এসে গেছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ তেল, ক্রিম!

‘আল্লাহর কসম, ওপরে আল্লাহ নিচে মাটি, আপনার গাল আমার চাটি। বলছি কথা শতভাগ খাটি। দেখাব এবার ভানুমতির খেল, এসে গেছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ তেল, ডাক্তার কবিরাজের নেই কোনো বেইল। সুদূর রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত, পাবনায় প্রস্তুতকৃত। ব্যবহারে মাথা হবে ঠাণ্ডা, কমবে অন্তরজ্বালা।

সংসারে অশান্তি, অন্তরজ্বালা, রাজনৈতিক বেদনা, দুঃখ, কষ্ট সব দূর করে মাথাটা রাখবে বরফের মতো ঠাণ্ডা, মনে হবে আপনি আছেন সাইবেরিয়াতে।

দাম কত জানতে চান? এক দাম এক রেট ২০৪১ টাকা, ২০৪১ টাকা, ২০৪১ টাকা। তবে দাদাভাই, এখনই নিতে হবে এমন কথা নয়, বোতলের গায়ে কেমিক্যাল লেখা দেখে কিনবেন কেনার সময়।’

কিছুদিন পর রাস্তাঘাটে, হাটেবাজারে কিংবা আপনার মহল্লার চিপায়-চাপায় মাইক বাজিয়ে এভাবে হকাররা যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ তেল বিক্রি করতে থাকে তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কারণ প্রথমত বিএনপি মহাসচিবসহ দলটির নেতারা এবং তাদের পাল্টা জবাব দেওয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সম্ভবত ইউরেনিয়ামকে ধাতুর বদলে নিছক একটি কেমিক্যাল ভেবে পরস্পরকে বুঝে নিতে চেয়েছেন। তবে বিএনপি নেতাদের কথার মোক্ষম জবাব দিতে গিয়ে সরকারদলীয় নেতা ও মন্ত্রী যখন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মাথায় ইউরেনিয়াম ঢালতে চান তখন এটাকে পুঁজি করে ব্যবসা করা অবাস্তব কী? কারণ এই দেশে গাছের শেকড়, স্বপ্নে পাওয়া পানি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বহু ঘটনা রয়েছে। আবার বিশ্বের কোথাও ভূমিকম্প সহনীয় স্টিল বা রডের দেখা না মিললেও এমন মিথ্যে চটকদার বিজ্ঞাপন দেয় রড প্রস্তুতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। প্রকাশ্যে প্রতারণার খপ্পরে পড়ে অনেক শিক্ষিত, জ্ঞানী, মহাজ্ঞানী মানুষও তাদের রড কিনছেন।

পাগলা মলম হিসেবেও ব্যবহার হতে পারে রূপপুরের ইউরেনিয়াম। কারণ প্রতিপক্ষের রাজনীতিককে পাগল আখ্যা দিয়ে চিকিৎসার জন্য তার মাথায়ও কিছু ইউরেনিয়াম ঢেলে দেওয়ার কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা। ইউরেনিয়ামের সাহায্যে পাগলও যে ভালো হয় এতদিন পর বিশ্ববাসী তা জানলেন। এজন্যই কী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার মানসিক হাসপাতালের অদূরে রূপপুরে করা হচ্ছে? এক ঢিলে দুই পাখি।

এক কেজি ইউরেনিয়াম দণ্ড বা পারমাণবিক জ্বালানির সক্ষমতা ৬০ টন জ্বালানি তেল আর ১শ টন কয়লার সমান। দাম বিবেচনায়ও এটি অনেক সাশ্রয়। ফলে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানতে ব্যর্থ হয়ে সবকিছুতেই বিকল্প খোঁজার পরামর্শ দেওয়া এই দেশে কয়লা সংকটে মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে তরল ইউরেনিয়াম ব্যবহারেরও পরামর্শ আসতে পারে। আবার গাড়িতেও গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানির বিকল্প হিসেবেও ইউরেনিয়াম ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন কেউ। গ্রামে-গঞ্জে ভাঙা সাইকেলে টিনের জারে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ তেল বিক্রির ফেরিওয়ালাদেরও হয়তো চোখে পড়তে পারে। ডিজেল কেরোসিনের দাম গত কয়েক বছরে যেভাবে বেড়েছে তাতে মানুষ কৃষিতে ব্যবহৃত শ্যালো মেশিনের ডিজেলের বিকল্প কিংবা কেরোসিনের বিকল্প হিসেবেও বিশেষ এই তেল ব্যবহার করতে পারেন হুজুগে বাঙালি।

ইউরেনিয়াম যেহেতু অনেক শক্তিশালী, তাই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ এনার্জি ড্রিঙ্ক যদি কোনো কোম্পানি বাজারজাত করে তাহলেও কিন্তু অবাক হওয়ার কিছু নেই। কোটি টাকা বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা হয়তো তখন বলবে– বিএসটিআই অনুমোদিত এই পানীয় খেলে নিজেকে পারমাণবিক শক্তিধর যুবক কিংবা পুরুষ মনে হবে। বিএসটিআইয়ের এখানে ন্যূনতম সম্পৃক্ততা থাকার সুযোগ না থাকলেও অনেকেই তা বিবেচনা না করে চটকদার বিজ্ঞাপনেই বিশ্বাস করবেন– এটা বলাই যায়।

তরুণদের দরকার এনার্জি আর তরুণীদের প্রয়োজন সৌন্দর্য। তাই তখন কিন্তু পিছিয়ে থাকবে না প্রসাধন সামগ্রী বিক্রেতারাও। তারাও হয়তো বলবে– বাজারে এসে গেছে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ রং ফর্সাকারী ক্রিম। আফ্রিকার নামিবিয়া থেকে আমদানিকৃত এই ইউরেনিয়াম ক্রিম একবার ব্যবহারে আপনি হবেন ক্লিওপেট্রার মতো সুন্দর। বিফলে মূল্য ফেরত। বিফলে মূল্য ফেরতের গ্যারান্টি দিয়ে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ বশীকরণ দণ্ডও বাজারে আনতে পারেন সর্বরোগের ডাক্তারখ্যাত অখ্যাত অনেক কবিরাজ। কাউকে বশীভূত করতে এই দণ্ড সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে পরদিন তার গায়ে ছিটাতে অথবা খাওয়াতে হবে।

ইউরেনিয়াম নিয়ে অনেকেই এমন গালগল্প দিতে পারেন। করতে পারেন রাজনৈতিক স্টান্ডবাজি। আসলে এগুলো কিছুই করা যায় না। তেজস্ক্রিয় এই খনিজ পদার্থটি কাজাখস্তান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিজার, নামিবিয়া এবং রাশিয়ায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলন করা হয়। বিভিন্ন ধরনের মান অনুযায়ী ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে। এছাড়া কিছু শিল্পেও ব্যবহৃত হয়।

সুদূর রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ¦ালানি হিসেবে যে ইউরেনিয়াম এসেছে, তা মোটেই তরল নয়; বরং পাউডারসদৃশ। এই ইউরেনিয়াম গলাতে ন্যূনতম ১১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে ২৮৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন। বাস্তবে এটা অসম্ভব। এজন্য অনেক বেশি এনার্জির দরকার হয়। পাশাপাশি এটি অনেক ব্যয়বহুল। তাছাড়া এটি তরল করার কোনো দরকারও নেই। এই তরল তো কোনো কাজেই লাগে না। কোনো কারণে যদি ইউরেনিয়াম গলে যায় তাহলে সেটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণে হবে। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর ও অন্যান্য যেসব যন্ত্রপাতি আছে সব গলে, বিস্ফোরণ হয়ে বিরাট দুর্ঘটনা ঘটবে।

তাছাড়া আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এই ইউরেনিয়াম অন্যান্য জ্বালানির মতো ইচ্ছেমতো ব্যবহারেরও সুযোগ নেই। এমনকি রূপপুরে ইউরেনিয়াম আসার পর সেটি এখন পারমাণবিক স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। সেখানে যেতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অনুমোদন নিতে হবে। আর রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত প্রতিটি ইউরেনিয়াম দণ্ডের হিসাব বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিতে হবে পরমাণুর শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক ওই সংস্থাটিকে। কতগুলো ইউরেনিয়াম দণ্ড ব্যবহার হলো আর কতগুলো অব্যবহৃত থাকল তা নিয়মিত আইএইএকে জানাতে হবে। আর অব্যবহৃত ইউরেনিয়াম দণ্ড কিন্তু পুড়ে কয়লার মতো ছাই হয়ে যায় না। দণ্ডের ভেতরে থাকা ইউরেনিয়াম পুড়িয়ে তাপ উৎপাদন হয় যা দিয়ে তৈরি হয় বিদ্যুৎ। ফলে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম দণ্ড বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। পরিবহনের সময় কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি কোনো দণ্ড ভেঙে যায় সেই হিসাব এবং যথাযথ ব্যাখ্যাও দিতে হবে বাংলাদেশকে। এককথায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি আইএইএর নজরদারিতে থাকবে। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্পেন্ট ফুয়েল বা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে যাবে রাশিয়া।

অব্যবহৃত ইউরেনিয়াম না গলিয়ে যদি স্পেন্ট ফুয়েল গলিয়ে মাথায় ঢালার চেষ্টা করা হয় তাহলে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়বে। যার মাথায় ঢালা হবে আর যিনি ঢালবেন তাদের দুজনেরই মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার পাশাপাশি চারপাশের বহু দূর পর্যন্ত এর ক্ষতিকর মাত্রা ছড়িয়ে পড়বে। যার ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে পরিবেশ ও মানবদেহের ওপর। ইউরেনিয়াম জ্বালানিরন তেজস্ক্রিয়তা যাতে কোনো অবস্থাতেই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য শুরু থেকেই নিরাপত্তার দিকটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

লেখক: সাংবাদিক।