২০ অক্টোবর শুরু হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব দুর্গাপূজা। এরই মধ্যে মন্ডপ তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অতীতে মন্ডপে হামলা-ভাঙচুরের মতো ঘটনা এবং সামনে জাতীয় নির্বাচনের কারণে ভেতরে-ভেতরে তাদের মধ্যে ভয়ও আছে।
বছর দুয়েক আগে দেশের ২৭টি জেলায় হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় দুর্বৃত্তদের বিচার না হওয়াই এমন ভয়ের কারণ।
এ ছাড়া সম্প্রতি মদ না খাওয়ার কথা বলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষে কথাবার্তা হচ্ছে। এরই মধ্যে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মন্ডপের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশের সব কটি ইউনিটপ্রধান ও জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে বলা হয়েছে, স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে সারা দেশে এবার মন্ডপের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৪০৭টি। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৪ হাজার ৪৬২টি। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ৭ হাজার ৯৪৫টি। গত বছর মন্ডপ ছিল ৩২ হাজার ১৬৮টি। পূজা উদযাপন কমিটিকে পুলিশ বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি উদযাপন কমিটি কাজ করছে।
পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, উৎসবের মধ্যেও তারা ভয়ে আছেন। কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন তারা। যদিও সরকার আশ্বাস দিয়েছে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি থাকবে না।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিটি মন্ডপে কঠোর নিরাপত্তা থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এ নিয়ে কাজ করছে। কোনো দুর্বৃত্ত মন্ডপে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে, তাদের কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তার ছক আঁকা হয়েছে। ঢাকার প্রতিটি মন্ডপে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়টি এমন এক শব্দ, যা সহজেই বলা যাবে না। নিরাপত্তার ব্যবস্থা কীভাবে সাজাবে তা বলা মুশকিল। উৎসবের মধ্যেও আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি।’
তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে ২৭টি জেলায় মন্ডপে হামলা হয়েছে। প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। অথচ এসবের বিচার হয়নি এখনো। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যেসব হামলা হয়েছে তার কোনো বিচার হয়নি। বর্তমান সরকারের আমলেও হামলার ঘটনায় বিচার হয়নি। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের এক সংসদ সদস্য পূজায় মদ খাওয়া নিয়ে যে কথা বলেছেন তা তিনি বলতে পারেন না। কেউ কেউ নিজেদের রাজা ভাবলে হবে না।’
রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রতিটি পূজাম-পে কঠোর নিরাপত্তা দিতে হবে। আমাদের মধ্যে যে আতঙ্ক তা দূর করতে হবে। পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তারা বলেছেন, পূজায় সব ধরনের নিরাপত্তা দেবে। আমরা এর প্রতিফলন দেখতে চাই।’
১৯৯১ ও ২০০১ সালে আজকের মতো পরিস্থিতি ছিল না। সবাই একসঙ্গে নির্বাচন করেছে। তারপরও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালের আগে আমাদের ওপর হামলা ছিল স্টেট স্পন্সরড (রাষ্ট্রের মদদ)। এরপরের যে হামলাগুলো হয়েছে তা পলিটিক্যাল পার্টি স্পন্সরড (রাজনৈতিক দলের মদদ)। এবার পরিস্থিতি তো খারাপ। রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি অবস্থানে আছে। তাই শঙ্কাও বেশি।’
২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর মহাষ্টমীর দিনে কুমিল্লার একটি পূজামন্ডপে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক সপ্তাহ ধরে সাম্প্রদায়িক হামলা চলে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কুমিল্লা, রংপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুরসহ দেশের অন্তত ২৭টি জেলায় হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনার পেছনে কাদের উসকানি ছিল, নেপথ্যে কারা ছিল তা উদঘাটন হয়নি। এসব ঘটনায় অন্তত ৫০টি মামলা হয়েছে। এতে ৪০০ জনের বেশি নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি লোককে আসামি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিন পর পূজার উৎসব শুরু হবে। আমাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা রয়েছে। আমরা আশাবাদী রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের আশ^াস দিয়েছেন পূজায় নিরাপত্তার কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। প্রতি বছরই মুসলিম ভাই-বোনসহ সবাই আমাদের সহায়তা করে। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটবে না, আশা করি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, পূজায় যাতে কোনো সহিংসতা বা হামলার ঘটনা না ঘটে, সে জন্য তারা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গুজব ছড়িয়ে যাতে কেউ কোনো অঘটন ঘটাতে না পারে, সে জন্যও তারা সতর্ক আছেন। প্রতিটি বিষয় মাথায় রেখে তারা নিরাপত্তার ছক তৈরি করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অতীত উদাহরণ আছে। এবার পূজার দুই মাস পরেই জাতীয় নির্বাচন, তাই শঙ্কাও বেশি। রাজনৈতিক দলগুলো পূজার সময় কর্মসূচি রাখেনি। এটা আশাব্যঞ্জক। তিনি বলেন, এ বছর ঢাকাসহ সারা দেশে ৩২ হাজার ৪০৭টি মণ্ডপ ও মন্দিরে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে ঢাকার বাইরে এখন পর্যন্ত ছয়-সাতটি মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির সময় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।
পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ২০২১ সালে ম-পে হামলার ঘটনায় বিচারিক তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর হাইকোর্ট এক আদেশে বিচারিক তদন্ত করে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়। পরে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের এ আদেশ স্থগিত চেয়ে আবেদন করলে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। ২০২২ সালের ৩০ জানুযারি আপিল বিভাগ রিট আবেদনটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তদন্তের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানায়, শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপন করতে কিছুদিন আগে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসার মোতায়েনের পাশাপাশি পুলিশের টহল বৃদ্ধি, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে। প্রতিটি পূজামণ্ডপ বা মন্দিরে রাত্রিকালীন ভিডিও ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের আলাদা পোশাক, দৃশ্যমান পরিচয়পত্র ও আর্মড ব্যান্ড নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এসব স্বেচ্ছাসেবকের নামের তালিকা সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠাতে হবে। মন্ডপে প্রবেশ ও বের হওয়ার ফটক মজবুতভাবে স্থাপন, যেসব মণ্ডপে সীমানা দেয়াল নেই, সেখানে বাঁশের শক্ত বেড়া নির্মাণ এবং নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্রবেশপথের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলর, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে শান্তি-শৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটি গঠন এবং তাদের নাম ও মোবাইল নম্বরসংবলিত ব্যানার দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। সচেতনতামূলক নির্দেশনা প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি মণ্ডপে আর্চওয়ে গেট স্থাপন করতে হবে। বৈদ্যুতিক কাজে নিম্নমানের তার ব্যবহার না করতে এবং অগ্নিদুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য পূজামণ্ডপে মোমবাতি, আগরবাতি, আরতির সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আনন্দ উৎসবে মাদকের ব্যবহার, জুয়া খেলা ও আতশবাজি বন্ধ রাখতে হবে। প্রতিটি পূজাম-পে পরিদর্শন রেজিস্টার প্রস্তুত এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এলাকায় পর্যাপ্ত ও বিকল্প আলোর (জেনারেটর) ব্যবস্থা রাখতে হবে। দর্শনার্থীদের ব্যাগ বা পোঁটলা ইত্যাদি নিয়ে প্রবেশ না করতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো ব্যাগ বা পোঁটলা পড়ে থাকতে দেখলে বা দৃষ্টিগোচর হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাৎক্ষণিক অবহিত করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং অপর ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের লক্ষ্যে আজান ও নামাজের সময় এবং মসজিদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বাদ্য বাজানো বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। পূজামণ্ডপ সংলগ্ন স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং পূজামণ্ডপ ও আশপাশ এলাকায় মেলা বসানো যাবে না। পুলিশ ও আনসার সদস্যদের জন্য ওয়াশরুমসহ স্বাস্থ্যকর আবাসনের ব্যবস্থা রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রসাদ প্রস্তুত করার সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং পূজাম-পে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিরোধ থাকলে তা পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে নিষ্পত্তি করতে হবে। বিজয়া শোভাযাত্রায় উচ্চ শব্দের বাদ্যযন্ত্র (পিএ) ব্যবহার করা যাবে না। শোভাযাত্রা চলাকালে যেন কোনো গ্যাপ সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় নৌকায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা, প্রাণহানি যাতে না ঘটে, সে জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা, বিশেষ করে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের নৌকায় ওঠা নিরুৎসাহিত করতে হবে। ২৪ অক্টোবর বিভিন্ন পূজাম-প থেকে বিকেল ৩টার আগেই প্রতিমা ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা, সাড়ে ৩টার মধ্যে শোভাযাত্রা শুরু করা এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রতিমা ওয়াইজঘাটে পৌঁছাতে হবে। রাত ৮টার মধ্যে বিসর্জন সম্পন্ন করতে অনুরোধ করেছে পুলিশ।