কুমির খামার ‘খেয়ে’ পলাতক পি কে হালদারের সহযোগী

ময়মনসিংহের ভালুকায় দেশের প্রথম কুমির পালন খামার গড়েন লেখক মুশতাক আহমেদ ও উদ্যোক্তা মেজবাহুল হক। খামারে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি কুমিরছানা আনা হয়। ছানাগুলো যখন বড় হয় তখন খামারে নজর পড়ে রিয়ালেন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার)। খামারটি তিনি জোর করেই দখলে নেন। খামারটি তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাজিব সোম ও তার স্ত্রী শিমু রায় কেনেন। তারা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেড থেকে ৫৮ কোটি টাকা ঋণ নেন, যা পরে সুদাসলে দাঁড়ায় ১০৮ কোটি টাকা। ঋণ জালিয়াতির ঘটনা জানার পর এ বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান অভিযোগের অনুসন্ধান করছেন।

অভিযোগে বলা হয়, ২০১৩ সালে পি কে হালদার গং খামারের শেয়ার কিনে পুরো খামারটি দখলে নেয়। পরে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাজিব সোম ও তার স্ত্রী শিমু রায়ের নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ৩০ কোটি ও ২৮ কোটি টাকার দুটি ঋণ নেন। সেই ঋণ সুদাসলে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দাঁড়ায় ৯৭ কোটি ২৬ লাখ ৪ হাজার ৩৭৩ টাকায়। রাজিব সোমের কাছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পাওনার পরিমাণ ১০৮ কোটি টাকা। অথচ এ পরিমাণ টাকার বিপরীতে মর্টগেজ আছে মাত্র ৫ কোটি টাকার সম্পত্তি।

দুদকের অনুসন্ধান সূত্র বলছে, রেপটাইলস ফার্মের যে পরিমাণ সম্পত্তি আছে, তাতে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এ কারণে খামারটিকে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধানকালে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের সম্পত্তি ও স্থাপনা আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়। কিন্তু রেপটাইলস ফার্মে প্রায় তিন হাজার কুমির থাকায় সেটিকে জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর প্রতিষ্ঠানটির রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে জড়িতরা খামার ছেড়ে চলে যায়। আর খামারটি মুখ থুবড়ে পড়ে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের আদেশে ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়।

ফার্ম পরিচালনা কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকা সত্ত্বেও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং রেপটাইলস ফার্মের নামে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল আরও ৩ কোটি ৩০ লাখ ৯৭ হাজার ২০ টাকার ঋণ অনুমোদন করে। পুরনো ঋণ আদায়যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও নতুন করে ঋণ দেওয়ায় অবাক হন দুদকের কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিজিং প্রতিষ্ঠানের শতকোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করে কানাডা পালিয়ে গেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপির তালিকাভুক্ত তার নামে আবারও ঋণ দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার মাত্র।

দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘রেপটাইলস ফার্মের ঋণ জালিয়াতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দুদকের হাতে রয়েছে। রেপটাইলস ফার্মের কাছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পাওনার পরিমাণ প্রায় ১০৮ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজিব সোম ও তার স্ত্রী কানাডায় পলাতক। শিগগির অনুসন্ধান শেষ করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাওনা টাকা আদায়ে আমরা অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করব। যে সম্পদের বিপরীতে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তা বিক্রি করে পাওনা আদায় করা হবে। এর বাইরেও যদি কোনো জমিজমা থাকে সেগুলো বিক্রি করেও টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হবে।’

জানা গেছে, ২০০৩ সালে প্রয়াত লেখক মুশতাক আহমেদ ও উদ্যোক্তা মেজবাহুল হক ময়মনসিংহের ভালুকায় ১৩ দশমিক ৫৬ একর জমিতে একটি কুমিরের খামার করেন। নাম রেপটাইলস ফার্মস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠাকালে এটির ১৫ শতাংশ শেয়ার ছিল মুশতাক আহমেদের আর তার আত্মীয় মেজবাহুল হকের ছিল ৩৬ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের শেয়ার ছিল ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ব্যাংকটির কর্মকর্তা প্রিতিশ কুমার সরকার ছিলেন খামারের একজন পরিচালক। ব্যবসার শুরুতে উদ্যোক্তারা প্রায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। এ বিনিয়োগের ৪৯ শতাংশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ইইএফ শাখা। এ অর্থ সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, প্রকল্পটি যাত্রা শুরুর পর থেকেই অর্থ সংকট ভুগতে থাকে। অর্থের জোগান নিয়ে মেজবাহুল হক ও মুশতাক আহমেদ বিরোধে জড়িয়ে পড়েন এবং বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০১১ সালের জুন মাসে প্রিতিশ কুমার সরকার চিঠি দিয়ে মুশতাক আহমেদকে ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের শেয়ার কিনে নিতে বলেন। অন্যথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪৯ শতাংশ শেয়ার মেজবাহুল হকের নামে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়ে দেন।

২০১২ সালে পি কে হালদারের সঙ্গে উদ্যোক্তা মেজবাহুল হক ও মুশতাক আহমেদকে ব্যাংক কর্মকর্তা প্রিতিশ কুমার সরকার যোগাযোগ করিয়ে দেন। এরপর পি কে হালদার নিজেই মুশতাক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তিনি খামারের শেয়ার কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। অর্থ সংকটে থাকলেও মুশতাক আহমেদ শুরুতে খামারের মালিকানা ছাড়তে আগ্রহী ছিলেন না। পরে শেয়ার বিক্রি করে দেন। আর পুরো খামার পি কে সিন্ডিকেটের দখলে আসে এবং রাজিব সোম এমডি এবং তার স্ত্রী শিমু রায় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। তাদের নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ঋণ মঞ্জুর করা হয়।

দুদকের তথ্যমতে, পি কে হালদার কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে নেওয়া ৩ হাজার কোটি টাকাও রয়েছে। তার অর্থ আত্মসাতের ঘটনার অনুসন্ধানে দুদকের একাধিক টিম কাজ করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি আদালতের মাধ্যমে পি কে হালদার ও তার মা লীলাবতী হালদারসহ ২৫ জনের বিদেশগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দুদক। ওই তালিকায় রাজিব সোমের নামও ছিল। নিষেধাজ্ঞা জারির কয়েক দিন আগে রাজিব তার স্ত্রীকে নিয়ে কানাডায় পালিয়ে যান। রাজিব পালিয়ে যাওয়ার আগে কুমির খামারের নামে নেওয়া ঋণের টাকার বেশিরভাগ বিদেশে পাচার করেন।