ধারাবাহিক শান্ত দুর্দান্ত রুট

আলোচনা-সমালোচনা, ট্রলের শিকার কম হননি নাজমুল হোসেন শান্ত। সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে গেছেন তিনি। চারপাশের চাপে ভেঙে পড়েননি, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। মুখে নয়, সবকিছুর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ব্যাট হাতে। কথায় আছে, ‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।’ কেষ্ট মানে সুফল বা সাফল্য, যা পেতে শুরু করেছেন শান্ত। তার ব্যাট থেকে এখন ধারাবাহিকভাবে রান পাচ্ছে বাংলাদেশ দল। কয়েক মাস আগে দেশের সেরা কোচদের একজন নাজমুল আবেদীন ফাহিম দৃঢ় মানসিকতার জন্য শান্তর প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘এত সমালোচনার পরেও মানসিকভাবে কখনো ভেঙে পড়েনি শান্ত, যা ইঙ্গিত দেয়, তিনি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে উঠবেন।’ সেটাই হচ্ছে। দলের ব্যাটিং অর্ডারের ভরসা হয়ে উঠছেন তিনি।

বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই শান্তকে মনে করা হতো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন নি®প্রভ। ফর্মহীনতার কারণে বিদ্ধ হয়েছিলেন সমালোচনার তিরে। তবে তার প্রতিভার প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশে কাজ করে যাওয়া সব কোচই। তাই শান্তর পেছনে ধৈর্য ধরে সময় ব্যয় করেছে ক্রিকেট বোর্ডও। অনেক অপেক্ষার পর এখন আসতে শুরু করেছে সুফল। ছন্দে আছেন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান নিজের বিশ্বকাপ অভিষেক রাঙিয়েছেন অপরাজিত ফিফটিতে। আফগানিস্তানকে ৬ উইকেটে হারানোর পথে খেলেছেন ৫৯ রানের ইনিংস। এবার বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, যাদের বিপক্ষে আজ মাঠে নামবে সাকিব আল হাসানের দল। জয়ের ধারায় থাকতে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান শান্তর কাছ থেকে এই ম্যাচেও আরেকটি ভালো ইনিংসের আশায় থাকবে তারা। অথচ এই শান্তকে ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে রাখায় প্রবল সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন নির্বাচকরা। গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপের দলে শান্তকে ভাবেননি বেশিরভাগই। কিন্তু তাকে দলে রেখে চমক দেয় বাংলাদেশ। আস্থা রাখার প্রতিদান দেন শান্ত বৈশ্বিক আসরেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেন ৫৫ বলে ৭১ রানের ইনিংস। পরে পাকিস্তানের বিপক্ষেও করেন ফিফটি। সেই থেকে তার বদলে যাওয়ার শুরু। চলমান বিশ্বকাপে তো তিনি বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারের অন্যতম সেরা অস্ত্র।

তিন সংস্করণেই দুর্দান্ত ফর্মে আছেন ২৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার; বিশেষ করে ওয়ানডেতে বেশ ধারাবাহিক তিনি। এক বছরে এই সংস্করণে ১৮ ম্যাচে ৪৮.৬২ গড়ে করেছেন ৭৭৮ রান। ক্যারিয়ারের দুটি সেঞ্চুরি ও ছয়টি ফিফটি এই সময়েই এসেছে তার ব্যাট থেকে। সবশেষ চার ওয়ানডেতে তিন ফিফটি ও একটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন তিনি। ভারতে যাওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে শান্ত বলেছেন, নিজের দুর্বলতাগুলো নিয়ে কাজ করেই এখন সফলতার পথে ছুটছেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও শান্তকে সফলই বলা যায়, এখন পর্যন্ত ৩ ওয়ানডে খেলে দুটিতে পেয়েছেন ফিফটি, ৩৭ গড়ে রান ১১১। ইংলিশদের সঙ্গে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার সব সামর্থ্যই আছে শান্তর।

ম্যাচ বাংলাদেশের কে কী করতে পারেন, এসব নিয়ে অবশ্য ভাবছে না ইংল্যান্ড। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে জস বাটলার তো সরাসরি বলেই দিয়েছেন, বাংলাদেশকে হুমকি মনে করেন না তারা। আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে তেতে আছে ইংল্যান্ড। আগ্রাসী ক্রিকেটে বাংলাদেশকে গুঁড়িয়ে জয়ে ফিরতে চাইবে তারা, রাখতে চাইবে ছাপ। পরের প্রতিপক্ষদের বার্তা দিতে চাইবে, ‘ইংল্যান্ড দল খুবই ভয়ংকর।’ আগ্রাসনের মন্ত্রে ক্রিকেট আঙিনায় দাপিয়ে বেড়ানো ইংলিশ দলটির ব্যাটিং অর্ডারে সেতুর মতো জো রুট। দক্ষ হাতে দলের হাল ধরার কাজটা করেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, প্রয়োজনে আক্রমণাত্মকও হয়ে উঠতে পারেন, গুঁড়িয়ে দিতে পারেন প্রতিপক্ষের বোলিং।

কিউইদের বিপক্ষে আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত ছিলেন রুট। দল ৯ উইকেটে হারলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল ছিলেন সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। ইংল্যান্ডের ইনিংসে একমাত্র ফিফটি আসে তার ব্যাট থেকে, ৮৬ বলে খেলেন ৭৭ রানের ইনিংস। ইংলিশ দলটির এখনকার মারকুটে মানসিকতায় রুটের ইনিংসটিকে অবশ্য কিছুটা মন্থর মনে হতেই পারে। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় তার এই রান ছিল মহাগুরুত্বপূর্ণ। অষ্টম ওভারে ক্রিজে গিয়ে ৪২তম ওভারে মাঠ ছাড়া ডানহাতি ব্যাটসম্যানই টেনে নেন দলের ইনিংস। ইংল্যান্ডের ২৮২ রানের পুঁজি গড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার। ইংলিশদের বিশ^কাপ ধরে রাখার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে ৩২ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারকে।

যেমনটা তিনি রেখেছিলেন ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ^কাপ জয়ের পথে। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত চার বছর আগের আসরে ১১ ম্যাচে ২ সেঞ্চুরি ও ৩ ফিফটিতে রুট করেছিলেন পঞ্চম সর্বোচ্চ ৫৫৬ রান, ব্যাটিং গড় ৬১.৭৭। বিশ^কাপে এখন পর্যন্ত ১৮ ম্যাচ খেলা এই ব্যাটসম্যানের রান ৩ সেঞ্চুরি ও ৫৫.৬৬ গড়ে ৮৩৫। ব্যাটিং অর্ডারের সবচেয়ে বড় ভরসার দিকে সামনের ম্যাচগুলোতে ভালো কিছুর প্রত্যাশায় থাকবে ইংলিশরা।

গত চার বছরে খুব বেশি ওয়ানডে খেলা হয়নি রুটের। ২০১৯ বিশ^কাপের পর থেকে এবারের আসর শুরুর আগ পর্যন্ত মাত্র ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। যেখানে তার ব্যাটিং গড় কেবল ২৭। এই সংস্করণে ১৬ সেঞ্চুরির সবশেষটি পেয়েছিলেন গত বিশ^কাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রাথমিক পর্বে। ওয়ানডেতে ৬ হাজারের বেশি রান করা রুট অবশ্য আস্থা রাখছেন নিজের ওপর, ‘আমার অনেক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আছে। জানি, আমি ভালো ক্রিকেটার যে কিনা এই পর্যায়ের ক্রিকেটে পারফর্ম করতে পারে।’ বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইনআপের ইংলিশ দলে রুটও হতে পারেন বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি।

বাংলাদেশের বিপক্ষে খুব বেশি খেলার অভিজ্ঞতা নেই রুটের, এখন পর্যন্ত খেলেছেন কেবল তিনটি ওয়ানডে। তবে এর একটিতে হাঁকিয়েছেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস, ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দা ওভালে অপরাজিত ১৩৩ রান। ভারতের মাটিতে অসাধারণ রুট। এশিয়ার দেশটিতে তিন সংস্করণেই তার ব্যাটিং গড় পঞ্চাশের ওপরে। ধর্মশালায় বাংলাদেশের বিপক্ষে মাস্টারক্লাস ব্যাটিংয়ে নিজেকে মেলে ধরেন কি না রুট, সেটা তোলা থাক সময়ের হাতে।