৫০০ কোটি ডলার ঋণের ‘ফ্রেশ ডিল’ জানুয়ারিতে

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪০ এএম

গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসা দলীয় সরকারের চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন ঋণচুক্তি করতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু ঋণদাতা সংস্থাটি পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে দেওয়া ঋণের অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা যাচাই করতে চায়। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমানোসহ ব্যাংক খাতের আমূল সংস্কার ও বাজেট সহায়তার অর্থ ব্যবহার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তা সংশোধনে সরকারের অঙ্গীকার ও কার্যকরী ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চায়। এ পটভূমিতে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গতকাল রবিবার ঢাকা সফর শুরু করেছে। আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত তারা ঢাকায় থাকবে।

প্রতিনিধিদলটির আর্থিক ও রাজস্ব খাতে নেওয়া সংস্কার কার্যক্রমের সার্বিক অগ্রগতি খতিয়ে দেখার কথা রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা সফরে প্রতিনিধিদলটি সরকারের চাওয়া নতুন সাড়ে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪৫০-৫০০ কোটি ডলার) ঋণের প্রযোজ্যতা ও যথার্থতা পরিমাপ করে প্রতিবেদন দাখিল করবে আইএমএফ সদর দপ্তরে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আইএমএফের বোর্ড সভায় আগামী বছরের জানুয়ারিতে অনুমোদন হতে পারে নতুন ঋণ।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভাষায় এটি ‘ফ্রেশ ডিল’। নতুন ঋণ ব্যবহার করে সরকার মূলত পরিচালন ব্যয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ ও ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে চায়। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, আইএমএফের পরিদর্শন টিমে রয়েছেন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা। ঢাকায় অবস্থানকালে তারা ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), জ¦ালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সবশেষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। গতকাল রবিবার আইএমএফ স্টাফ ভিজিট টিমের প্রধান আইভো কার্জনার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে ব্যাংক খাত সংস্কারের অগ্রগতি জেনেছেন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্বল পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ ও ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের খুঁটিনাটি সম্পকে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কেও খোঁজ নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকিং খাত ছাড়াও আইএমএফ প্রতিনিধিদলের আগ্রহ ছিল জ¦ালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকারের ভূমিকা ও পরিকল্পনা বিষয়ে। তবে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।     

টিম-প্রধান আইভো কার্জনার ও তার সহকর্মীদের গতকাল রবিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের নির্ধারিত সময়সূচি থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। এই দিনটিতে সদ্যপ্রয়াত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের দাফন সম্পন্ন করার ব্যস্ততা থাকায় অর্থমন্ত্রী আইএমএফের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকটি পিছিয়ে দিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আজ সোমবার সচিবালয়ে বৈঠকটি হতে পারে।

অর্থমন্ত্রী গতকাল সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে আইএমএফের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, জনস্বার্থ ও দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে আইএমএফের সঙ্গে নতুন প্রোগ্রাম হবে। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে আইএমএফের কোনো কর্মসূচিতে সরকার অংশ নেবে না। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের নেওয়া আইএমএফের আগের প্রোগ্রামটি ছিল সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী। সেই কর্মসূচিতে এমন অনেকগুলো শর্ত ছিল, যা একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকারের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই বর্তমান সরকার আগের প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে।

অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের মূল চিন্তা টাকা পাওয়া নিয়ে নয়, বরং দেশের স্বার্থ রক্ষা করা। একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে এমন একটি নতুন প্রোগ্রামে আমরা যাচ্ছি। যে কর্মসূচিতেই আমরা যাই না কেন, সেখানে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত থাকবে।’

অর্থমন্ত্রী এ সময় দেশের চলমান রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।

আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন দিয়ে পাঁচ কিস্তিতে প্রায় তিন চতুর্থাংশ অর্থ (৩৬৪ কোটি ডলার) বিতরণও করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশ পঞ্চম কিস্তি পাওয়ার পর থেকে ওই ঋণের বিপরীতে আর কোনো ফান্ড দেয়নি আইএমএফ। এদিকে দেশে একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের দাবি তীব্র হয়ে উঠতে থাকলে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।  

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সরকারের নিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রাজস্ব আদায় ও এর ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংস্কার এনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বাজেট দিয়ে বলেছেন, এটি গণমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট। বাজেটের গণতন্ত্রীকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ বাজেটে পূর্ববর্তী সরকারের মতো ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার সংস্কৃতি ও পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার এখন থেকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে কম ঋণ নেবে, যাতে করে দীর্ঘদিন ধরে লুটপাটের ফলে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া এ খাতটিতে চাপ না পড়ে। ঋণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যুর মতো বিকল্প ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে সরকার। এ ছাড়া আইএমএফসহ অন্যান্য দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় ঋণের ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করবে সরকার।

গত মে মাসে অর্থমন্ত্রী আইএমএফকে নতুন ঋণ প্যাকেজ বা ফ্রেশ ডিল পেতে আগ্রহের কথা জানান। এরই মধ্যে সংস্থাটি অর্থমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। চলমান পাঁচ দিনের ঢাকা ভিজিট সম্পন্ন হলে আইএমএফ টিম একটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের পর্যবেক্ষণ জানাবে বা ফিডব্যাক দেবে বলে কথা রয়েছে।  

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত