বিধ্বস্ত গাজা ‘দখল’ শুরু!

গাজার উত্তর থেকে ১১ লাখ ফিলিস্তিনিকে সরতে বলেছে ইসরায়েল। আকাশ থেকে ফেলা লিফলেটে দেখা গেছে এজন্য ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই অসংখ্য মানুষ গাজা ছাড়তে শুরু করেছে। কেউ গাড়িতে, কেউ গাধার পিঠে, কেউবা হেঁটেই রওনা দিয়েছে নিরাপদ গন্তব্যের উদ্দেশে। জাতিসংঘের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী তাদেরও জানিয়েছে, গাজার উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত সব মানুষকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হোক। বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, গাজায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টানেলে আশ্রয় নেওয়া হামাস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযানের অংশ হিসেবেই সাধারণ জনগণকে সরিয়ে নিতে বলেছে ইসরায়েল। তবে কারও কারও ভাষ্য, ইসরায়েলের এ পদক্ষেপ নতুন করে গাজা দখলের প্রক্রিয়া।

গত শনিবার ইসরায়েলে হামাসের সশস্ত্র সদস্যরা অতর্কিত হামলা চালানোর পর থেকে গাজায় বিমান হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। হামলা-পাল্টা হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ১ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে। গাজায় আহত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। অন্যদিকে ইসরায়েলে হামাসের হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি। সেখানেও কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এ ছাড়া হামাস ১৫০ জন ইসরায়েলিকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে গেছে।

এ পরিস্থিতিতে লাগাতার বিমান হামলার পাশাপাশি ইসরায়েল একটি স্থল অভিযানও শুরু করেছে। হামাসের হামলার পর থেকেই গাজা সীমান্তে সেনা মোতায়েন, ভারী আর্টিলারি এবং ট্যাংক জড়ো করতে শুরু করে তারা। শুক্রবার বিকেলের পর থেকে শুরু করে স্থল অভিযান।

গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১২টার দিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর বরাতে জানায়, ইসরায়েলের পদাতিক বাহিনী ও ট্যাংক গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করেছে। আগামী দিনগুলোতে তারা গাজা শহরে ‘উল্লেখযোগ্য’ অভিযান চালাবে। পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বেসামরিক নাগরিকরা ফিরে আসতে পারবেন না।

জাতিসংঘ বলছে, গাজার উত্তর এলাকার প্রায় ১১ লাখ মানুষ বসবাস করে, যা পুরো গাজা উপত্যকায় বসবাসরত মানুষের প্রায় অর্ধেক। এ অঞ্চলের মধ্যে ঘনবসতিপূর্ণ গাজা শহরও রয়েছে। তাদের এলাকা ছাড়ার সতর্কতা গাজা ও জেরুজালেমের স্থানীয় সময় মধ্যরাতের আগে জারি করা হয়।

গতকাল এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ বলে, মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ছাড়া এ ধরনের স্থানান্তর সম্ভব নয়। অবশ্য জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের কূটনীতিক গিলাদ এরদান, গাজা থেকে বাসিন্দাদের স্থানান্তরের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের স্থানান্তরের নির্দেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক এ সংগঠনটির বিবৃতি লজ্জাজনক। হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় যাতে জড়িত নয় এমন বাসিন্দাদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়, তার জন্য গাজার বাসিন্দাদের আগে থেকেই সতর্ক করেছে ইসরায়েল।

তার ভাষ্য, অনেক বছর ধরে জাতিসংঘ হামাসের সশস্ত্র হয়ে ওঠা, গাজা উপত্যকায় বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনাকে পালানোর আশ্রয় এবং অস্ত্র ও হত্যা লুকানোর আশ্রয় হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। আর এখন ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে, যাদের নাগরিকদের হামাস হত্যা করেছে, সেই ইসরায়েলকে কথা শোনাচ্ছে। এখন জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা, হামাসের নিন্দা জানানো এবং ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর ফোকাস করাটাই জাতিসংঘের জন্য ভালো হবে।

ইসরায়েল বলেছে, গত ছয় দিনে গাজায় হামাসের স্থাপনা লক্ষ্য করে চার হাজার টন ওজনের প্রায় ছয় হাজার বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইসরায়েলের বিমানবাহিনী বলেছে, বিমান হামলায় ৩৬ হাজারের বেশি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির পার্লামেন্টে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, কঠিন সময় আসছে।

জাতিসংঘ বলেছে, গাজায় শোচনীয় অবস্থা চলছে, কারণ খাবার এবং পানি দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় ৫০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রয়োজনীয় কোনো সেবা গ্রহণ করতে পারছে না।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন শুক্রবার ইসরায়েল সফর করেন। এ সময় তিনি হামাসের হামলায় নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনেরও শুক্রবার ইসরায়েল সফর করার কথা জানা গেছে। এক দিন আগেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের ইসরায়েল সফরের পরদিনই তিনি দেশটি সফর করছেন।

এদিকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজা ও লেবাননে বিতর্কিত সাদা ফসফরাস বোমা ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে। অতিদাহ্য এ রাসায়নিক অনেক সময় সামরিক বাহিনী তাদের সীমান্ত নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু এটা মানুষকে মারাত্মকভাবে পুড়িয়ে দিতে পারে। আর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিশেষ করে গাজার মতো এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যবহার করা হলে, এটি মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, বর্তমানে গাজায় সাদা ফসফরাসযুক্ত অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে তারা সচেতন নন।

এইচআরডব্লিউ বলছে, তারা গাজা এবং লেবাননে ধারণকৃত ভিডিও দেখে তা বিশ্লেষণ করে সাদা ফসফরাসযুক্ত আর্টিলারি শেল বিস্ফোরিত হতে দেখেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপির তোলা ছবিতেও এর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ছবিতে উঠে এসেছে, গাজায় বিস্ফোরিত হওয়ার সময় সাদা রেখা তৈরি হয়েছে।

এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংস্থাটি বলে, গাজায় সাদা ফসফরাসের ব্যবহার বেসামরিক নাগরিকদের ঝুঁকি অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয় এবং তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন, যেখানে বেসমারিক নাগরিকদের বিনা কারণে ঝুঁকি বাড়ানোর বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সাদা ফসফরাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি কারণ এর বৈধ ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে এর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এদিকে ব্রাসেলসে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াব গ্যালান্ট নেটোভুক্ত পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নেটো জোট হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়ে একে অযৌক্তিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতি তারা সমানুপাতিক হারে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সহায়তার প্রশ্নে নেটো জোটভুক্ত দেশগুলো জানায়, তারা ইসরায়েলকে বাস্তবিক সহায়তা দিচ্ছে। একটি গ্রিক যুদ্ধজাহাজ পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করার খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধজাহাজটির ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে অবস্থান নেওয়ার কথা রয়েছে। জার্মানি বলেছে, তাদের দুটি সশস্ত্র যুদ্ধ ড্রোন ইসরায়েলি বাহিনী এরই মধ্যে ব্যবহার করেছে।

জাতিসংঘের কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যান অ্যাফেয়ার্স বিভাগ ফিলিস্তিনি মানুষদের জন্য অতি জরুরি প্রয়োজন উল্লেখ করে ২৯৪ মিলিয়ন ডলার সহায়তার জরুরি আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এই অর্থ ১২ লাখ মানুষের সহায়তায় ব্যবহার করা হবে। এর আগে জাতিসংঘ বলেছিল, ২০২৩ সালে ফিলিস্তিনে ত্রাণ সহায়তার জন্য ৫০২ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। তবে এর অর্ধেকও এখনো পূরণ হয়নি।