আলোচনায় সমঝোতা সমন্বয়

বিএনপির কাছে জিজ্ঞাসা নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের বৈঠকে বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তার অধীনে বিএনপি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। দলটির নেতারা এ-ও বলেছেন, ‘দেশে নির্বাচন পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন হয়নি; বরং আরও অবনতি হয়েছে।’ গতকাল সোমবার সকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের বৈঠক হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ অংশ নেন।

বিএনপি নেতারা জানান, গতকাল নিম্ন আদালতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পর্যায় থেকে সহসম্পাদক পর্যন্ত ১৫ নেতার সাজার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সফররত মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সদস্যরা। তারা বিএনপি প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছেন, ‘চলমান সফরে নির্বাচনের তথ্য সংগ্রহে বএনপির কাছে জিজ্ঞাসা (প্রথম পৃষ্ঠার পর) এসে এ ধরনের ঘটনায় তারা বিস্মিত।’ বিএনপি নেতাদের তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের একপর্যায়ে নেতাদের সাজার বিষয়টি উঠে এলে সফরকারী দলের অন্তত দুজন সদস্য এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পেরে এ মন্তব্য করেন। জানতে চাইলে বৈঠকে অংশ নেওয়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে যে পরিবেশ তৈরি করা দরকার, সেটি একেবারেই নেই; বরং পরিস্থিতি উল্টো। আলোচনার একপর্যায়ে বিএনপি নেতাদের সাজার বিষয়টি সফররত প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানতে পারেন।

এ সময় আমরা তাদের বলেছি, গত এক বছরে যত নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, পঙ্গু করা হয়েছে, মামলা হামলা চলছে, সে বিষয়গুলো তারা আরও বিস্তারিত খোঁজ নিলে বুঝতে পারবেন পরিস্থিতি কত ভয়াবহ। বিএনপি নেতাদের মামলাগুলো কেন “স্পিডি ট্রায়ালে” (দ্রুত বিচার) নিয়ে গেছে, সেটিও সফররত সদস্যরা জানতে পেরেছেন।’ বৈঠকে অংশ নেওয়া আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে এখন সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই, কেন নেই, কী কারণে নেই, সে বিষয়ে বিএনপির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ : এ কেস স্টাডি অব ইটস মিলিটেন্ট পলিটিকস অ্যান্ড ক্রাইম এগেইনস্ট হিউমিনিটি’ নামে একটি ১৫৫ পাতার পাবলিকেশন তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এতে বর্তমান সরকারের গত ১৫ বছরের নানা কর্মকান্ড বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।’ শামা ওবায়েদ আরও বলেন, ‘বিদেশ থেকে যে ভিজিটর আমাদের এখানে আসেন, তাদের আমরা সব তথ্যই দিয়ে থাকি; বিশেষ করে আমাদের দল থেকে যে পাবলিকেশন হয়ে থাকে সেগুলো।’ বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই সূত্র বলছে, যারা এখানে এসেছেন, তারা বিএনপি বা আওয়ামী লীগকে কোনো আশ্বাস দেবেন না।

তারা একটা নিরপেক্ষ জায়গা থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। তাদের যে ফাইন্ডিংস সেটি অফিশিয়ালি পরে জানাবেন। তারা মূলত আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, পরিবেশটা কী? ওই সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকের শুরুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার প্রতিনিধিদলের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন। পরে মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনীব্যবস্থা, নির্বাচনী পরিবেশ, প্রশাসনের ভূমিকা, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা এবং সাজা দেওয়া, রাজনৈতিক স্পেস, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে নির্বাচনে যাওয়া ও না যাওয়া নিয়ে বিএনপি তাদের যুক্তি তুলে ধরে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের অধীনে কেন নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না সে বিষয়টি তথ্যপ্রমাণসহ তুলে ধরে। একই সঙ্গে দলের চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মামলার তালিকা তুলে ধরা হয়। তথ্যপ্রমাণ দেখে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বিস্ময় প্রকাশ করেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সরকারের নানা অনিয়ম, হামলা-মামলার তথ্যচিত্র নিয়েও তাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বিষয়টি তুলে ধরে বিএনপি নেতারা গত উপজেলা, ইউনিয়ন ও সর্বশেষ ৫টি সিটি করপোরেশনে ইসির ভূমিকা তুলে ধরেন। এসব তথ্য সফরকারী দল সংগ্রহ করলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি বলে সূত্রের দাবি। তবে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের পর প্রতিনিধিদলকে পরিস্থিতি বোঝানো গেছে বলে মনে করেন স্থায়ী কমিটির এক সদস্য। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দাবির পক্ষে যে তথ্যপ্রমাণ দিয়েছি, তাতে মনে হয়েছে তারা সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতোই তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে আমাদের মনে হয়েছে।’ বৈঠকের পর মার্কিন প্রতিনিধিদলের কেউ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে বিএনপির পক্ষে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, দেশের মানুষ ও সারা বিশ্ব যেভাবে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, সেই নির্বাচনের পরিবেশ নেই। এই একই কথা ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে। ইইউ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে সব শ্রেণির মানুষ, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে কথা বলে গেছে। তারা ফিরে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশে নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই।

এখন মার্কিন প্রতিনিধিদল একই বিষয় নিয়ে কাজ করতে এসেছে। তারা (যুক্তরাষ্ট্র) নির্বাচনের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে এসেছেন, আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কি না? তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে বিএনপির পক্ষ থেকে আমরা বলেছি, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এটার (নির্বাচন পরিস্থিতি) তো কোনো উন্নয়ন হয়নি; বরং আরও অবনতি হয়েছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার হরণ করেছে। ভোট চুরির প্রকল্প এখন আরও শক্তিশালী হয়েছে, দমন-নিপীড়ন আরও বেড়েছে। নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক মানের বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বাংলাদেশে হবে কি না এবং হতে হলে কিসের প্রয়োজন। সেটা কীভাবে করা যায়? আজকে যারা বয়স ৩০-৩২ বছর হয়েছে তারা বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনি। এখন অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং আরও অবনতি হয়েছে।’ বৈঠকে মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল কিছু বলেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আমীর খসরু বলেন, তারা তো এসেছেন পর্যবেক্ষণের জন্য। যেমন এসেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন, পর্যবেক্ষক পাঠাবেন কি না।

নির্বাচনের কোন কোন বিষয়ে বিশেষভাবে জানতে চেয়েছেন এমন প্রশ্নে আমীর খসরু বলেন, সবকিছুর ব্যাপারেই জানতে চেয়েছেন তারা। ঘুরেফিরে একটাই প্রশ্ন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও আন্তর্জাতিকমানের বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হবে কি না, সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হলে কী প্রয়োজন? দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বপরিস্থিতি যাচাই করতে গত শনিবার ঢাকায় এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের ৭ সদস্য। তারা ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবেন।