মধ্য গাজার আলি আহলি আরব হাসপাতালের রোগীদের বেশিরভাগই ছিল ইসরায়েলি হামলায় আহত। সেখানে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও সবার স্বজনেরই আশা ছিল ধীরে ধীরে সুস্থ হবে তাদের প্রিয়জন। তবে গতকাল মঙ্গলবারই হাসপাতালটি জ্বালানি, বিদ্যুৎ আর পানির সংকটে ৮০ শতাংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেখান থেকে কিছু রোগী সরিয়ে নেওয়া হয়। রোগী সরানো অংশে আশ্রয় নেয় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো হাজারো মানুষ। কিন্তু গতকাল রাতে হাসপাতালে থাকা রোগী, রোগীর স্বজন ও আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য মানুষের সব স্বপ্ন থমকে গেছে ইসরায়েলের বিমান হামলায়। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে বিবিসি ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ‘বর্বর’ ওই হামলায় নিহতদের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এখনো অনেকেই হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
হামাসের এক বিবৃতির বরাতে আলজাজিরা বলেছে, হাসপাতালটিতে ইসরায়েলের হামলায় আহতসহ শত শত রোগী ভর্তি ছিল। এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত হওয়া অনেক ফিলিস্তিনি সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। বিবিসি বলছে, হামাসের গণমাধ্যম দপ্তর ইসরায়েলের এ হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অবশ্য হাসপাতালের হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ড্যানিয়েল হ্যাগেরি বলেছেন, ‘কিছুক্ষণ আগেই হামলার ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’ এদিকে হাসপাতালে হামলার ঘটনায় তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন ফিলিস্তিন কর্র্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস।
টানা ১১ দিনের বোমা হামলায় বিধ্বস্ত এক এলাকায় পরিণত হয়েছে গাজা। বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন গাজার বাসিন্দারা। ইসরায়েলের হুঁশিয়ারি, পরে জীবন বাঁচাতে যারা উত্তর গাজা থেকে দক্ষিণে পালিয়েছিলেন, তাদেরও রেহাই নেই। সেখানে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত আছে। গতকালও দক্ষিণ গাজার রাফায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে ৭০ জনের বেশি। রাফায় অবস্থা এমন হয়েছে যে, কোনো কোনো বাড়িতে শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, তারা আপাতত মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেও খাবার আর নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ছাড়া খুব বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে না। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে গাজায় মানবিক বিপর্যয় চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। অবশ্য গাজায় কোনো ধরনের মানবিক সংকট নেই বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লে. কর্নেল রিচার্ড হেচ।
এদিকে গতকাল ইসরায়েলে সফরে গিয়েছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস গতকাল ইসরায়েল সফরে যান। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনও গতকাল ছিলেন ইসরায়েলে। এ ছাড়া আজ বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েল সফর করবেন। বিবিসি বলছে, হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের উদ্ধারে বাইডেন ইসরায়েলিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। একই সঙ্গে বেসামরিক হতাহত সর্বনিম্ন রেখে ইসরায়েল কীভাবে স্থল অভিযান পরিচালনা করবে এবং হামাসকে সুবিধা না দিয়ে গাজায় কীভাবে ত্রাণ পৌঁছানো যাবে, সেসব বিষয়ও গুরুত্ব পাবে তার এ সফরে।
অবশ্য অনেকে বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর নেতাদের ইসরায়েল সফর আসছে এক ধরনের উসকানি। তাদের আশকারায় ইসরায়েল আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। গাজার সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসতে পারে আরও ভয়াবহ হামলা। একই সঙ্গে সেটি ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহকেও ইসরায়েলে হামলা চালানোর জন্য উসকানি দিতে পারে।
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে চালানো হামাসের আকস্মিক হামলার পর গাজার পাল্টা হামলা শুরু করে দেশটি। হামলা-পাল্টা হামলায় গত ১১ দিন ইসরায়েলের ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও হাজার দুয়েক। অন্যদিকে গতকাল পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত বেড়ে তিন হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে আরও হাজারো মানুষ। ইসরায়েলের ভাষ্য, গাজায় তারা হামাস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে এবং হামাস সদস্যদেরই হত্যা করছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ১০ দিনে গাজায় হতাহতদের অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু।
আর এ বিষয়টিকে সামনে এনে ইসরায়েলকে হুঁশিয়ার করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি বলেছেন, দখলদার ইসরায়েলের অপরাধযজ্ঞ অব্যাহত থাকলে প্রতিরোধ সংগ্রামী তথা মুসলমানদের কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, কিছু প্রতিরোধ সংগঠনকে থামাতে যারা ইরানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, এ বিষয়টি তাদের জেনে রাখা উচিত এবং তাদের এ ধরনের আশা করা উচিত নয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, মুসলিম জাতি এমনকি অমুসলিম বিশ্বের জনগণও দখলদার ইহুদিবাদী সরকারের চলমান যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। তাদের এ নৃশংস পাশবিকতা চলতে থাকলে বিশ্বের মুসলমান এবং প্রতিরোধ শক্তিগুলোর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে। তখন কেউ তাদের থামাতে পারবে না বলে খামেনি মন্তব্য করেন। ফিলিস্তিনে চলমান পরিস্থিতিকে বিশ্ববাসীর চোখের সামনে সুস্পষ্টভাবে ‘বংশ নিধন অভিযান’ বলে উল্লেখ করেন সর্বোচ্চ নেতা।
এদিকে বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইসরায়েলে থাকা অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বুধবার ইসরায়েল সফর করবেন। হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের উদ্ধারে বাইডেন ইসরায়েলিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। একই সঙ্গে বেসামরিক হতাহত সর্বনিম্ন রেখে ইসরায়েল কীভাবে স্থল অভিযান পরিচালনা করবে এবং হামাসকে সুবিধা না দিয়ে গাজায় কীভাবে ত্রাণ পৌঁছানো যাবে, সেসব বিষয়ও গুরুত্ব পাবে তার এ সফরে। তবে গতকাল রাতে হাসপাতালে ইসরায়েলের হামলার পর বাইডেন কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা এখন পরিষ্কার নয়।
বিবিসি বলছে, মিসর ও গাজা সীমান্তের রাফাহ সীমান্ত পারাপার খুলে দেওয়ার বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। গাজায় ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ এবং বিদেশি নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে এ সীমান্ত ব্যবহারের কথা রয়েছে। রাফাহ সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলা করেছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। হামলার একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়েছে। বিবিসি এ ভিডিওটি যাচাই করেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। ইসরায়েলে হামলার পর সেখান থেকে আটক জিম্মিদের একজনের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে হামাস। এতে দেখা যাচ্ছে, একজন তরুণী নারী হিব্রু ভাষায় কথা বলছে এবং সে নিজেকে ২১ বছর বয়সী মায়া শেম বলে পরিচয় দিচ্ছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, কমপক্ষে ১৯৯ জন ইসরায়েলি নাগরিককে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হামাসের সামরিক অংশের একজন মুখপাত্র বলেছেন, গাজায় কমপক্ষে ২০০ থেকে ২৫০ জন জিম্মি রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল ও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। মস্কোতে থাকা প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিন থেকে এ কথা জানানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে ক্রেমলিন জানায়, হামাসের হামলায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন পুতিন। একই সঙ্গে তিনি বেসামরিক নারী ও শিশুরা ভুক্তভোগী হয় এমন যেকোনো হামলার বিরোধিতা এবং নিন্দা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে গত কয়েক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিয়মিত ইসরায়েল বিষয়ে কথা বলার পর গতকাল তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আজ বুধবার ইসরায়েল সফর করবেন তিনি। ব্লিঙ্কেন সাংবাদিকদের বলেন, বাইডেনকে ইসরায়েল সফর করার সময় দেশটির যুদ্ধের লক্ষ্য এবং কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ইসরায়েল সফরের বিষয়ে বলেন, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে উত্তেজনার ‘গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে’ তিনি বুধবারে তেল আবিবে পৌঁছাবেন। ইসরায়েল সফর শেষে তিনি জর্ডানের আম্মান সফর করবেন। সেখানে জর্ডানের বাদশা আবদুল্লাহ, মিসরের প্রেসিডেন্ট আল-সিসি এবং ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে দেখা করবেন।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী আইডিএফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেছে, ‘লেবাননে হিজবুল্লাহ অস্ত্রধারীদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা।’ কয়েক দিন ধরে হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সীমান্তে গুলিবিনিময় হচ্ছে। হামাসের তুলনায় তাদের কাছে আরও উন্নত অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বলা হয়, এসব অস্ত্র দিয়ে তারা হামাসের তুলনায় ইসরায়েলের আরও ভেতরে আঘাত করতে সক্ষম।