সব গুঞ্জন, জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গতকাল শুক্রবার বিকেলে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের সরে যাওয়ার গুঞ্জন সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার আলোচনায় আসে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করার পর অস্থায়ী দায়িত্ব নেবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন। রবিবার তার দেশে ফেরার কথা থাকলেও জরুরি বার্তায় তিনি ঢাকায় ফিরছেন এমন খবরে পরিষ্কার হয়ে ওঠে মো. সাহাবুদ্দিনের বঙ্গভবনের অধ্যায় শেষ হতে দেরি নেই। শেষ পর্যন্ত সেটাই ঘটল। স্পিকার গতকাল দুপুরে দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের খবর আসে হাফিজ উদ্দিন আহমদের মুখ থেকে।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান স্পিকার। সেখানে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট জবাব দেননি। বলেন, বিষয়টি নিয়ে তার কিছু জানা নেই। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে স্পিকারের কাছেই পদত্যাগপত্র দেবেন। সে ক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে।
সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত চিঠি পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। আবার ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সূত্র জানায় মো. সাহাবুদ্দিন সরে যাওয়ার পরপরই স্পিকারকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব নিতে হতো। এ কারণেই তার দেশে ফেরার পর গতকাল বিকেলে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়েছে। এদিকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ফোন করে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
পাশাপাশি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন।
সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর তাকে নিয়ে মবের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় তাৎক্ষণিক তিনি বঙ্গভবন ছাড়েননি। অন্যদিকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেও হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার হিসেবে যে বাসায় আছেন সেখানেই থাকবেন।’
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের আকস্মিক সরে যাওয়ার নেপথ্যের কারণ নিয়ে অনেক ধরনের জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি তিনি লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং এ কারণেই তাকে পদ ছাড়তে হয়েছে বলেও রয়েছে গুঞ্জন। তবে সরকারের পক্ষ এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন মো. সাহাবুদ্দিন : দায়িত্বে ইস্তফা দিয়ে স্পিকার বরাবর পাঠানো চিঠিতে মো. সাহাবুদ্দিন লিখেছেন, ‘আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করি। অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি।’
তিনি লেখেন, ‘৫ আগস্ট ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হয়। এ থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
শারীরিক অসুস্থতার উল্লেখ করে পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন লেখেন, “আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথিক’ রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।”
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ: জাতীয় সংসদ সবিচালয়ের শপথ কক্ষে গতকাল বিকেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ই প্রয়োজন হলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও নেওয়া থাকে। একইভাবে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। এখন স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণেই পদত্যাগ করেছেন।’
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্রের সঙ্গে চিকিৎসকদের কোনো সনদ দিয়েছেন কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, ‘একজন রাষ্ট্রপতি অসুস্থ হতে পারেন এবং তিনি লিখিতভাবে তার অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো চিকিৎসা সনদের প্রয়োজন নেই।’
বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের প্রতি তিনি সমর্থন ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন বলে মন্তব্য করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়াসহ সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগেই দুপুরের পর থেকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় নিরাপত্তা ও প্রটোকল ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী বা এসএসএফের গাড়িবহর জাতীয় সংসদ ভবনে পৌঁছায় এবং স্পিকারের চলাচলের জন্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নির্ধারিত ভিআইপি প্রটোকল প্রস্তুত করা হয়। বিকেল ৪টা ২৬ মিনিটের দিকে এসএসএফের প্রটোকলের গাড়ি এবং রাষ্ট্রপতির ব্যবহারের জন্য গাড়ি সংসদে পৌঁছায়। সেখানে একটি গাড়ি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির ব্যবহারের জন্য এবং এসএসএফের প্রটোকলের দুটি গাড়ি দেখা যায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল মো. সাহাবুদ্দিন পাঁচ বছরের জন্য দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সে হিসাবে তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।