‘দেশকে জাহান্নাম’ বলা বিচারপতিকে তিরস্কার

একটি মামলার জামিন শুনানিতে ‘দেশকে জাহান্নাম’ বলা বিচারপতিকে ডেকে তিরস্কার করেছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। শব্দ চয়নে তাকে আরও যত্নশীল হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।

গতকাল মঙ্গলবার মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান শুভ্র ও পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলানের জামিন আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদ এ মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আদিলুর ও এলানকে পরে জামিন দিয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে সাজার বিরুদ্ধে তাদের করা আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে দুজনকে দেওয়া অর্থদন্ডের আদেশ স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব আদেশ দেয়।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় আদিলুর ও এলানকে দুই বছর করে কারাদ- ও ১০ হাজার টাকা করে অর্থদ- দেয়। জামিনে থাকা দুজনকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার পর গত ২৫ সেপ্টেম্বর সাজা থেকে খালাস চেয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্টে আপিল করেন আদিলুর ও এলান। আরেকটি আবেদনে দুজনের পক্ষে জামিনের আরজি জানান তাদের আইনজীবী। এরই ধারাবাহিকতায় আপিলের গ্রহণযোগ্যতা ও জামিনের ওপর শুনানির জন্য হাইকোর্টের এ বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসে। আদিলুর ও এলানের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী ও রুহুল আমিন ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রেজাউল করিম।

এ জে মোহাম্মদ আলী শুনানি করতে ডায়াসের (আইনজীবীদের বক্তব্য দেওয়ার নির্দিষ্ট স্থান) সামনে দাঁড়ান। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রেজাউল করিম ‘আমাদের বক্তব্য আছে’ বলে উঠে দাঁড়ান। আদালত বলে, ‘তাদের (আপিলকারী) আগে বলতে দিন। আপনি (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী) আগেই লাফ দিয়ে উঠলেন কেন? দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন।’

একপর্যায়ে এ জে মোহাম্মদ আলী আদালতের উদ্দেশে বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাদের দুই বছর করে সাজা ও ১০ হাজার টাকা করে অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। আদালত এ সময় জামিনের আবেদন দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে আইনজীবী বলেন, ‘দেওয়া হয়েছে।’ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, সাজাপ্রাপ্ত দুজনের বিরুদ্ধে তথ্য বিকৃতি, গুজব ও অপপ্রচারের অভিযোগ রয়েছে।

আদালত বলে, ‘তাহলে দুই বছর সাজা দিলেন কেন? যাবজ্জীবন সাজা দিয়ে দিতেন।’ শুনানি শেষে আদিলুর ও এলানকে জামিনের আদেশ দিয়ে তাদের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে হাইকোর্ট।

বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির কাছে অভিযোগ : ‘দেশটাকে তো জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছেন’ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে হাইকোর্টের বিচারপতি ইমদাদুল হক আজাদের এমন বক্তব্য প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নজরে এনেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন। গতকাল সন্ধ্যায় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করে।

এ বিষয়ে এএম আমিন উদ্দিনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যে বিচারক (বিচারপতি ইমদাদুল হক আজাদ) এমন কথা বলেছেন, তিনি সংবিধান অনুযায়ী বিচারক হিসেবে যে শপথ নিয়েছেন, সেই শপথ তিনি ভঙ্গ করেছেন। আমি মনে করি তিনি (বিচারপতি) সংবিধানের বাইরে গিয়ে অসাংবিধানিক কথা বলেছেন, আন প্যারালাল মন্তব্য করেছেন। একজন বিচারকের এ ধরনের মন্তব্য সম্পূর্ণভাবে অসাংবিধানিক এবং এটা গর্হিত। কোনোভাবেই এটা সমর্থনযোগ্য নয়। আমি আশা করি প্রধান বিচারপতি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।’

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিচারপতির এ মন্তব্যের বিষয়টি নিয়ে বিকেলে প্রধান বিচারপতির কাছে অভিযোগ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন। বিচারপতির এমন মন্তব্য সংবলিত সংবাদ গণমাধ্যমে আসে। একপর্যায়ে বিচারপতিকে খাস কামরায় তলব করেন প্রধান বিচারপতি। এ সময় আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন।

আগামী রবিবার বিচারিক কর্মজীবন থেকে অবসরে যাচ্ছেন বিচারপতি ইমদাদুল হক আজাদ।

আদিলুর-এলানের কারামুক্তির বিষয়ে আইনজীবী : দুজনের আইনজীবী রুহুল আমিন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা এখন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। তাদের কারামুক্তিতে আপাতত কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, হাইকোর্টের জামিনের আদেশ বিচারিক আদালতে যাওয়ার পর সেখান থেকে নথি যাবে কারাগারে। এরপর মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রেজাউল করিম বলেন, ‘হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে কি না, তা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে।’

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে শাপলা চত্বর এলাকায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৬১ জনের মৃত্যুর তথ্য ওই বছরের ১০ জুন অধিকার তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। তদন্ত শেষে ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র আমলে নেয় আদালত। ২০১৪ সালের ৮ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে দুজনের বিচার শুরু হয়।