সিন্ধুকে বিন্দুতে ধরার বৃক্ষবিলাস

গাছ প্রাণিজগৎকে দেয় মূল্যবান অক্সিজেন, ক্ষুধার খাদ্য, মনোহরী ফুলের শোভা। মানুষের বৃক্ষপ্রীতির ইতিহাস সুপ্রাচীন। বনসাই বৃক্ষবিলাসের ইতিহাসও আজকের নয়। ফারাওদের বনসাই চর্চার ইতিহাস পাওয়া গেছে। অধ্যবসায়, চর্চা আর গভীর মনোযোগের সঙ্গে বিন্দুতে সিন্ধু ধারণের শিল্প বনসাই জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে আজও। লিখেছেন টি এইচ মাহির

গাছ মানুষের অন্যতম বন্ধু। মানুষের অতি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন আসে গাছ থেকে। ফল-মূল সরবরাহের পাশাপাশি গাছ আমাদের দেয় ছায়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগে গাছ ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই উদ্ভিদ বা গাছের সঙ্গে আমাদের সখ্য বহু পুরনো। সেই গাছকে শিল্প হিসেবে ব্যবহার করার ইতিহাসও বেশ পুরনো। তেমনই এক শিল্প বনসাই। বিশাল আকার গ্রহণে সক্ষম এমন প্রজাতির কোনো গাছকে নিয়ন্ত্রিত পরিচর্যার মাধ্যমে একই আকৃতির ক্ষুদ্র আকারদানের শিল্পই বনসাই। বাসস্থান সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয় এই শিল্প। প্রায় হাজার বছরের পুরনো এই বৃক্ষবিলাস এখনো ভীষণ জনপ্রিয়।

‘বনসাই’ জাপানি শব্দ। এটি এসেছে চীনা শব্দ ‘পেনজাই’ থেকে। বড় কা-যুক্ত ও লম্বা যে গাছ খাটো করে টবে বা পাত্রে চাষ করা হয় বা বেড়ে ওঠে তাকে ‘বনসাই’ বলা হয়। বনসাই শব্দের ‘বন’ শব্দটি দ্বারা যে পাত্রে বনসাই রাখা হয় তাকে বোঝায়। বনসাই অর্থ ‘পাত্রের মধ্যে গাছ’। খাটো এবং ছোট আকারে চাষ করা গাছগুলো বনসাই নামে পরিচিত। যেসব গাছের বৃদ্ধি ধীরে ধীরে হয়, গাছের কান্ড মোটা হয় সেগুলোকে বনসাই করা হয়। যেমন বটগাছ, তেঁতুলগাছ, শিরিষগাছ, নিমগাছ ইত্যাদি গাছের বনসাই করা হয়।

বনসাই গাছের ইতিহাস পাওয়া যায় প্রাচীন মিসরে। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় পাত্রে বা টবে বিভিন্ন ধরনের গাছের চারা উৎপাদন করা হতো। মিসরের ফারাওরা তাদের বাগানে পাত্রের মধ্যে খেজুর, জলপাই ও অন্যান্য গাছের চাষ করত। প্রাচীন ভারতেও টবে গাছ পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়। কিন্তু টবে গাছের বনসাই করার প্রচলন শুরু হয় প্রথম চীনে। প্রায় হাজার বছর আগে প্রাচীন চীনে বনসাই চর্চার উৎপত্তি হয়। চীনা ভ্রমণকারীরা পাহাড়ের চূড়ায় দেখতে পেতেন বড় গাছের আকৃতির মতো ছোট ছোট গাছ। আবহাওয়ার কারণে ছোট হয়ে যাওয়া গাছগুলো তারা সংগ্রহ করে নিয়ে আসতেন। চীনা ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল বৃহৎ গাছগুলোকে ছোট আকারে রূপ দিলে এক ধরনের অতিপ্রাকৃত শক্তি এতে জন্ম নেবে। তারা এর নাম দিয়েছিলেন ‘পেনজাই’, যেখানে পেন হলো ছোট থালা বা ট্রে আকৃতির পাত্র।

চীনাদের বামন আকৃতির গাছ তাদের বিভিন্ন চিত্রকর্মেও খুঁজে পাওয়া যায়। তারা এমনভাবে বনসাই তৈরি করতেন যেন গাছগুলোর শিকড়ের সঙ্গে বিভিন্ন পৌরাণিক জীবের সাদৃশ্য থাকে। চীনের পেনজাই জাপানে এসে হয়ে যায় বনসাই। পেনজাই জাপানে আসে চীনা সন্ন্যাসীদের হাত ধরে। চীনের সন্ন্যাসীরা জাপানে গিয়েছিলেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। তারা উপহার হিসেবে সঙ্গে করে নিয়ে যান ছোট ছোট বনসাই গাছ। জাপানিরা এই বিশেষ আকারের গাছকে দেখে মুগ্ধ হয়, সাদরে গ্রহণ করে। জাপানে একে পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। পরে জাপান থেকে বনসাই ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। দুনিয়াব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বৃক্ষবিলাসের বনসাই শিল্প।

বাংলাদেশেও বনসাই বেশ জনপ্রিয়। একটু খরুচে হলেও শৌখিন মানুষজন বনসাই কেনেন, ঘরে লালন-পালন করেন। বনসাই লালন-পালনের জন্য দরকার হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ। বনসাই চর্চাকারীরা নেন এসব প্রশিক্ষণও। দেশ-বিদেশে বনসাই নিয়ে গড়ে উঠেছে নানা সংগঠন। বাংলাদেশেও বনসাই নিয়ে সংগঠন আছে ‘বাংলাদেশ বনসাই সোসাইটি’ নামে।

বনসাই চর্চার শুরুতে প্রথমে গাছের বৈশিষ্ট্য জেনে নিতে হবে। বনসাই চাষের ক্ষেত্রে দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। তারপর মাটির সঙ্গে জৈব সার যুক্ত করতে হবে। মাটিতে বিভিন্ন উপাদান যোগ করে বনসাইয়ের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়। কম্পোস্ট সার, ইটের গুঁড়া, বালি, পাথরের গুঁড়া, পোড়ামাটির গুঁড়া, ছাই ইত্যাদি মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই বিশেষ মাটি। টবের নিচে দুটো ছিদ্র রাখা হয় যেন অপ্রয়োজনীয় পানি সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হয়। বনসাই গাছের জন্য চারা বীজ ও কলম থেকে সংগ্রহ করা যায়। চাইলে নার্সারি থেকেই এই চারা সংগ্রহ করতে পারেন। তারপর ছোট টবে স্থাপন করতে হবে চারাটি। বনসাইয়ের জন্য ছোট টবই যথেষ্ট। খেয়াল রাখতে হবে যেন অবশ্যই টবের নিচে দুটো ছিদ্র থাকে। বনসাই রোপণ করা হয় সাধারণত বর্ষাকালে।

বনসাইয়ের চারা বিভিন্ন নার্সারিতে পাওয়া যায়। তা ছাড়া বিভিন্ন সময় কৃষি প্রদর্শনীতেও চারা পাওয়া যায়। বট, বকুল, শিমুল, পাকুড়, তেঁতুল, শিরিষ, বাবলা ইত্যাদি গাছ থেকে বনসাই তৈরি করা যায় বাংলাদেশে। বনসাইয়ের চারা বিভিন্ন দামের হয়ে থাকে। তিন হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা দামের হয়ে থাকে বনসাইয়ের চারা। বয়স অনুসারে বনসাইয়ের দাম কমবেশি হয়। যে বনসাইয়ের যত বয়স তার দাম তত বেশি। নিয়ম মেনে পরিচর্যা করলে সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে বনসাই।