হামাসের হামলার পর গাজায় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। গত বুধবার জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে গাজার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র। যার কারণে গাজার লাখো বাসিন্দা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ছাড়াও খাদ্য এবং পানিসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। কিন্তু হামলা বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। আলজাজিরা বলছে, গত পাঁচ দিনে গাজায় চার হাজার টন ওজনের ছয় হাজারটি বোমা ফেলেছে, যা শহরটির ১ হাজার ৪১৭ জন মানুষের প্রাণ নিয়েছে ইতিমধ্যে। আহত হয়েছে ছয় হাজারের বেশি মানুষ। হাসপাতালগুলোতেও জায়গা নেই। যারা হাসপাতলে আছে তাদেরও জীবন শঙ্কায়। এ ছাড়া শহরটির প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে দাবি করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির ভাষ্য, সময় যত যাচ্ছে, গাজার বাসিন্দাদের জন্য বেঁচে থাকা ততই কষ্টকর হয়ে উঠছে। তাই গাজা উপত্যকায় ত্রাণ এবং ওষুধ সরবরাহ করার জন্য নিরাপদ করিডর দেওয়া উচিত বলে মনে করে জাতিসংঘ। প্রথম দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়টি নিয়ে একপক্ষীয় অবস্থানে থাকলেও তারা মানবিক করিডর খোলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত হামাস তাদের বন্দিদের মুক্তি না দেবে ততক্ষণ গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করে রাখবেন তারা। গতকাল সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, কোনো ইলেকট্রিক্যাল সুইচ অন করা হবে না, পানির হায়ড্রান্ট খোলা হবে না এবং জ্বালানির কোনো ট্রাক প্রবেশ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত বন্দিদের মুক্তি দেওয়া না হবে।
গত শনিবার হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের বেশ কয়েকজন বেসামরিক মানুষ এবং সেনাকে ধরে নিয়ে যায় হামাস। সেই হামলার পর হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইসরায়েলের কারাগারে যেসব ফিলিস্তিনি বন্দি আছে, তাদের মুক্তি দিলে ইসরায়েলি বন্দিদের ছেড়ে দেবে তারা। আর ইসরায়েল যদি বেসামরিকদের ওপর বিমান হামলা বন্ধ না করে তাহলে তাদের হাতে যেসব ইসরায়েলি বন্দি আছে, তাদের হত্যা করা হবে এবং সেগুলো ভিডিও করে প্রকাশ করা হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, হামাস কমপক্ষে ১০০ ইসরায়েলিকে ধরে নিয়ে গেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, তারা ৯৫টি পরিবারের সন্ধান পেয়েছে যেগুলো থেকে এক বা একাধিক সদস্যকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর হামলার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত তাদের নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে।
যার জবাবে ‘যতক্ষণ পর্যন্ত গাজায় একজন হামাস সদস্য থাকবে ততক্ষণ অভিযান চলবে’ বলে ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র জোনাথন কারিকাস বিবিসিকে বলেছেন, ২০ বছর আগে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে হামাস গাজা শহর এবং সেখান থেকে খান ইউনুছ হয়ে রাফাহ পর্যন্ত হামাস টানেলের একটা বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।
তার ভাষায়, গাজা শহরে দুটি স্তর রয়েছে। ওপরের স্তরে সাধারণ মানুষ বসবাস করে। আর ভূগর্ভস্থ স্তরে বাস করে হামাসের সদস্যরা। তিনি বলেন, এখন আমরা হামাসের তৈরি করা সেই দ্বিতীয় স্তরে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
তবে ইতিমধ্যে গাজার মানবিক পরিস্থিতি ক্রমে মরিয়া হয়ে উঠছে। রেড ক্রস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে গাজার হাসপাতালগুলো মর্গে বা মৃতদেহ রাখার স্থানে পরিণত হয়ে উঠতে পারে। এসব হাসপাতাল এখন জেনারেটর দিয়ে চলছে। কিন্তু আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে যেতে পারে। উপত্যকার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে হাজার হাজার আহত রোগীতে পূর্ণ হয়ে গেছে। কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ওষুধ শেষ হয়ে আসছে।
এদিকে ইসরায়েল গাজা সীমান্তে সেনা জড়ো করেছে। এদের মধ্যে নিয়মিত সৈন্যের পাশাপাশি তিন লাখের মতো সংরক্ষিত সৈন্য রয়েছে। আরও সৈন্য আনছে ইসরায়েল। সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেছেন, এখন গাজার ভেতরে অভিযান চালানো হবে কি না, সেই বিষয়ে এখনো কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধ করার জন্য সম্ভাব্য সব বিকল্প বিবেচনায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গাজার পাশাপাশি লেবানন সীমান্তেও সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে।
বর্তমানে মিসরের অংশ ছাড়া গাজার তিনদিক ঘিরে রেখেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ইসরায়েলের সঙ্গে সীমান্ত পয়েন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাগরের দিকে পাহারা দিচ্ছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। শুধু মিসরের রাফাহ ক্রসিং থেকে সে দেশে প্রবেশ করা যাচ্ছে। কিন্তু সেজন্যও অনুমতি দরকার হচ্ছে এবং দীর্ঘ লাইনের তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার সেখানেও বিমান হামলা করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। এরপর থেকে ওই ক্রসিং বন্ধ বা সীমিত চলাচল অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধকালীন সরকার গঠন করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। রাজনৈতিক বৈরিতা সরিয়ে রেখে বিরোধী নেতা বেনি গাৎজকে সঙ্গে নিয়ে বুধবার তিনি যুদ্ধকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। গাৎজ বলেছেন, এখন যুদ্ধের সময় এবং নতুন সরকার পৃথিবী থেকে হামাস নামের সবকিছু সরিয়ে দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেছেন, সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে বিরোধী দলগুলো পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে যাবে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বুধবার টেলিফোনে ইসরায়েল-গাজা সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন। তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দুই বছর আগে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরুর পর এই প্রথম এ ধরনের টেলিফোন আলাপের কথা প্রকাশ্যে জানা গেল। ইরানের গণমাধ্যম বলেছেন, প্রেসিডেন্ট রাইসি ও যুবরাজ মোহাম্মদ ‘ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সৌদি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ বলেছে, সৌদি যুবরাজ নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমান উত্তেজনা নিরসন করতে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সব পক্ষের সঙ্গে সবরকমের যোগাযোগ করছে সৌদি আরব।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলে পৌঁছেছেন। তেল আবিবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন ব্লিঙ্কেন। আলোচনা শেষে যৌথ বিবৃতিতে তিনি বলেন, যতদিন আমেরিকা থাকবে, ততদিন ইসরায়েলকে একা লড়াই করতে হবে না। আলোচনা শেষে প্রথম বিবৃতি দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এর পরের বক্তৃতায় ব্লিঙ্কেন বলেন, তিনি ইসরায়েলে ফিরে আসার জন্য আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। অবিশ্বাস্যভাবে এ জাতির জন্য এটি কঠিন মুহূর্ত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সমগ্র বিশ্বের জন্যও কঠিন সময়। তিনি বলেন, আমি ইসরায়েলের কাছে যে বার্তাটি নিয়ে এসেছি তা হলো আপনি নিজেকে রক্ষা করার জন্য নিজের পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী হতে পারেন, তবে যতদিন আমেরিকা থাকবে, আপনাকে কখনই একা লড়তে হবে না। আমরা সবসময় আপনারদের পাশে থাকব।
বিবিসি বলছে, এ সফরে ইসরায়েলি কর্মকর্তা আর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করবেন ব্লিঙ্কেন। যুক্তরাষ্ট্রের যে নাগরিকদের হামাস জিম্মি করে রেখেছে, তাদের মুক্তির বিষয়টিও ব্লিঙ্কেনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।