঐতিহ্য ধরে রেখে মিরাজ ছিলেন উদযাপনের মধ্যমণি। সাকিব আনসাং হিরো। যিনি বিশ্বাস ছড়িয়ে স্তুতির চূড়ায়।