মনে করুন, হেঁটে যাচ্ছেন কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি ধরে। একপাশে সুনীল সাগরের গর্জন, অন্যপাশে পাহাড়ের সবুজ বা ঝাউগাছের সারি। পছন্দের গানের কলির সুর গেয়ে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ টের পেলেন সরে গেছে পায়ের নিচের জমিন। ডুবে গেছেন জল আর বালির এক অদ্ভুত মিশ্রণে, যেখান থেকে উঠে আসাটা কঠিন। এটাই চোরাবালি। ওপর থেকে বোঝা যায় না। ২০২৩ বিশ্বকাপের শেষ হওয়া প্রথম ১৪টি ম্যাচ মনে করিয়ে দিচ্ছে চোরাবালিকেই। যেখানে দারুণ শুরুর পর অনেক সময়ই দলগুলো মাঝপথে খেই হারিয়েছে, ৩০০ ছাড়ানো সংগ্রহের সম্ভাবনা জাগিয়ে গুটিয়ে গেছে ২০০ রানের আশপাশেই। সবশেষ উদাহরণ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শ্রীলঙ্কা। বিনা উইকেটে ১২৫ থেকে ২০৯ রানে অলআউট!
পাকিস্তানের একটি টেলিভিশনে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়মিত আসছেন ওয়াসিম আকরাম। সঙ্গে আছেন মিসবাহ-উল-হক, শোয়েব মালিক ও মঈন খান। অস্ট্রেলিয়া-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ভালো শুরুর পর হঠাৎ করেই তাসের ঘরের মতো ব্যাটিং অর্ডার ধসে পড়ার সঙ্গে আকরাম মিল খুঁজে পাচ্ছেন পাকিস্তানের ২ উইকেটে ১৫৫ থেকে ১৯১ রানে অলআউট হওয়ার। এই পেস বোলিং কিংবদন্তি মনে করেন, অতিরিক্ত টি-টোয়েন্টি খেলার কারণেই সেই মানসিকতা থেকেই ঘটছে এই ধস, ‘(শ্রীলঙ্কার) দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানই শুরুটা ভালো করেছিল, একজন ৬১ আর অন্যজন ৭৮ রান করেছে। দুজনকেই ভালো মনে হচ্ছিল, খেলাটা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর একটা উইকেট পড়ল, ১২৫ রানে। এরপর ১৫৫ (আসলে ১৫৭) পর্যন্ত এলো পরের জুটি। এরপর তাদের বাকি ব্যাটসম্যানদের কাজ ছিল শুধু ৫০ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিং করা। টেস্টের মানসিকতা এক রকম, টি-টোয়েন্টির আরেক রকম। ওয়ানডে এই দুইয়ের মাঝামাঝি। এখানে ব্যাটসম্যানদের ইনিংস তৈরি করতে হবে, প্রতি বলেই ছক্কা মারতে গেলে চলবে না। কামিন্স যদি দুটো বাউন্সার মেরেই দেয় তাহলে পেছনে এসে সেটা ঠেকাতে হবে, অন্ধের মতো ব্যাট চালানো যাবে না।’
ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তান ভালো শুরুর পর ৩৬ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ২ উইকেটে ১৫৫ রান থেকে ১৯১ রানে অলআউট হয়। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শোয়েব মালিক মনে করেন, পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের শট নির্বাচনে ভুল ছিল, ‘৩১ থেকে ৪০ ওভার, এই সময়ে দুই দিকের নতুন বলই বেশ পুরনো হয়ে যায়। বল বেশি পুরনো হয়ে গেলে এ রকম ধীরগতির উইকেটে আনুভূমিক শট কম খেলে ‘ভি’র (ব্যাটসম্যানের অবস্থান থেকে ইংরেজি ভি অক্ষর কল্পনা করে) ভেতর বেশি খেলতে হয়। বল পুরনো হয়ে গেলে সেটা নিচু হবে, আস্তে আসবে, তখন হোরাইজেন্টাল শট (কাট, পুল, সুইপ এসব) খেলা কঠিন হয়ে যায়। এসব শট খেলতে গিয়েই পাকিস্তানের ৫টি উইকেট পড়েছে।’
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ এবং অস্ট্রেলিয়া-শ্রীলঙ্কা ম্যাচÑ দুটো ম্যাচেই মাঝের ওভারে উইকেট তুলেছেন দুই রিস্টস্পিনার কুলদীপ যাদব ও অ্যাডাম জাম্পা। কুলদীপ এক ওভারেই আউট করেছেন সাউদ শাকিল ও ইফতেখার আহমেদকে। জাম্পাও নিজের পরপর দুই বলে, ২৮তম ওভারের শেষ বলে এবং ৩০তম ওভারে প্রথম বলে আউট করেন কুশল মেন্ডিস এবং সাদিরা সামারাবিক্রমাকে। দুই ম্যাচের এই আউটগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেন্ডিস উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিডউইকেটে দিয়েছেন ক্যাচ আর ইফতিখার উড়িয়ে মারার চেষ্টায় হয়েছেন বোল্ড। সাউদ এবং সামারাবিক্রমা হয়েছেন লেগবিফোর উইকেট। আকরাম কুলদীপের বোলিং নিয়ে বলেছেন, ‘কুলদীপের মতো বোলার যে উইকেট সোজা বোলিং করে, গুগলি বেশি করে, সে উইকেটের মাঝখান বরাবর বল করে। তার বল বের হয়ে এসে সোজা খেলার চেষ্টা করতে হবে, গুগলি করলে মিডঅফ আর সোজা আসলে মিড-অন।’ এখানে মিসবাহ-উল-হক যোগ করেন, ‘বড় টার্ন যেহেতু হচ্ছে না, বিট হওয়ার সম্ভাবনা কম।’ অস্ট্রেলিয়ার লেগস্পিনার জাম্পাও একই কৌশল নিয়েছেন। শুরুর এক-দুই ওভারের পর জাম্পা উইকেটের মাঝবরাবর চেপে এসে বল করেছেন। মালিক সোমবার এই অনুষ্ঠানেই বলেছেন কোথায় পরিবর্তন এনে সফল হয়েছেন এই লেগস্পিনার, ‘ম্যাচের পর সাক্ষাৎকারেও জাম্পাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে কী পরিবর্তন এনেছে বোলিংয়ে। সে বলেছে, কোনো বদলই আনেনি। আসলে তার আত্মবিশ্বাস, যেটা আগের ম্যাচে ছিল না, সেটা ফিরে এসেছে। জাম্পা বলের গতিপথ নামিয়ে এনেছিল, বেশি ঝুলিয়ে দিচ্ছিল না। ফ্লিপার করছিল আর গুগলি করছিল। যখন লেগস্পিনারের প্রথাগত লেগস্পিন কাজ না করে, তখন এই দুটো অস্ত্রই বেশি কাজে দেয়।’
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্রিকেট বিশ্লেষক ও সাবেক কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমও মনে করেন, বেশি বেশি টি-টোয়েন্টি খেলা এবং লেগস্পিনারের বিপক্ষে বেশি আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে আসার কারণেই মাঝের ওভারে চাপ বাড়ে, যেটা ধসের কারণ হতে পারে, ‘টি-টোয়েন্টির ফুটওয়ার্কটা কিন্তু আলাদা। অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, যেটা টেস্টে একদমই আলাদা, রক্ষণাত্মক। লেগস্পিনাররা যেহেতু উইকেট নেওয়ার জন্য বল করে, ব্যাটসম্যানকে প্রলুব্ধ করে, তাই ওদের বিপক্ষে অতি আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে মাঝের ওভারে দ্রুত কিছু উইকেট পড়ে যাচ্ছে, ফলে বাড়তি একটা চাপ তৈরি হচ্ছে। এমনিতেই বিশ^কাপ, জয়ের চাপ, সাফল্যের চাপ, সবকিছুতে কোণঠাসা হয়ে সেখান থেকে ধসের সূচনা হচ্ছে।’
ফাহিম এটাও মনে করেন যে সব ম্যাচেই ৩০০, ৩৫০ রান হবে না এবং সে রকম উইকেটও পাওয়া যাবে না। তাই উইকেট বুঝে ব্যাটিং করাটা গুরুত্বপূর্ণ, ‘অনেক সময় উইকেট বুঝতে দেরি করে ফেলে ব্যাটসম্যানরা, প্রথমে স্কোরটা কম মনে করে অনেক বেশি রান তোলার চেষ্টা করে। সেখান থেকে দ্রুত উইকেট পড়ে যায়। তবে একটা-দুটো উইকেট পড়ার পর পরের দিকের ব্যাটসম্যানদের এসে তো ধরে খেলার কথা। তখন হয়তো রান তোলার চাপ কাজ করে।’
বিশ^কাপে এখন পর্যন্ত হয়ে যাওয়া ম্যাচগুলোতে এই বৈশিষ্ট্য খুব প্রকট। ভালো শুরুর পর দ্রুত অনেকগুলো উইকেটের পতন। পাকিস্তান যেমন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শুরুর ধাক্কাটা সামলে সবচেয়ে বড় সংগ্রহ তাড়া করে জিতেছে, নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শুরুতেই উইকেট হারানোর পর আর হারায়নি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একই অবস্থা ভারতেরও। শুরুর ধাক্কা সামলানোর পর আর হোঁচট খেতে হয়নি। অন্যদিকে আফগানিস্তান ভালো শুরুর পর খেই হারিয়েছে বাংলাদেশের স্পিনে। ম্যাচের পরিস্থিতি, চাপ, স্পিনারদের মান, ব্যাটসম্যানদের শট নির্বাচন এবং ফিল্ডিং সবকিছুর ওপর আসলে নির্ভর করে মিডল অর্ডারকে কতটা চাপে ফেলে ভেঙে ফেলা সম্ভব। প্রমাণ, ভারতের বিপক্ষে মিচেল মার্শের বিরাট কোহলির সহজ ক্যাচ মিস আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কুশল মেন্ডিসের তুলে দেওয়া কঠিন ক্যাচটা ওয়ার্নারের ধরে ফেলা। খেলার মোড় তো ঘুরে যায় ওখানেই। চোরাবালির পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে যায় নিশ্চিন্তে, যার পা পড়ে তার উঠে আসাটাই মুশকিল। মাঝের ওভারের এই ফাঁদ তাই চোরাবালির মতোই।