একটি ফৌজদারি মামলায় বিচারিক কার্যক্রমে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের পরও অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরুর উদ্যোগ নেন কুমিল্লার মুখ্য বিচারিক হাকিম (সিজেএম) সোহেল রানা। এ কারণে আদালত অবমাননার অভিযোগে তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদ-, পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ- ও সাত দিনের মধ্যে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে এ রায় দেওয়া হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত ওই বিচারক আপিল করবেন জানিয়ে জামিন চাইলে তাকে ৩০ দিনের জামিন দেয় হাইকোর্ট।
বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এসএম মাসুদ হোসাইন দোলনের হাইকোর্ট বেঞ্চ সাজা ও জামিনের এ আদেশ দেয়। তবে সাজা ও অর্থদ- স্থগিত চেয়ে বিচারকের পক্ষে আবেদনের পর বিকেলে তা স্থগিত হয়ে
যায়। সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ২০ নভেম্বর পর্যন্ত সাজা স্থগিতের নির্দেশ দেন। ওই তারিখে এ বিষয়ে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানি হবে।
আইনজীবীরা বলছেন, কর্মরত কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এবং সাজার ঘটনা এর আগে ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই।
মামলার নথি অনুযায়ী, ছয় বছরের বেশি সময় আগে কুমিল্লায় অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েজ ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) সরঞ্জাম ও ৫০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা উদ্ধারের পর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে দুজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ করা এ মামলায় আসামি করা হয় মো. মামুন চৌধুরী ওরফে মামুন ও তার স্ত্রী রিমা আক্তারকে। কিছুদিন কারাবাসের পর তারা জামিনে মুক্তি পান। এ মামলার বিচার কার্যক্রম বাতিল চেয়ে ওই বছরের অক্টোবরে দুজন হাইকোর্টে আবেদন করেন। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম বাতিল প্রশ্নে রুলসহ ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেয়। ২০১৯ সালের ৬ মার্চ আরেকটি আদেশে হাইকোর্ট রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ মামলায় স্থগিতাদেশ থাকবে বলে আদেশ দেয়।
তবে হাইকোর্টের এ আদেশ অগ্রাহ্য করে কুমিল্লার মুখ্য বিচারিক হাকিম সোহেল রানা গত ১০ এপ্রিল এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর উদ্যোগ নেন। বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন হাইকোর্টে দুই আসামির আইনজীবী প্রণয় কান্তি রায়। গত ১৪ আগস্ট হাইকোর্ট এক আদেশে বিচারক সোহেল রানাকে তলব করে কেন হাইকোর্টের আদেশ অবজ্ঞা করেছেন সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয়। ২১ আগস্ট তার হাজির হওয়ার দিন ধার্য ছিল। তবে হাইকোর্টে হাজির হয়ে বিচারক ব্যাখ্যা দিতে এক সপ্তাহ সময় চান। এরপর ২৮ আগস্ট তিনি হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেন। তবে হাইকোর্ট তার ব্যাখ্যায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে স্বতঃপ্রণোদিত রুল দেয়। রুলের জবাব দিতে গত ৯ অক্টোবর সময় নিয়ে গতকাল রুলের জবাব দেন সোহেল রানা। তার এ জবাবেও অসন্তাষ প্রকাশ করে হাইকোর্ট। একপর্যায়ে আদালত অবমাননার অভিযোগে তাকে কারাদ-, অর্থদ- ও আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
এ আদেশের পর হাইকোর্টের একই বেঞ্চে দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাজির হয়ে বিচারক আপিল বিভাগে আপিল করবেন জানিয়ে জামিনের আবেদন করেন। আদালত তাকে এক মাসের জামিন মঞ্জুর করে।
আদালত অবমাননার আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী প্রণয় কান্তি রায়। বিচারকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কেএম মাসুদ রুমী।
অ্যাডভোকেট প্রণয় কান্তি রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ মামলায় বিচার নিয়ে ওই বিচারক নানা ধরনের দৃষ্টিকটু আচরণ করেন। কখনো আসামিদের পলাতক দেখান। কখনো জামিন বাতিল করে তা আবার প্রত্যাহার করেন। একপর্যায়ে আসামি রিমাকে পলাতক দেখিয়ে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন তিনি। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের পরও বিচারকের এমন আচরণের বিষয়টি ভালোভাবে নেননি হাইকোর্ট। যে কারণে তাকে কারাদ- ও আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।’ তিনি বলেন, ‘অধস্তন আদালতে কর্মরত কোনো বিচারকের এর আগে সাজার ঘটনা ঘটেনি।’
জামিন আদেশের পর বিচারকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির একটি বিধান রয়েছে, যে আদালত সাজা দেয় আপিল ফাইল করার শর্তে সেই আদালত জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। আমরা সেই আবেদনটি নিয়ে গিয়েছিলাম। হাইকোর্টকে বলেছি, এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে এ শর্তে যেন বিচারকের জামিন মঞ্জুর করা হয়। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে জামিন মঞ্জুর করেছেন। তবে আপাতত এ সাজা বহাল থাকবে। সাজার বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আমরা আপিল করব।’
চেম্বার আদালতের স্থগিতাদেশের পর তিনি বলেন, ‘আদালত সাজা স্থগিত করেছেন। এ সময়ের মধ্যে আমরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) করব।’
আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বিচারকদের বৈঠক : বিচারক সোহেল রানাকে হাইকোর্টের দেওয়া সাজার বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে রাতে বৈঠক করেন অধস্তন আদালতের বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন প্রতিনিধি। রাজধানীর বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে বৈঠকটি হয়। সংগঠনের সভাপতি এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) নেতৃত্বে ৬-৭ জন বিচারক উচ্চ আদালতে বিচারকের সাজার বিষয়টি আইনমন্ত্রীকে অবহিত করে সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আইনমন্ত্রী তাদের বক্তব্য শুনে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। আইনিপন্থায় কীভাবে বিষয়টি সমাধান করা যায় তা দেখবেন বলে বিচারকদের আশ্বস্ত করেন আনিসুল হক।