ইংলিশদের সামনে নড়বড়ে আফগানিস্তান

বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে ইংল্যান্ড আজ তাদের তৃতীয় ম্যাচ খেলতে নামবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। দিল্লির অরুন জেটলি স্টেডিয়ামে বেলা আড়াইটায় শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটিতে ইংলিশরা চাইবে কোনো অঘটন ঘটতে না দিতে। ইংলিশরা আগের দুই ম্যাচে এক হার, এক জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে আজ মাঠে নামবে পঞ্চমে থেকে। অন্যদিকে পরপর দুই হারে আফগানিস্তান রয়েছে তালিকার তলানিতে।

ইংল্যান্ড এই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট। দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখে তারা। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজ তারা জিতেছিল ৩-১ ব্যবধানে। তবে কিউইরা বিশ্বকাপের শুরুর ম্যাচেই সিরিজ হারের প্রতিশোধ নেয় ৮২ বল হাতে রেখে ৯ উইকেটের জয়ে। গত কয়েক বছর ধরেই ইংলিশরা ব্যাটে-বলে খেলছে অসাধারণ ক্রিকেট। তর্কাতীতভাবে তারা বিশ্বকাপে এসেছে শিরোপার বড় দাবিদার হিসেবে। তবে কিউইদের কাছে প্রথম ম্যাচে একেবারেই সাধারণ মানে নেমে এসেছিল দলটি। ব্যাটাররা ২৮২ রানের পুঁজি এনে দিলেও অভিজ্ঞ স্টুয়ার্ট ব্রড ও জেমস এন্ডারসনবিহীন ইংলিশ বোলিং ইউনিট মাত্র ১ উইকেট শিকার করতে পারে কিউইদের। সেই হারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে দ্বিতীয় ম্যাচে তারা সামনে পেয়েছিল বাংলাদেশকে। সেই ম্যাচেই ইংল্যান্ড ফিরেছে কক্ষপথে। ডাভিড মালানের ১০৭ বলে ১৪০, জো রুটের ৮২ আর জনি বেয়ারেস্টোর হাফ সেঞ্চুরিতে ইংলিশরা জমা করে ৩৬৪ রানের বিশাল সংগ্রহ। এরপর রিস টপলির ৪৩ রানে চার উইকেট শিকারে বাংলাদেশকে ২২৭ রানে গুটিয়ে ১৩৭ রানের বড় জয়ে ঘুড়ে দাঁড়ায় থ্রি-লায়নরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে ফিরে পাওয়া ফর্ম ইংলিশদের জন্য বাকি সময়টায় ধরে রাখা ভীষণ জরুরি। আজকের পর তাদের সামনে বড় বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হবে দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, ভারতের মতো প্রতিপক্ষ।

বিশ্বকাপের আগেই আফগানদের দুর্দশার শুরু। পাকিস্তানের কাছে ৩-০ তে সিরিজ হারের পর তারা পারেনি এশিয়া কাপের সুপার ফোরে উঠতে। বিশ্বকাপেও সেই বাজে ফর্মটা বয়ে বেড়াচ্ছে আফগানরা। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৫৬ রানে গুটিয়ে যায়। যা বাংলাদেশ প্রায় ১৫ ওভার হাতের রেখে টপকে যায়। সেই হারের হতাশা স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে পরের ম্যাচে ভুলতে পারেনি আফগানরা। ম্যাচটা তারা হেরেছে ৮ উইকেটে। তবে হারলেও ইতিবাচক অনেক কিছুই খুঁজে পেয়েছে হাশমতউল্লাহ শাহিদির দল। অধিনায়ক ৮৮ বলে ৮০ রানের ইনিংস খেলেছেন। আজমতউল্লাহ ওমরজাইও ভালো ব্যাট চালিয়ে ৬২ রান করেছেন। আর বল হাতে রশিদ খান জাত চিনিয়েছেন ২ উইকেট শিকারে। আফগানরা খানিকটা দুর্ভাগাই। বিশ্বকাপের শুরুতেই তাদের দিতে হচ্ছে একের পর এক বড় পরীক্ষা। আজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তাই তাদের ব্যাটে-বলে জ্বলে ওঠার বিকল্প নেই। নইলে আরেকটি বড় হারের সঙ্গে সখ্য গড়তে হবে।

ইংলিশদের এখন আর টপ অর্ডার নিয়ে সেভাবে ভাবনার কিছু নেই। বড় রানের পুঁজি পেতে যাদের ওপর ছিল নির্ভরতা, সেই বেয়ারস্টো, মালান, রুটরা বাংলাদেশের বিপক্ষেই ছন্দে ফিরেছে। বাংলাদেশের চার উইকেট নিয়ে আজকের একাদশে খেলা অনেকটা নিশ্চিত মইন আলির জায়গায় খেলতে নামা টপলির। মইনের অবশ্য আজ ফেরার সম্ভাবনা প্রবল। সেক্ষেত্রে স্যাম কারেনকে হয়তো যেতে হবে বেঞ্চে।

ভারতের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে উইকেট না পেলেও আফগান বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ছিলেন নাভিন-উল-হক। সেক্ষেত্রে আজও তার খেলা নিশ্চিত। তবে আফগানরা তাকিয়ে আছে অভিজ্ঞ মোহাম্মদ নবির দিকে। এই অলরাউন্ডার এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে নিজের ফর্মের স্বাক্ষর রাখতে পারেননি। রহমানউল্লাহ গুরবাজ ও ইব্রাহিম জাদরান দুই ম্যাচেই ভালো শুরু এনে দেওয়ায় আফগানদের ইংলিশ কোচ জোনাথন ট্রটকে এখনই বিকল্প ভাবতে হচ্ছে না। তবে টপ অর্ডারে বিকল্প হিসেবে তার ভাবনায় সবসময় আছেন রিয়াজ হাসান।

আফগানদের এখনো ইংল্যান্ডে গিয়ে খেলার সৌভাগ্য হয়নি। নিজেদের ভেন্যুতেই ব্রাত্য বলে বিশ্বসেরাদের আতিথ্য দেওয়ারও সুযোগ হয়নি। ফলে দুদলের দেখা হওয়ার ক্ষেত্র ভীষণ কম। ২০১৫ ও ২০১৯ বিশ্বকাপে দুবার দেখা হয়েছে দুদলের। দুবারই ইংলিশরা জিতেছে হেসে-খেলে। ২০১৫ বিশ্বকাপে ৯ উইকেটে জয়ের পর ঘরের বিশ্বকাপে ইংলিশরা জিতেছিল ১৫০ রানের বড় ব্যবধানে।

অতীত পরিসংখ্যান, সাম্প্রতিক ফর্মÑ সবকিছু বিবেচনায় আজ ইংলিশদেরই জয়ের প্রশ্নে এগিয়ে রাখতে হচ্ছে। তবে বড় প্রতিপক্ষদের চমকে দেওয়ার অভ্যাস আছে বলেই খুব নির্ভার হয়ে আফগানদের মোকাবিলা করা ঠিক হবে ইংল্যান্ডের। তাছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অগ্নিপরীক্ষার আগে নিশ্চয় জস বাটলাররাও চাইবেন না কোনো অঘটনের শিকার হতে।

তবে এক ইংলিশম্যান আজ মনেপ্রাণে চাইবেন ইংল্যান্ডকে অঘটনের শিকার বানাতে। তিনি আফগানিস্তানের হেড কোচ জোনাথন ট্রট। যে দলের হয়ে খেলেই তিনি দুনিয়াজুড়ে পেয়েছেন খ্যাতি, সেই দলটিই আজ তার প্রবল প্রতিপক্ষ। গত বছর অষ্ট্রেলিয়ায় টি-২০ বিশ্বকাপে তার অধীনে আফগানরা ইংলিশদের মুখোমুখি হয়েছিল। আর দিল্লিতে হবে দ্বিতীয়বারের সাক্ষাৎ। আর এই ম্যাচটা ট্রটের জন্য আসে অন্যরকম অনুভূতি হয়ে, ‘এটা সবসময়ই বিশেষ কিছু। এই দলের বেশিরভাগ হয় আমার অধীনে খেলেছে, কিংবা তাদের সঙ্গে বা বিপক্ষে কোনো না কোনো সময় আমি নিজে খেলেছি। তাছাড়া এখানে একজন কোচ আছেন ডেভিড সাকার, যিনি আমাকেও কোচিং করিয়েছেন। সুতরাং দলের বেশিরভাগ সদস্যকেই আমি খুব ভালো করে চিনি।’ আর চেনেন বলেই আজ তিনি চাইবেন ইংলিশদের পথটা অমসৃণ করতে। তার আগে অবশ্য তাকে ভাবতে হচ্ছে নিজ দলের ব্যাটিং ইউনিট নিয়ে। টি-২০ ফরম্যাটে আফগানরা ভয়ংকর একটি দলে পরিণত হয়েছে। তবে ৫০ ওভার ফরম্যাটে এখনো ভুগছে মূলত ব্যাটারদের জন্য। ট্রট হতাশ হচ্ছেন এ কারণেই যে, সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোতে আফগানিস্তান ওয়ানডেতেও ভালো খেলেছে। যেটা বিশ্বকাপে এসে পারছে না। এ বছরই তারা পাকিস্তানকে টি-২০ সিরিজে হারিয়েছে। বাংলাদেশে গিয়ে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে। প্রথম দুই ম্যাচ নিয়ে তাই ট্রটের হতাশা, ‘আমি মনে করি না আমরা আমাদের স্বাভাবিক ব্যাটিংটা এখন পর্যন্ত করতে পেরেছি। ছেলেরা অনেক টি-২০ ক্রিকেট খেলে এবং অনেক বাউন্ডারি মারতে পারে। এটার পাশাপাশি সিঙ্গেলসটা যদি তারা ঠিকঠাক করতে পারে, তবে ওয়ানডেতেও তারা ভয়ংকর একটি দলে পরিণত হবে।’

২০১৫ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে হারানোর পর টানা ১৪ বিশ্বকাপ ম্যাচে হেরেছে আফগানিস্তান। অন্যদিকে ২০১৯ বিশ্বকাপ জয়ের পর গত বছর ঘরে তুলেছে টি-২০ বিশ্বকাপের শিরোপা। রঙিন পোশাকে তাই ইংলিশরা এখন যে কোনো টুর্নামেন্টেই শিরোপা প্রত্যাশীদের তালিকার ওপর দিকে থাকে। এসব দিক ভাবনায় আনলে অরুন জেটলি স্টেডিয়ামে ইংলিশদেরই জয়ের পাল্লা ভারী। তবে আফগানরাও চাইবে হারের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে বড় মঞ্চে ইংলিশদের হারানোর ইতিহাস গড়তে।