বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থবহ সংলাপে বসার সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য একটি ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছে তারা। পর্যবেক্ষক দল আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকার, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশনসহ অংশীজনদের কাছে পাঁচটি সুপারিশ করেছে।
গতকাল রবিবার ওয়াশিংটন থেকে প্রচারিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের (এনডিআই) ছয়জন প্রতিনিধির মার্কিন প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল ৭ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করে।
সুপারিশগুলো হলো একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে অর্থবহ সংলাপ, রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা, বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা ও ভিন্নমতকে সম্মান করা হয় নাগরিকদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা, স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনাসহ এমন পরিবেশ তৈরি করা যাতে সব দল একটি অর্থবহ নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় শামিল হতে পারে এবং নাগরিকদের মধ্যে সক্রিয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে অংশগ্রহণের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা।
এসব সুপারিশের ব্যাখ্যায় বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোকে কথাবার্তায় উদার হওয়া উচিত। অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বৈধতাকে স্বীকার করতে হবে। আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। বর্তমানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে আপসের জন্য সুস্থ বিশ্বাসে সমঝোতায় যুক্ত হওয়া উচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে। বাস্তব, টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবর্তন সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করতে হবে। সব রাজনৈতিক দল, সরকারের বিভিন্ন অংশ এবং বাংলাদেশ ইস্যুতে সমালোচনামূলক রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকতে হবে সাংবাদিক ও মিডিয়া আউটলেটকে। নাগরিকদের স্বাধীনভাবে তাদের মতপ্রকাশ করতে দেওয়া উচিত। উভয়ক্ষেত্র প্রতিশোধ নেওয়ার আতঙ্কমুক্ত থাকতে হবে। যারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক ইস্যুতে কাজ করে তারাসহ নাগরিক সমাজের সংগঠন ও কমিউনিটি-ভিত্তিক সংগঠনকে তাদের কর্মকা- খর্ব করা বা সীমিত করার হুমকির মুখে ফেলা উচিত হবে না। নতুন পাস হওয়া সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার বা এ আইন লঙ্ঘন করা উচিত হবে না। এর মধ্যে আছে ভিন্ন মতাবলম্বীদের বক্তব্যের কারণে তাকে টার্গেট করা। এ আইন বাস্তবায়নে নাগরিক ও অন্য অংশীদারদের সঙ্গে নেওয়া উচিত সরকারের।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনী রেজল্যুশনে নিশ্চিত করতে হবে যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সবরকম সুযোগ পাবেন নাগরিক পর্যবেক্ষকরা। আইনগত ও অহিংস রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত থাকার সময়ে রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের তরফে সহিংসতার মুখে পড়া উচিত হবে না। সব দলকে প্রকাশ্যে অহিংস থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং তাদের নিজেদের সদস্য বা সমর্থকদের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতার নিন্দা জানাতে হবে। নির্বাচনে অহিংসতা নিশ্চিত করতে বহুদলীয় আচরণবিধির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত সব দলের। নির্বাচনে নারীর বিরুদ্ধে অনলাইন ও অফলাইনে সহিংসতা প্রতিরোধ, চিহ্নিত করা এবং সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলো ও অন্য অংশীদারদের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা শক্তিশালী করতে হবে। তাদের স্টাফ বৃদ্ধি করে এবং তহবিল জোগান দিয়ে ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিতে হবে, যারা অহিংসতায় জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্যতা দেখায়, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকান্ড প্রদর্শন করে এবং অবাধ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচারণা চালায়। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, নাগরিক সমাজের নেতা এবং মিডিয়ার প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সব মুলতবি বিচারিক মামলার দ্রুত এবং বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক রিভিউ করতে হবে। নির্বাচন যাতে অহিংস হয়, এমন পরিবেশ বজায় রাখতে সব অংশীদারের অবদান রাখা উচিত। তবে সুপারিশগুলো কখন বাস্তবায়ন করতে হবে এবং না করলে কী হবে, সে সম্পর্কে কিছু ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়নি।
এদিকে ঢাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের সুপারিশমালাকে স্বাগত জানিয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি যে চারটি শর্ত দিয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করা হলে সংলাপের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। শর্তযুক্ত সংলাপে আওয়ামী লীগের আগ্রহ নেই।’ গতকাল রবিবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপি যদি শর্ত প্রত্যাহার করে তখন আমরা চিন্তাভাবনা করে দেখব। নির্বাচন হবে সংবিধান অনুসারে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগে যে দাবি বিএনপি করেছে, তা বাস্তবায়ন অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন, নির্বাচনকালীন সরকার দেওয়া দরকার সেটা তার এখতিয়ার।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এখানে নির্বাচনকালীন পরিবেশ তারপর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, পলিটিক্যাল পার্টি হিসেবে অংশগ্রহণকারী দলের যে সুযোগ-সুবিধা সে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। আমাদের প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করলে কার সঙ্গে আলোচনা করবে? রাষ্ট্রপতি আলোচনা করতে চেয়েছেন সেই আলোচনাও তারা বাতিল করেছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরপর তারা দুবার আলোচনার প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছে। তাই আমাদের সংবিধানে নির্বাচনের বিষয়ে যেভাবে বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলো মেনে আমরা নির্বাচন করব। দুনিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, আমরা ঠিক সেভাবেই নির্বাচন করব।’
অন্যদিকে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, নেতাকর্মীদের মুক্তি, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা এবং নির্দলীয় সরকার কীভাবে হবে তার রূপরেখা নিয়ে সংলাপ হতে পারে। এ ছাড়া সরকারের সঙ্গে আলোচনার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। কারণ সেই সংলাপ অর্থবহ হবে না।’
প্রসঙ্গত, প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল সফরকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলগুলো, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে।