বাংলাদেশে সফরত মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কীভাবে দায়িত্ব পালন করে। তারা কোনো দলের পক্ষে কাজ করে কি না, তাও জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনে সহিংসতা হবে কি না, তাও জানতে চেয়েছেন তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান মার্কিন প্রতিনিধিদলকে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে সব ধরনের নির্বাচনে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে।
গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
একইদিন আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদল জানতে চেয়েছে, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দল আসবে, কে আসবে না, তা নিয়ে আশঙ্কা আছে কি না। আইনমন্ত্রী তাদের বলেছেন, সরকার চায়, সব দল নির্বাচনে আসুক। কিন্তু কে নির্বাচনে আসবে, কে আসবে না, সেটা সেই দলের সিদ্ধান্ত।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের বলেন, দেশে যথাসময়ে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। নির্বাচন ছাড়া দেশে সরকার বদলের কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি বিএনপি নির্বাচনে আসবে যদি তারা সরকার বদল করতে চায়।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিনিধিদল আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে, নির্বাচনে সহিংসতার আশা করেন কি না? এমন প্রশ্নে আমরা বলেছি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা সহিংসতার শিকার হয়ে তা মোকাবিলা করেই আজকে এখানে এসেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশে আসতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি, এখন আমাদের দেশের মানুষ কোনো ধরনের সংঘর্ষ চায় না আর সংঘর্ষ হবেও না। কেননা আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতীত অভিজ্ঞতায় ৫ হাজার ৩১৫টি নির্বাচনে তারা দায়িত্ব পালন করেছে। পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিজিবি, সবাই পরীক্ষিত। আগামী নির্বাচনে ছয় লাখ আনসার মোতায়েন থাকবে। পুলিশ বেশি হয়তো থাকবে না। তবে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকেও নিয়োজিত করা হবে।’
আসাদুজ্জামান খান আরও বলেন, ‘আগের মতো দেশে সংঘর্ষ হবে না। উপমহাদেশে নির্বাচনের সময় একটি উৎসবের মতো অবস্থা হয়। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতেই প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি চান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে নির্বাচন হোক। আমাদের গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীন। এখানে দুর্নীতি ও ভোট চুরি করে কেউ পার পাবে না।’
সহিংসতার আশঙ্কা কেন বিদেশিরা করছে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনে রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং অফিসারদের ক্ষমতাও বলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের ৯৯৯ কল সেন্টার নিয়ে তারাও আশান্বিত হয়েছে।’
সমঝোতার বিষয়ে কোনো পার্টি বা ব্যক্তি যদি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করে সে ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে মার্কিন প্রতিনিধিদল জানতে চেয়েছিল বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট ভালো। আমি মনে করি বিএনপি নির্বাচনে আসবে। যদি বিএনপি সরকার বদল করতে চায়, তাহলে তাদের নির্বাচনে আসতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সংবিধানের বাইরে আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই।’
তিনি জানান, বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ফুটবলের খোঁজখবর নিয়ে প্রশংসাও করেছে মার্কিন প্রতিনিধিদল। তারা নিজেদের পর্যবেক্ষক পাঠাবে কি না, এ বিষয়ে কোনো কিছুই জানাচ্ছে না।
বারবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন প্রতিনিধিদল আসছেÑ এটিকে কীভাবে দেখছেন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবাইকে স্বাগত জানাই। তারা জিজ্ঞাসা করেছে সঠিকভাবে নির্বাচনটি করতে পারব কি নাÑ এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি অবশ্যই পারব। কোনো অভিযোগের বিষয়ে কথা হয়নি। তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে কি না, তা বড় নয় বরং যথাসময়ই নির্বাচন হবে।’
গতকাল দুপুরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলটি সচিবালয়ে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে। এরপর আনিসুল হক সাংবাদিকদের বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত বলেন। তিনি বলেন, ‘ওনারা জিজ্ঞেস করেছেন, নির্বাচনে কে আসবে না আসবে, এরকম আশঙ্কা করা হচ্ছে কি না। আমি বলেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার চায়, সব দল নির্বাচনে আসুক। কিন্তু কে নির্বাচনে আসবে, কে আসবে না, সেটি সেই দলের সিদ্ধান্ত।’ আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কোনো কথা হয়নি। সংলাপ নিয়েও প্রতিনিধিদল কিছু জিজ্ঞাসা করেনি।’
এক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। প্রতিনিধিদলকে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ব্যাপারে জনগণের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে।’
আনিসুল হক বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে কথা হয়েছে। প্রতিনিধিদলটির মূল বক্তব্য ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? পার্থক্যের বিষয়টি তাদের পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, আগামী সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর বিষয়টি মূল্যায়ন করতে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) ও ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) সমন্বয়ে গঠিত মার্কিন প্রতিনিধিদলটি গত শনিবার ঢাকায় আসে।