দ্বৈতনীতিতে নৈতিক অন্ধকার

আমি বরাবরই যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমের সংবাদ দেখতে ভয় পাই, এবং এখনো এর কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। ইসরায়েলে হামাসের মারাত্মক আক্রমণ এবং গাজায় ইসরায়েলের নারকীয় বোমাবর্ষণের পরে, আমি মার্কিন টিভি চ্যানেল গঝঘইঈ- দেখছিলাম। খুব বেশিক্ষণ যায়নি, আমি তাদের একজন সাংবাদিককে বলতে শুনলাম ‘এই দুই জাতির মধ্যে সহিংস ইতিহাস’ সম্পর্কে বলছে, এমনভাবে, যেন ফিলিস্তিন একদা একটি দেশ ছিল। এইসব থেকে বিরতি নিতে টিভিই বন্ধ করে দিলাম। তাদের কাছে ফিলিস্তিন কোনো দেশ নয়, এবং সেটাই হলো আসল ব্যাপার।

গাজা, পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিরা সবাই সংগঠিত বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক শাসনের অধীনে বাস করে। যা তাদের বেশিরভাগের জীবনকে প্রায় বসবাসের অযোগ্য করে তোলে এবং মার্কিন মিডিয়া যদি বিষয়টিকে সঠিকভাবে ফ্রেমই করতে না পারে, তাহলে তা কভার করার দরকার কী? এটা স্রেফ অলসতা নয়। ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন মিডিয়া পেশাদার এবং রাজনীতিবিদ উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কটি সবসময় ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কী ঘটছে তার সম্পূর্ণ চিত্রটি অস্পষ্ট করে তোলে।

গত ৭ অক্টোবর, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র অ্যাড্রিয়েন ওয়াটসন হামাসের যোদ্ধাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘ইসরায়েলি বেসামরিকদের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর হামলার নিন্দা জানায়’। আমাদের প্রত্যেককে অবশ্যই দাঁড়াতে হবে এবং প্রতিটি বেসামরিক নাগরিক, ইসরায়েলিই হোক বা ফিলিস্তিনি, হত্যার নিন্দা জানাতে হবে। কিন্তু ওয়াটসনের ‘আনপ্রোভোকড’ অর্থাৎ ‘কোনো প্ররোচনা ছাড়াই’ কথাটি ব্যবহার এখানে অনেক অর্থবহ।

ঠিক কোনটাকে আমরা উসকানি হিসেবে গণ্য করব? বিপুল সংখ্যক বসতি স্থাপনকারী, মিডিয়ার তথ্যানুসারে ৮০০-এরও বেশি, যারা ৫ অক্টোবর আল-আকসা মসজিদে হামলা করেছিল। এই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে নিহত হয় ২৪৮ ফিলিস্তিনি। দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনের মানবাধিকার ও জাতীয় আকাক্সক্ষা অস্বীকার করা উসকানি নয়?

বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোনো রকমের সহিংসতাকে সমর্থন না করেই এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে উসকানি হিসেবে দেখতে হবে। কিন্তু আপনি যদি শুধুমাত্র মার্কিন সংবাদ দেখেন, তাহলে আপনি সম্ভবত অনুমান করবেন যে ফিলিস্তিনিরাই সবসময় এমন কাজ করে আর ইসরায়েল শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। আপনি এমনকি মনে করতে পারেন যে ফিলিস্তিনিরাই ইসরায়েলের ভূমিতে উপনিবেশ স্থাপন করে। এবং আপনি সম্ভবত বিশ্বাস করেন যে ইসরায়েলের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণে জীবন কাটানো পশ্চিম তীর এবং গাজার ৫ মিলিয়ন ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার নেই এবং এটিও গণতন্ত্র।

একজন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচিত হতে হলে আপনাকে অবশ্যই একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কে মানুষ হিসেবে গণ্য হয়? ‘আমি গাজা উপত্যকায় সম্পূর্ণ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছি। বিদ্যুৎ থাকবে না, খাবার থাকবে না, জ্বালানি থাকবে না, সবকিছু বন্ধ। আমরা মানবপশুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছি এবং আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করছি’ বলেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট। মানবপশু? এই ধরনের ভাষা এবং গাজার সব নাগরিকের বিরুদ্ধে কালেক্টিভ পানিশমেন্টের ঘোষণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোথাও ইসরায়েলের সমর্থকরা কি অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমর্থনযোগ্য হিসেবে দেখবে? আসুন পরিষ্কার করা যাক : গ্যালান্টের ভাষা প্রতিরোধের অলংকার নয়, এটা গণহত্যার ভাষা।

ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের মধ্যে ভয়ংকর এক ভণ্ডামি রয়েছে। বিশ্বজুড়ে অনেকেই ইউক্রেনের বিদেশি দখলদারিত্বের প্রতিরোধকে সমর্থন করে (যেমন তাদের উচিত) কিন্তু ফিলিস্তিনিদের দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করার কোনো উপায়কে তারাই নিঃশব্দে অস্বীকার করে। এমনকি বয়কট, বিতাড়ন এবং নিষেধাজ্ঞার প্রচারণার মতো ফিলিস্তিন ও তাদের সমর্থকদের প্রতিরোধের অহিংস পদ্ধতিগুলোকেও বদনাম করা হয় এবং এমনকি তাদের অপরাধী বলে ভাবতে উৎসাহিত করা হয়। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড কেন? আশ্চর্যজনকভাবে, এই অবস্থান শীর্ষস্থানীয় কর্তৃপক্ষদের মধ্যেই দেখা যায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দুবার ইসরায়েলের প্রতি একতরফা সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, ‘ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার প্রশ্নাতীত’। তিনি কি তার ভূখণ্ডে রাশিয়ার জন্য একই কথা বলবেন? অবশ্যই না। জেলেনস্কির দেখতে হবে ইউক্রেনে আক্রমণ করে ভূমি দখল করে নেওয়ার ঘটনা কীভাবে ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের অবস্থার সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। অস্পষ্টতা সব জায়গায় আছে।

ডবল স্ট্যান্ডার্ডও তাই। আমরা অবশ্যই হামাসের দ্বারা নিহত বা অপহরণ করা ইসরায়েলি আমেরিকানদের সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তর কথা শুনব, কিন্তু সেই একই আওয়াজ কি গাজায় হুমকি ও নিহত ফিলিস্তিনি আমেরিকানদের জন্য একই পরিমাণে উঠবে? ২০২২ সালের মে মাসে যখন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফিলিস্তিনি আমেরিকান সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহকে গুলি করে হত্যা করেছিল তখন তারা কি জবাব চেয়েছিল?

ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা অতীতে যেভাবে আলোচনা করা হয়েছে তা বিবেচনায় নিলে এই ডবল স্ট্যান্ডার্ড অপ্রত্যাশিত মনে নাও হতে পারে। তবে এটি তাদের নৈতিক অন্ধকার দূর করে না। এই মুহূর্তে এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক এবং স্বর-বধিরত্ব। যখন ইসরায়েল সরকার একটি অরক্ষিত বিপুল জনগোষ্ঠীর ওপর নজিরবিহীন সহিংসতা চালাচ্ছে।

এই দ্বৈত মানদণ্ডের একটি মৌলিক উপায় হলো মিথ্যা তুলনামূলক অবস্থার বয়ান তৈরি ও প্রচার করা। এর মাধ্যমে, একটি দ্বি-পক্ষ-বাদ তৈরি করা হয় যা ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং ফিলিস্তিনি বিক্ষিপ্ত জনগণকে নিয়ে গঠিত। যা ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ক্ষমতার বিশাল অসামঞ্জস্যকে লুকিয়ে রাখে। তারা সমান নয়। একজন আধিপত্য বিস্তার করলে অন্যজন আধিপত্যের শিকার হয়। একজন উপনিবেশ স্থাপন করে। অন্যটি উপনিবেশিত।

অন্তত ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর থেকে, আমাদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বিক্রি করা হয়েছে। যা ছিল এই অবিচার থেকে বেরিয়ে আসার উপায়। আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্মের বিশাল ত্যাগের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিরা অবশেষে তাদের জাতীয় আকাক্সক্ষা অর্জন করবে এমন আশা ছিল। অবশ্য, আমাদের অনেকের কাছেই স্পষ্ট ছিল যে, এটা অনেক আগেই ক্ষমতাবানদের কাছে কুক্ষিগত হয়ে পড়া একটি প্রয়োজনীয় বিভ্রম হয়ে উঠেছে। আর আজ, একটি শান্তি আলোচনা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক দূরে বলে মনে হচ্ছে।

এটি আমাকে দুঃখিত এবং আতঙ্কিত করে। আমরা খুব সম্ভবত আরেকটি দীর্ঘ এবং বেদনাদায়ক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং সহিংস আধিপত্য ক্রমবর্ধমান এবং বেঁচে থাকার জন্য একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তবুও জিততে পারে না। ফিলিস্তিনিরা থাকবে। তাদের নির্মূল করা যাবে না। ইসরায়েলও বিদ্যমান থাকবে। ভবিষ্যৎ চারদিকে অপ্রয়োজনীয় ও ভয়াবহ রক্তপাতে পূর্ণ। নৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং দ্বিচারিতার প্রতি পশ্চিমের মরিয়া আসক্তি এসব ত্রুটির একটি বড় অংশ বহন করে।

লেখক : নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির ব্রুকলিন কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক। পুরস্কারজয়ী বইয়ের লেখক এবং গার্ডিয়ান ইউএস-এর কলামিস্ট।

দা গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর : সাঈদ জুবেরী