মুজিবনগর সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে অস্ত্র ও জনবলের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ছিল বিমানবাহিনী। কিন্তু সীমিত অনুষঙ্গ দিয়েই অসীম সাহসিকতা ও দক্ষতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর মিলিত শক্তির বিজয় ত্বরান্বিত করে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিভিন্ন অপারেশনের সমন্বিত নাম কিলো ফ্লাইট। এই সাংকেতিক নামের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত মুক্তির আগুনপাখি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বীরত্বগাঁথা।
মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথবাহিনী গঠনের আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের রণকৌশল ছিল গেরিলা পদ্ধতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্ষতিসাধন, তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া, রাস্তাঘাট, ব্রিজের ক্ষতিসাধন করে সৈন্য, জ¦ালানি ও খাদ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটানো। অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এই ভূমিকা পালন করলেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জ¦ালানি ডিপো বা জ¦ালানি ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা যাচ্ছিল না। কারণ সেগুলো ছিল কঠোর প্রহরাধীন, যা গেরিলা বাহিনীর আক্রমণের উপযোগী নয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যেমন তাদের বিমানবাহিনীর সহযোগিতা পাচ্ছিল মুক্তিযোদ্ধারা সেই সহায়তা পাচ্ছিলেন না। মুক্তিবাহিনী বিমান শাখার অভাব অনুভব করছিল। সেই উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিদ্রোহী বাঙালি বৈমানিক ও প্রকৌশলীরা একত্রিত হন ভারতের ডিমাপুরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত এক জঙ্গলঘেরা রানওয়ের পাশে তারা গড়ে তোলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি ইউনিট। যার সাংকেতিক নাম কিলো ফ্লাইট।
১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এয়ার কমোডর একে খন্দকারের নেতৃত্বে ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে, ১৭ জন অফিসার, ৫০ জন টেকনিশিয়ান, ২টি বিমান ও ১টি হেলিকপ্টার দিয়ে এই বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়।
ভারতের সহায়তায় জীর্ণ দুটি বিমান ও একটি হেলিকপ্টার নিয়ে এই বাহিনী যাত্রা শুরু করে। একটি হলো কানাডার তৈরি ডিএইচসি থ্রি অটার বিমান। এ ধরনের বিমান সাধারণত বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা হতো। এই বিমানের পেছনের দরজা খুলে বসানো হয় মেশিনগান। খুলে ফেলা হয় মেঝের পাটাতন। যুক্ত করা হয় ২৫ পাউন্ডের ১০টি বোমা। বোমাগুলো ফেলতে হতো হাত দিয়ে।
অপর বিমানটি ছিল যোধপুরের মহারাজা গজ সিং-এর ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিমান। এটি ছিল আমেরিকার তৈরি ডাকোটা বা ডিসি-থ্রি বিমান। এটি কেবল পরিবহন কাজেই ব্যবহৃত হতো।
হেলিকপ্টারটি ছিল ফ্রান্সের তৈরি ছোট আকৃতির একটি অ্যালুয়েট-থ্রি হেলিকপ্টার। এটিও মূলত বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হওয়া যান। এর দরজা খুলে লাগানো হলো, টু ব্যারেল থ্রি-নট-থ্রি ব্রাউনিং মেশিনগান ও পাখার নিচে লাগানো হলো দুটি রকেট পড। এতে ৭টি করে মোট ১৪টি রকেট রাখার ব্যবস্থা ছিল। আর পেছনে ২৫ পাউন্ড ওজনের বোমা হাত দিয়ে ফেলার জন্য বম্ব র্যাক লাগানো হলো। নতুন এসব সরঞ্জাম লাগানোর ফলে হেলিকপ্টারের ওজন গেল বেড়ে। ফলে এটি খুব উঁচুতে উড়তে পারত না। তাই নিচ থেকে আসা গুলি ঠেকাতে ফ্লোরে লাগানো হলো এক ইঞ্চি পুরু স্টিল প্লেট।
পরিবর্তিত বিমানে প্রশিক্ষণের জন্য গ্রহণ করা হলো বিশেষ ব্যবস্থা। প্রশিক্ষণ শুরু হলো রাতে। কারণ এই দুর্বল বিমান দিয়ে দিনের আলোতে আক্রমণ সম্ভব নয়। তাই সিদ্ধান্ত হলো রাতে আক্রমণ করা হবে। অভ্যস্ত হওয়ার জন্য রাতেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলো। জিপিএস বলতে একটি কম্পাস, চাঁদের আলো আর অনুমান ছাড়া কিছুই ছিল না। ট্রেনিং চলল ৬৬ দিন।
তারপর অপেক্ষা। দীর্ঘ সময় পরে নির্দেশ আসল চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে পাকিস্তানি বাহিনীর বড় দুটি তেলের ডিপো ধ্বংস করতে হবে। এসব ডিপোতে মজুদ ছিল বিপুল পরিমাণ জ¦ালানি তেল। ধ্বংস করতে পারলে শেষ হয়ে যাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর টিকে থাকার সব পথ।
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। গভীর রাতে মণিপুর থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি অটার বিমান চট্টগ্রামের পতেঙ্গার উদ্দেশ মাটি ছাড়ল। সেখানে ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল ডিপো। সেটি ধ্বংস করতে হবে। কিছুক্ষণ পর পাড়ি জমালো আগরতলার তেলিয়ামুড়া থেকে অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার। গন্তব্য নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল তেলের ডিপো। উদ্দেশ্য একই পাকিস্তানি বাহিনীর স্থল, নৌ আর আকাশযানগুলোর জ¦ালানি সরবরাহ হয় এসব ডিপো থেকে। ডিপো দুটি ধ্বংস হলে তাদের জ¦ালানি সংকট দেখা দেবে। এই তেলের ডিপো দুটি স্থলভাগের সেক্টর গেরিলারা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করলেও কড়া নিরাপত্তার জন্য তা সম্ভব হয়নি।
অটারের আরোহী ছিলেন ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন, ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম। অটার মনিপুরের কৈলাশহর থেকে দক্ষিণ-পূর্বে উড়ে বঙ্গোপসাগরে এসে সমুদ্র ধরে চট্টগ্রাম পৌঁছে, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শুরু করে রকেট আক্রমণ। প্রায় একই সময়ে অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার পৌঁছে যায় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে। অ্যালুয়েটটি পরিচালনায় ছিলেন কিলো ফ্লাইটের কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ক্যাপ্টেন সাহাব উদ্দিন ও ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম। তারা আগরতলার তেলিয়ামুড়া থেকে উড়ে ইলিয়টগঞ্জ হয়ে ঢাকা-কুমিল্লা মহাসড়ক ধরে ডেমরা পৌঁছান। তারপর দক্ষিণে মোড় নিয়ে সোজা গোদনাইল। পৌঁছে তেলের ট্যাংকারের ওপর বোমা নিক্ষেপ করেন। মুহূর্তের মধ্যেই ট্যাংকারগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ গ্রাস করে ফেলে। পাকিস্তান বাহিনী কিছু বুঝে ওঠার আগেই অটার আর অ্যালুয়েট মিশন শেষ করে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছে যায়। বিমানবাহিনী পাকিস্তানি লক্ষ্যের ওপর বারোটিরও বেশি সফল আক্রমণ চালায়, যার ফলে ত্বরান্বিত হয় বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়।
সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ব্রিগেডভিত্তিক ইতিহাস-মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
