দক্ষিণ আফ্রিকার ওলন্দাজ কানেকশন

ধর্মশালায় আজ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লড়াই নেদারল্যান্ডসের। ম্যাচের আগে নিয়ম অনুযায়ী বাজবে দুই দলের জাতীয় সংগীত। তখন দেখা যেতে পারে ডাচদের কেউ কেউ মুখ নাড়াচ্ছেন প্রোটিয়াদের সঙ্গে। অনেকের জন্য দৃশ্যটি হতে পারে বিস্ময়ের। যারা কারণ জানেন, তাদের কাছে ঘটনাটি স্বাভাবিক মনে হবে। যে দেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেখানকার জাতীয় সংগীত তো পারারই কথা। ওলন্দাজ ক্রিকেটারদের এমন কান্ড দেখে কাউকে হয়তো ছুঁয়ে যেতে পারে আবেগ, প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে নামলেও জন্মভূমির প্রতি শ্রদ্ধা যে এখনো আছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা ও ডাচদের সম্পর্কটা অনেক পুরনো। সেই সপ্তদশ শতাব্দীতে যার শুরু। ব্যবসার কারণে তখন বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত ওলন্দাজরা। সেই সুবাদে ওই শতাব্দীর মাঝমাঝিতে আফ্রিকার দক্ষিণে কেপ অঞ্চলে গিয়ে উপস্থিত হয় ডাচদের একটি দল। ধীরে ধীরে সেখানে খামার ও খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে তোলে তারা। সময়ের সঙ্গে সেখানে আলাদা জনবসতি গড়ে তোলে ডাচরা। পরে যার নাম দেওয়া হয় ‘ডাচ কেপ কলোনি।’ এরপর ওই অঞ্চলে ফরাসি, জার্মান ও ইংরেজরা এসে বসতি গড়ে তোলে। তাই দক্ষিণ আফ্রিকায় দেখা যায় মিশ্র বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ যাদের ডাকা হয় আফ্রিকানার্স।

দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট দলেও তাই খেলে গেছেন আফ্রিকানার্স বংশোদ্ভূত অনেকেই। খেলছেন এখনো। তাদের এবারের বিশ্বকাপ দলেও যেমন আছেন রাসি ফন ডার ডুসেন, হেইনরিখ ক্লাসেন, জেরাল্ড কোটজের মতো ক্রিকেটার, যারা ওলন্দাজদের বংশধর।

আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় সুযোগ না পাওয়ায় অনেক ডাচ খেলোয়াড়ই নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলছেন। এই বিশ্বকাপেই আছেন যেমন পাঁচজনÑ রোলফ ফন ডান মারওয়ে, কলিন অ্যাকারম্যান, ওয়েসলি বারেসি, সিব্র্যান্ড এঙ্গেলব্রেখট ও রায়ান কেইন।

জোহানেসবার্গে জন্ম নেওয়া মারওয়ের ক্রিকেটে হাতেখড়ি, এই খেলার আঙিনায় বিচরণ শুরু দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে। দেশটির ঘরোয়া ক্রিকেটের দল নর্দার্নসের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক বাঁহাতি এই স্পিনারের। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে পা রাখেন একই দলের হয়ে। আর প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলেন টাইটান্সের জার্সিতে। ২০০৯ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক আঙিনায় পথচলা শুরু তার দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সিতে ১৩টি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলা এই ক্রিকেটার এখন মাঠ মাতান নেদারল্যান্ডসের হয়ে। এখন পর্যন্ত কমলা জার্সি গায়ে চাপিয়ে ৫ ওয়ানডে ও ৩৯ টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ৩৮ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। নেদারল্যান্ডসের বিশ্বকাপ দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞদের একজন তিনি। আসরে দুই ম্যাচে ২ উইকেট পেয়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম কেপ প্রদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জর্জে জন্ম অ্যাকারম্যানের। দেশটির হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট খেলা এই ক্রিকেটারের প্রথম শ্রেণি, লিস্ট ‘এ’ ও টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক ইস্টার্ন প্রভিন্সের হয়ে। প্রতিভাবান এই ব্যাটিং অলরাউন্ডার দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট দলে ডাক পাবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল একসময়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুযোগ না আসায় কোলপ্যাক চুক্তি করে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি। ২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডসের জার্সিতে খেলেন। দুই বছর পর পা রাখেন ওয়ানডে আঙিনায়। ৯ ওয়ানডে ও ২২ টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ৩২ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। বিশ্বকাপ দলের গুরুত্বপূর্ণ এই সদস্য নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচে করেছেন ৬৯ রান।

ডানহাতি পেসার রায়ান ক্লেইন জন্মেছেন কেপ টাউনে। দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া দল ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের হয়ে ২০১৯ সালে প্রথম শ্রেণি ও লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে পা রাখেন ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। উত্তরাধিকারসূত্রে নেদারল্যান্ডসের পাসপোর্টধারী ক্লেইন। আন্তর্জাতিক আঙিনায় তার অভিষেকও ডাচদের হয়ে, গত বছরের জানুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি দিয়ে। এখন পর্যন্ত ১৩ ওয়ানডে ও ২ টি-টোয়েন্টি খেলা এই পেসারের মোট শিকার ১৩ উইকেট। বিশ্বকাপ অভিষেকে কিউইদের সঙ্গে ছিলেন তিনি উইকেটশূন্য।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার ওয়েসলি বারেসির জন্ম জোহানেসবার্গে। ইস্টার্নসের হয়ে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। ২০০৪ সালে প্রথম শ্রেণির ও লিস্ট ‘এ’ অভিষেক তার। পরে তিনি পাড়ি জমান নেদারল্যান্ডসে। ২০১০ সালে ডাচদের হয়ে ওয়ানডে দিয়ে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক। পরের বছর খেলেছিলেন ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে, ৬ ম্যাচে করেছিলেন ১৫৩ রান। এক যুগ পর বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া ডাচদের দলেও আছেন এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। সাদা বলে ৮৭ ম্যাচ খেলে তার রান প্রায় দুই হাজার।

এবারের বিশ্বকাপ দলে সবচেয়ে বড় চমক এঙ্গেলব্রেখট। পেশাদার ক্রিকেটে যিনি খেলেননি সাত বছর। ৩৫ বছর বয়সে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পেয়ে গেলেন এই অলরাউন্ডার। তাও সেটা বিশ্বকাপের ম্যাচ দিয়ে।  জোহানেসবার্গে জন্ম নেওয়া এঙ্গেলব্রেখট ক্রিকেট আঙিনায় নজর কেড়েছিলেন ২০০৮ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। ভারতের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ওই ম্যাচে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে অবিশ্বাস্য ক্যাচ নিয়ে বিরাট কোহলিকে ফিরিয়েছিলেন তিনি।  ফিল্ডিংয়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলের সঙ্গে রাখা হয় তাকে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর খেলা হয়নি। ২০১৬ সালে সবশেষ পেশাদার ক্রিকেট খেলা এই ক্রিকেটার একসময় পাড়ি জমান নেদারল্যান্ডসে। গত আগস্টে ডাচদের জার্সিতে তাকে খেলার অনুমতি দেয় আইসিসি। যার সুবাদে এখন তিনি বিশ্বকাপ দিয়ে পাচ্ছেন আন্তর্জাতিক আঙিনায় খেলার স্বাদ।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলতে নামলে কিছুটা ক্ষোভও কাজ করতে পারে এসব ক্রিকেটারের মনে। প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া নেদারল্যান্ডসের সাবেক ওপেনার স্টেফেন মাইবার্গ যেমন বলেছেন, ‘প্রোটিয়াদের বিপক্ষে দেখিয়ে দেওয়ার মনোভাব দেখা যায় কিছু ক্রিকেটারের মাঝে।’ নিজে অবশ্য তেমনটা নন। গত বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ডাচদের কাছে হেরে সেমিফাইনালে খেলার আশা শেষ হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। ওই ম্যাচে ৩৭ রান করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মাইবার্গের ‘বেশ খারাপ লেগেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য।’ তবে ওই জয়কে তার ক্যারিয়ারের বিশেষ অর্জনগুলোর একটি মনে করা এই ক্রিকেটার বলেছেন, ‘নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি অনেক গর্বিত। তবে জন্মভূমিকে আমি সব সময় ভালোবাসব।’ হয়তো সবার ক্ষেত্রেই বিষয়টি তাই।