মিস্টার ফিক্স-ইট স্মিথ নাকি মারকুটে মেন্ডিস

‘সে অস্ট্রেলিয়া দলকে আগলে রাখে’, স্টিভ স্মিথকে নিয়ে কদিন আগে কথাটি বলেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক ও বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্স। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইন আপের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম স্মিথ। দলটির ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ। ইনিংস মেরামতের কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে পারেন বলে দলের কাছে ‘মিস্টার ফিক্স-ইট’ সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। এক প্রান্ত আগলে রেখে দলের ইনিংস যেমন টানতে পারেন, প্রয়োজনে হয়ে উঠতে পারেন আগ্রাসীও। প্রতিপক্ষের বোলিং গুঁড়িয়ে দলকে এনে দিতে পারেন দ্রুত রান। যেকোনো পরিস্থিতিতেই কার্যকর ব্যাটসম্যান স্মিথ।

চলতি বিশ্বকাপে এখনো চেনা রূপে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি মিডল অর্ডার এই ব্যাটসম্যান। ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দলের পক্ষে ইনিংসের সর্বোচ্চ ৪৬ রান করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার উড়ে যাওয়ার ম্যাচে তার ব্যাট থেকে এসেছে কেবল ১৯ রান। তার বড় ইনিংস খেলতে না পারা বেশ ভোগাচ্ছে অস্ট্রেলিয়াকেও।

অস্ট্রেলিয়ার হতাশাজনক ব্যাটিংকে ‘ফিক্স’ করতে হবে স্মিথকে। দলকে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দিতে হবে অদ্ভুত ব্যাটিং স্টান্সের জন্য ক্রিকেট আঙিনায় পরিচিত এই তারকাকে। ব্যাটিং অর্ডারে ‘সেতুর’ মতো কাজ করতে হবে তার। যেমনটা তিনি করে আসছেন লম্বা একটা সময় ধরে। আজ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ে নামবেন প্যাট কামিন্সরা। জয়ের খোঁজে থাকা দলটি স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে থাকবে স্মিথের ব্যাটের দিকে। তার কাছ থেকে চমৎকার একটি ইনিংসের আশায় থাকবে তারা।

স্মিথের মতো তারকাখ্যাতি না থাকলেও চমৎকার এক ব্যাটসম্যান কুশল মেন্ডিস। বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ম্যাচের চিত্র যেকোনো সময় পাল্টে দিতে পারেন এই ডানহাতি। শ্রীলঙ্কা দলের ব্যাটিং বিভাগের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তিনি। এখন তো দলটির অধিনায়কও। ঊরুর চোটে দাসুন শানাকার বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ায় অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়েছে এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে। ব্যাটিংয়ের সঙ্গে এবার নেতৃত্ব দিয়েও দলকে টানতে হবে তাকে। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ দিয়ে শুরু যে অধ্যায়।

কাজটি নিঃসন্দেহে বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে যেকোনো সংস্করণে প্রথমবার দেশকে নেতৃত্ব দিতে যাওয়া মেন্ডিসের জন্য। বিশ্বকাপে এখনো যে জয়ের দেখা পায়নি লঙ্কানরা। আসরে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তানের বিপক্ষে হেরে গেছে তারা। জয়ের স্বাদ পেতে মেন্ডিসের ব্যাটের দিকে যেমন তাকিয়ে থাকবে লঙ্কানরা, তেমনি নজর থাকবে তার নেতৃত্বের দিকেও।

দল হারলেও ব্যাট হাতে অবশ্য দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করছেন মেন্ডিস। সবশেষ ম্যাচে তো পাকিস্তানের বোলারদের ওপর তাণ্ডব চালিয়েছেন তিনি। তিনে নেমে খেলেছেন ৭৭ বলে ১২২ রানের খুনে ইনিংস। এই ইনিংসের পথে ৬৫ বলে তিন অঙ্ক স্পর্শ করে বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন ২৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। ভেঙে দিয়েছেন ২০১৫ বিশ্বকাপে কুমার সাঙ্গাকারার ৭০ বলে করা সেঞ্চুরির রেকর্ড। আগের ম্যাচেও হেসেছে মেন্ডিসের ব্যাট, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৪২ বলে করেছেন ৭৬ রান। বিশ্বকাপে দারুণ কিছু করার আভাস দিয়েছেন তিনি আগেই। গত এশিয়া কাপে করেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৭০ রান। টুর্নামেন্টে তিন ফিফটির দুটিতে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়ে ফিরেছেন নব্বইয়ের ঘরে। প্রস্তুতি ম্যাচে আফগানিস্তানের বোলারদের গুঁড়িয়ে খেলেছেন ৮৭ বলে ১৫৮ রানের বিস্ফোরক ইনিংস। অসাধারণ ধারাবাহিকতায় ছুটতে থাকা ভয়ংকর এই ব্যাটসম্যান তাই অস্ট্রেলিয়ার জন্য হবেন অনেক বড় হুমকি।

মেন্ডিসকে নিয়ে যেমন আলাদা করে ভাবতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে, তেমনি লঙ্কানদের ভাবনায় অবধারিতভাবেই থাকবেন স্মিথ। প্রতিপক্ষের জন্য যে তিনি সবচেয়ে মূল্যবান উইকেট। সবশেষ দেখায় স্মিথকে আউট করে সেটাই বলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা পেসার কাগিসো রাবাদা। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের হয়ে ১৪৭ ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা যে ব্যাটসম্যানের, প্রতিপক্ষের পরিকল্পনার অনেকটা জুড়ে তার থাকার কথা স্বাভাবিকভাবেই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অবশ্য আহামরি কিছু করতে পারেননি তিনি। এখন পর্যন্ত ১৪ ওয়ানডে খেলে চার ফিফটিতে তার রান কেবল ৩৮৫, ব্যাটিং গড় ৩৮.৫০। ওয়ানডেতে চলতি বছরও ফর্মে নেই স্মিথ। ৮ ম্যাচে ফিফটি কেবল একটি, ২৮.৮৫ ব্যাটিং গড়ে রান ২০২। শ্রীলঙ্কার জন্য যা হতে পারে স্বস্তির কারণ।

তবে মেন্ডিস অস্ট্রেলিয়ার জন্য নিশ্চিতভাবে মাথাব্যথার কারণ। একে তো সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন তিনি, তার ওপর দলটির বিপক্ষেও তার পারফরম্যান্স দারুণ। ১১ ওয়ানডেতে ৫০.৩৩ গড়ে করেছেন ৪৫৩ রান, ফিফটি চারটি। সবশেষ বিশ্বকাপে ৭ ম্যাচ খেলে তেমন কিছু করতে না পারা ২৮ বছর বয়সী মেন্ডিস এবার দারুণ কিছু করার পণ করেই বোধহয় বৈশ্বিক আসরে অংশ নিয়েছেন। তার শুরুটা দেখে অন্তত এটা আন্দাজ করাই যায়। আসরে স্মিথের শুরুটা প্রত্যাশামতো না হলেও চতুর্থ বিশ্বকাপে খেলতে আসা ৩৪ বছর বয়সী ক্রিকেটার যেকোনো সময় যে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সেটার প্রমাণ দিয়েছেন আগে অনেকবারই।