তবুও ইসরায়েলের পক্ষেই সাফাই বাইডেনের

চলতি মাসের ৭ তারিখে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের আকস্মিক হামলায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল ইসরায়েল। ওই হামলার ১১ দিনের মাথায় গাজার একটি হাসপাতালে ইসরায়েলি হামলায় হতবাক হয়ে গেল পুরো বিশ্ব। গত মঙ্গলবার রাতের ওই হামলায় হাসপাতালের রোগী, রোগীর স্বজন ও হাসপাতালের একাংশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। নারী-শিশুসহ আহত হয়েছে আরও শত শত মানুষ। ইসরায়েল অবশ্য ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। কিন্তু জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনসহ বিশ্বনেতারা ওই বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা এবং একই সঙ্গে অনতিবিলম্বে সেখানে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট গতকাল বুধবার ইসরায়েলের মাটিতে পা রেখেই ভোল পাল্টে ফেলেছেন। আগের দিন এ হামলার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করলেও গতকাল ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সময় কথা বলেছেন ইসরায়েলের সুরেই। বাইডেন বলেছেন, তার ধারণা এ হামলা ইসরায়েলের কাজ নয়। তৃতীয় কোনো গোষ্ঠী হামলাটি চালিয়েছে। ঘটনার দিন ইসরায়েল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও গতকাল দাবি করে, প্যালেস্টানিয়ান ইসলামিক জিহাদ বা পিআইজি ইসরায়েলে হামলা চালাতে গেলে সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হাসপাতালে আঘাত হানে। তবে হামাসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েল ভয়াবহ ওই হামলা চালানোর পর মিথ্যাচার করছে। যুক্তরাষ্ট্র আর পশ্চিমা দেশগুলোর মদদ ও উসকানিই ইসরায়েলকে বেপরোয়া করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকও বাতিল করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা।

রয়টার্স, বিবিসি ও আলজাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা ও মাধ্যমে বলা হয়েছে, হামাসের হামলা ও তার পাল্টায় ইসরায়েলের কথিত অভিযানে প্রতিদিনই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে দুপক্ষের। মঙ্গলবারের ওই ভয়াবহ হামলার পর গতকাল গাজায় বিমান হামলা অব্যাহত রাখে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বলছে, এদিন অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছে একাধিক হামলায়। সব মিলিয়ে ১২ দিনে গাজা উপত্যকায় ৩৪৭৮ জন নিহত হয়েছে, যাদের অর্ধেকই নারী ও শিশু। এ ছাড়া আহত হয়েছে ১২ হাজার ৬৫ জন। পশ্চিম তীরে নিহত হয়েছে আরও ৬১ জন। সেখানে আহত প্রায় হাজারখানেক। অন্যদিকে হামাস ও হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলের নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ জনে পৌঁছেছে। সেখানে আহত হয়েছে প্রায় এক হাজার। দুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি স্মরণকালের রেকর্ড হলেও কোনো পক্ষই যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়নি। জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকান ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি দেশের যুদ্ধ বিরতির আহ্বানে কান দেয়নি কেউ। উল্টো যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো কয়েকটি দেশকে সক্রিয়ভাবে পাশে পেয়ে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবছে ইসরায়েল। অন্যদিকে ইরান ও হিজবুল্লাহর মতো দেশ-সংগঠনের উসকানিতে পিছু হটছে না হামাস।

এদিকে তেল আবিবে পৌঁছেই হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের কথা জানালেন জো বাইডেন। ইসরায়েলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ সফর। পৌঁছানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। এ সময় পাশে ছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট গাজায় হাসপাতালে হামলা চালানোর জন্য ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসীদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, হামাস শুধু দুর্ভোগই নিয়ে এসেছে।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে বাইডেন বলেন, হাসপাতালে বিস্ফোরণের ঘটনায় আমি খুবই মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ এবং আমি যা দেখেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে, এটি আপনারা (ইসরায়েল) নয়, অন্য কোনো পক্ষ করেছে। বাইডেন বলেন, কিন্তু বাইরের অনেক মানুষই নিশ্চিত নয় কে এ হামলা চালিয়েছে। তাই এ নিয়ে আমাদের অনেক কিছু করতে হবে।

বাইডেন বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, হামাস ফিলিস্তিনের সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না এবং তারা সেই মানুষগুলোর জন্য শুধু দুর্ভোগই নিয়ে এসেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফিলিস্তিনের নিরপরাধ মানুষ এবং যুদ্ধের মধ্যে যারা আটকা পড়েছে, তাদের জীবনরক্ষার সক্ষমতাকে নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহুকে আহ্বান জানিয়েছেন।

বাইডেনের সফর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেন, গাজায় সাহায্য পাঠানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল। বাইডেন ইসরায়েল সফর করে গর্বিত বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমি ইসরায়েলের জনগণকে বলতে চাই... তাদের সাহস, তাদের প্রতিশ্রুতি এবং তাদের বীরত্ব অসাধারণ।

অন্যদিকে মঙ্গলবারের হামলার পর ‘সময় শেষ’ বলে ইসরায়েলকে হুঁশিয়ার করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আবদুল্লাহিয়ান বিশ্ব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, আল-আহলি হাসপাতালে ফিলিস্তিনের নিরীহ শিশু-নারীদের ওপর চরম নৃশংসতা চালিয়েছে ইসরায়েল। তিনি লিখেছেন, হাসপাতালে এক হাজারেরও বেশি নিরপরাধ নারী-শিশুর ওপর বোমাবর্ষণ ও হত্যার মধ্য দিয়ে ইহুদি রাষ্ট্রটি ভয়ংকর অপরাধ করেছে। এখন সময় এসেছে ভুয়া এ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব মানবতার ঐক্য গড়ে তোলা, যারা জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসআইএস এবং এর হত্যাযন্ত্রের চেয়েও ঘৃণ্য।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও দাতব্য সংস্থাগুলো হাসপাতালে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানও এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। নিন্দা জানান পশ্চিমা দেশের অনেক নেতাও।