নারীগণ, অভিবাদন!

এখানে চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে বন্যা যে ভাষায় তাঁর সহকর্মী বাঁধনকে এবং নিজেকে উপস্থাপন করেছেন সেটা। আসলে ভাষা নয়, বন্যা ব্যবহার করেছেন একটা শব্দ, তা হচ্ছে নটী। প্রসঙ্গ হচ্ছে প্রবাসী শিল্পী বন্যা যেভাবে প্রিয় সহকর্মী বাঁধনের নটী হয়ে ওঠার গল্প লিখেছেন, নিজের পরিচয় লিখেছেন, বন্যা, নটী, নিউ ইয়র্ক- এই এক্সপ্রেশনটা

ময়মনসিংহ অঞ্চলে একটা গালাগাল হামেশা শোনা যায়, ‘নডির পুত’ বা ‘নডির ঝি’- যার শব্দগত অর্থ হচ্ছে, নাটক বা থিয়েটারের অভিনেত্রীর সন্তান। শব্দগত অর্থের মতন, গভীর অর্থটা এত নিরীহ নয়। ‘নডি’ বলতে প্রকৃতপ্রস্তাবে এইখানে বোঝানো হচ্ছে ‘বেশ্যা’ বা ‘দেহ পসারিণী’। দেহ পসারিণীর সন্তান মানে যে সন্তানের পিতৃপরিচয় নেই, সোজা বাংলায় ‘জারজ সন্তান’। ‘নটী’ কেন ‘বেশ্যা’ শব্দের প্রতিশব্দ হয়ে উঠল বা ‘জারজ’ বলাটা কেন মানুষের সমাজে মানুষকে অপমান করবার অস্ত্র হয়ে উঠল তার কারণ সকলেরই জানা; যুগ যুগ ধরে পুরুষের একক আধিপত্য, অ-পুরুষ সকলকে প্রান্তিক করা, নারীকে প্রধান শত্রু হিসেবে দমন-পীড়নের কথাও কম আর বেশি সবাই জানে। ফলে এই নটী প্রসঙ্গও মেলা পুরোনোই বলা চলে।

এই পুরোনো প্রসঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মতন সামনে নিয়ে এসেছেন এ দেশের মঞ্চনাটক, টেলিভিশন ও সিনেমার অভিনয় শিল্পী বন্যা মির্জা। বন্যা তাঁর ফেসবুক পেজে সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া, ভারতীয় নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজের খুফিয়া সিনেমায় ভীষণ ভালো অভিনয় করে দেখানোর জন্য আর এক শিল্পী আজমেরি হক বাঁধনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নতুন সিনেমায় মোহমুগ্ধকর অভিনয় করলে এক শিল্পী অন্য শিল্পীকে অভিনন্দন জানাতেই পারেন। কিন্তু এখানে চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে বন্যা যে ভাষায় তাঁর সহকর্মী বাঁধনকে এবং নিজেকে উপস্থাপন করেছেন সেটা। আসলে ভাষা নয়, বন্যা ব্যবহার করেছেন একটা শব্দ, তা হচ্ছে নটী। প্রসঙ্গ হচ্ছে প্রবাসী শিল্পী বন্যা যেভাবে প্রিয় সহকর্মী বাঁধনের নটী হয়ে ওঠার গল্প লিখেছেন, নিজের পরিচয় লিখেছেন, বন্যা, নটী, নিউ ইয়র্ক- এই এক্সপ্রেশনটা। এই পোস্ট থেকে স্বাভাবিকভাবেই নানা পোর্টাল নিউজও তৈরি করেছে, লেখকের অনুমতি নিয়ে নিউজ করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে অবশ্য আমার ধারণা নেই, যাচাইও করিনি।

নাটক সিনেমার নটনটীরা, যাদের আমরা অভিনেতা-অভিনেত্রী বা নায়ক-নায়িকা বলি, তাঁরা যা-ই করেন বা বলেন সেই সবই নিউজ হয়ে যায়। এর অর্থ এই নয় যে এর প্রত্যেকটাই গুরুত্বপূর্ণ বা সংবাদমূল্য রাখে, বরং উল্টোটাই সত্যি। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে চোখে পড়ে যায় এবং তাতে আনন্দও হয়। এমনই আর একটি জরুরি খবর আমার চোখে পড়েছে। খবরটিকে আজকালের ভাইরাল দুনিয়ার অগুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট বলে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, অন্তত আমার কাছে তো নেই-ই।

খবরের চরিত্ররা হচ্ছেন আমাদের দেশের সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় নটী বা নায়িকা বা অভিনেত্রী অপু বিশ্বাস এবং একজন সাংবাদিক। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে স্টারদের কথাবার্তা বা ইন্টারভিউ আজকাল অনেক বেশি সহজলভ্য। ফলে তারকাদের কার স্বভাব কেমন তা কমবেশি জানা বা বোঝা যায়। অপু বিশ্বাসকে অত্যন্ত মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে বলেই মনে হয়। এই মিষ্টি মানুষটি একজন সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে জনতার রোষানলে পড়েছেন,পরে এই নিয়ে মিডিয়ার সামনে মুখও খুলেছেন তিনি। তবে আমি মনে করি অপু কিছু না বলে চুপ করে থাকলেই আরও ভালো হতো। তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন করবার দায় নেই কারণ তিনি একদম ঠিক কাজটিই করেছেন।

ভিডিওতে দেখা যায় অপু একটি সোফায় বসে আছেন। একজন অল্পবয়সী দাড়িওয়ালা শ্যামলা রঙের সুদর্শন যুবক হঠাৎ এসে তাঁর পাশে বসলে অপু বলে ওঠেন, ‘আপনি উঠুন, আপনি না সাংবাদিক? মানুষ আপনাদের কাছ থেকে কী শিখবে?’ এই ভিডিও দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই পর্দায় এই সাংবাদিকের সাক্ষাৎকারও চলে এসেছিল। বলাবাহুল্য, তার নাকি কান্না শোনার প্রয়োজন আমি বোধ করিনি। অপু বিশ্বাস যত বড় তারকা, তাঁর জায়গায় আমি থাকলে এই সাংবাদিককে আরও কড়া ভাষায় অপমান করতাম। অপুর বদলে পরীমনি থাকলে হয়তো চপেটাঘাতও করে বসতে পারতেন, সেই সাহস তাঁর আছে!

ঘটনাটা রেগে যাওয়ার মতনই বটে। একজন সাংবাদিক কোন বুদ্ধিতে একজন তারকার অনুমতি না নিয়েই তাঁর পাশে বসেন ও আর এক সাংবাদিককে ছবি তুলে দিতে অনুরোধ করেন? যতই পাবলিক ফিগার হোন, অপু একজন রক্তমাংসের মানুষ, তিনি রাজু ভাস্কর্য বা শহীদ মিনার নন যে ইচ্ছে হলেই পাশে বসে বা দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলে নেওয়া যায়। অপুর আপত্তির জায়গাটা ঠিক এইখানেই। এই চিত্রনায়িকা সাংবাদিক এবং ভক্তদের সঙ্গে ছবি তুলতে কখনোই কার্পণ্য করেন না। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, তারকা হওয়ার আগে আমি একজন নারী, ওই ব্যক্তির এই আচরণ সকল নারীকে অসম্মানিত করে।

ঠিক তাই! শুধু নারী নয়, প্রত্যেক ব্যক্তির শরীরী সীমানা থাকে, যা অদৃশ্য হলেও অনুভব করা যায়। আমরা জনবহুল দেশে থাকি বলে, রাস্তাঘাটে নানা যানবাহনে ধাক্কাধাক্কি করে অভ্যস্ত। পশ্চিমের দেশে এবং আমাদের দেশেও অভিজাত রেস্তোরাঁয় কারও সঙ্গে খাওয়ার টেবিল শেয়ার করতে হলেও অনুমতি নেওয়ার ভদ্রতা প্রচলিত রয়েছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় স্পর্শ এড়াতে ‘এক্সকিউজ মি’ বা এই জাতীয় বাক্য বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়। এমনকি কারও দিকে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি তাকিয়ে থাকাও তার ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট করবার মতো অভদ্রতা হিসেবে বিবেচিত হয় ভদ্র সভ্য সমাজে। নারীর জন্য এই প্রক্সিমিটি বা নৈকট্যের সীমা ও সীমার লঙ্ঘন অনেক বেশি জরুরি প্রশ্ন। নারী শৈশব থেকে ¯েœহ,দোয়া ইত্যাদি নানা কিছুর মুখোশে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। ফলে একজন নারীর শরীরী নৈকট্যের সীমা লঙ্ঘন করার অর্থ হচ্ছে, নারীর শরীরের সীমার ধারণাটাকেই বাতিল করা।

পুরুষের রাজত্ব করা এই সমাজ, দুনিয়া চলেই পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। পিতার পরিচয় না থাকা তাই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় অসম্মান। জারজ বলে ডাকা বা কারও মাকে বহুগামিনী, বহুভোগ্যা, পাবলিক ওমেন বা নাটকের শিল্পী বা নটী বলে ডাকা তাই গালিগালাজ হিসেবে চর্চিত হয়। লোকের মানসিকতা এমন যেন কোন নারী অভিনয় করতে মঞ্চে উঠলে বা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে তিনি (পাবলিক ফিগার নয়) পাবলিক ওমেন হয়ে গেলেন, তার ব্যক্তিগত কিছুই আর থাকতে নেই, এমনকি তাঁর শরীরী সীমানাও আর কোন মানে রাখে না, একজন সাংবাদিকের কাছেও নয়।

এই সময়ে এসে একজন সাংবাদিকের এহেন আচরণের জন্য সাংবাদিক হিসেবে লজ্জা রাখার জায়গা যেমন নেই, ঠিক তেমনই একজন নারী হিসেবে অহংকার রাখারও জায়গা নেই আমার কাছে। বন্যা মির্জা এবং অপু বিশ্বাসের মতন বিখ্যাত ও বড় মাপের শিল্পীরা যখন নারীর সম্মান-অসম্মান প্রশ্নে সরব হন তখন সমাজে তার প্রভাব এমনিতেই পড়ে। মোটা দাগের উদাহরণ দিতে গেলে বলা যেতে পারে, এই নিবন্ধের মতন দশটা লেখা যে কাজ করতে পারবে না, বন্যা বা অপু বা বাঁধন বা পরীর মতন তারকারা দুই চারটি কথা বললেই তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে কথাগুলো পৌঁছে যাবে। এক নারীর সম্মানে অন্য নারীর সম্মানিত বোধ করা অথবা এক নারীর অসম্মানকে সব নারীর গায়ে নিয়ে ফোঁস করে ওঠার চর্চা একটু দুর্লভ বটেই।

প্রথমত, পুরুষতান্ত্রিক পদ্ধতি ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ জাতীয় বস্তাপচা ,মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, নারী প্রশ্নে সরব হলে, ‘ওমেন কার্ড’ বা ‘ভিকটিম হুড’ খেলার একটা দোষারোপ করে উত্থাপিত প্রশ্নকেই খারিজ করে দেওয়ার একটা প্রবণতাও রয়েছে। তৃতীয়ত, হালে গ্ল্যামার জগতের নারীরা কিছু বললে বা করলে একে ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’ বা ‘লাইমলাইটে’ আসবার চেষ্টা বলে লঘু করাও হয়। এহেন বৈরী পরিবেশে নারীর পাশে নারী হিসেবে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়া এবং সিস্টার হুড তৈরি করা খুব জরুরি পদক্ষেপ। অপু এবং বন্যার মতন বড় বড় স্টাররা, যাদের ভাইরাল হওয়ার বা লাইমলাইটে আসবার কোন প্রয়োজনই নেই, যারা ইতোমধ্যে দেশকে ও ইন্ডাস্ট্রিকে এত কাজ দিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের মুখ খুলে উচিত কথা বলা, নারীর সঙ্গে নারীর সহমর্মিতার সম্পর্ককে উদযাপন করা এবং নারী হিসেবে সকল নারীর সম্মান রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ফেলাটা অসম্ভব আনন্দের ও আশার বার্তা বয়ে আনে। হে, নটীগণ, নারীগণ,ভগিনীগণ, আপনাদের অভিবাদন!

লেখক: কবি ও লেখক