যে দলের বিপক্ষে সবশেষ ৪ ম্যাচের ৩টিতেই জয়, তাদের নিয়ে অত ভাবনা-চিন্তা না করলেও চলে। সরল বিশ্বাসে এমনটা মনে করাই যায়। কিন্তু দলটার নাম ভারত, এই বিশ্বকাপের স্বাগতিক, আগের ম্যাচেই তারা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দিয়ে এসেছে আহমেদাবাদে আর ২০০৭ সালের পর বিশ্বকাপে তাদের কখনোই হারাতে পারেনি বাংলাদেশ এই তথ্যগুলো চোখের সামনে এলে বিশ্বাসে চিড় ধরে। তাই তিনে তিন করে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা ভারতের সামনে টানা দুটো ম্যাচে বড় হারে বিধ্বস্ত হওয়া বাংলাদেশের সামনে পরিসংখ্যানের ঢেকুর তোলার সুযোগ নেই। যেটা আছে, সেটা হলো অনেক দিনের পুরনো কিছু হিসাব মিটিয়ে নেওয়ার সুযোগ। মাঠের এবং মাঠের বাইরেরও।
২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে হাফসেঞ্চুরি করেছিলেন সাকিব আল হাসান এবং মুশফিকুর রহিম। পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলছেন দুজনে, এবারেই শেষ বার। বিসর্জনের মঞ্চে হবে নাকি শুরুর সেই ঝলক, আরও একবার? বেশ অনেকদিন ধরেই আইপিএলে সাকিব হয়ে গেছেন ব্রাত্য। চট করে নিলামে কেউ নাম ডাকে না, ডাকলেও ভিত্তিমূল্যের বেশি দাম ওঠে না। আবার দল পেলেও ম্যাচ পান না। মুশফিক তো আইপিএলে অনেকবার প্রত্যাখ্যানের শিকার, ২০২১ সালেই ১৩ বার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বলেছিলেন, ‘এখন এসবে আমার আর কিছু আসে যায় না।’ তবুও এজেন্টের পীড়াপীড়িতে পরের আসরেও নাম দিয়েছিলেন, আশ্বাসও পেয়েছিলেন দল পাওয়ার কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাননি। এই নিয়ে চাপা অভিমান তো আছেই। সঙ্গে বেঙ্গালুরুর সেই দুঃসহ স্মৃতি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ৩ বলে ৩ রান নিতে না পারার আক্ষেপ। আগেই উদযাপন করে পরে ম্যাচ হেরে যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্রƒপ। মুশফিকেরও খুব সম্ভবত শেষ ভারত সফর। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারটা দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেঙ্গালুরুর সেই দুঃস্বপ্নের আরেক সাক্ষী মাহমুদউল্লাহ যে এই বিশ্বকাপে খেলছেন সেটাও বিস্ময়করভাবে। দিল্লিতে তার নেতৃত্বে ভারতকে বাংলাদেশ একখানা টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২০১৯ সালে হারিয়েছে বটে, তবে তাতে আর বিশ্বকাপে তফাৎটা বলিউডের সিনেমা আর সেসবের ঢাকাই রিমেকের মতোই। বড় মঞ্চে, দুই ভায়রা ভাই মিলে ভারতকে হারিয়ে একটা নাটকীয় প্রস্থানের চিত্রনাট্য লিখতে কি পারবেন?
মোস্তাফিজুর রহমানের আবির্ভাবটা হয়েছিল ভারতের বিপক্ষেই। মিরপুরে দুই ওয়ানডে ভারতের বিপক্ষে রহস্যময় এক ধাঁধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মোস্তাফিজ, এরপর আইপিএলেও এক মৌসুম কার্যকর ছিল তার এই চমক। তারপর নানান কারণে মোস্তাফিজ রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে সার্কাসের পোষমানা বাঘে পরিণত হয়েছেন। আগের বছর দিল্লি ক্যাপিটালস তাকে ধরে রেখেছিল, এই বছর খেলিয়েছে মোটে দুই ম্যাচ। সামনের মৌসুমে দল পাওয়ার জন্য কিছু তো করে দেখাতে হবে মোস্তাফিজকে। সে জন্য ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটাই তো সেরা সুযোগ।
জবাব দেওয়ার সেরা সুযোগ তো লিটন দাসের সামনেও। আইপিএলে গেলেন আর আসলেন। ১ ম্যাচ, ৪ রান। এটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে লিটনের আইপিএল অধ্যায়। সঙ্গে কিছু ফেসবুক পোস্ট। আগের ম্যাচে প্রথম বলেই বেরিয়ে এসে ট্রেন্ট বোল্টের বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে হয়েছেন ক্যাচ আউট। এরপর পুনের হোটেল থেকে সাংবাদিকদের তাড়িয়ে দিয়ে পরদিন ক্ষমা প্রার্থনা। লিটন জানেন, আজকের প্রতিপক্ষ শুধু বুমরা-সিরাজরাই নয়, অনেকগুলো মাইক্রোফোন আর ল্যাপটপও। আরেকটা খারাপ ইনিংস মানেই ধেয়ে আসা অনেকগুলো ট্রলের বাউন্সার, সমালোচনার ইয়র্কার। ৬ বলে ওভার আর ৫০ ওভারে ম্যাচ শেষ হলেও এই বাউন্সার, ইয়র্কারগুলো এত সহজে শেষ হবে না। সব কিছুই বদলে দিতে পারে একটা ভালো ইনিংস। ২০১৮’র দুবাই অথবা ২০২২-এর অ্যাডিলেডের মতো।
ভারতীয় দল এখন আত্মবিশ্বাসের এমন চূড়ায় যে কোনো কিছুই তাদের গায়ে লাগছে না। স্টার স্পোর্টসের ভিডিওতে সাকিবকে নিয়ে ভালো ভালো কথা বলতে শোনা গেছে বিরাট কোহলি আর হার্দিক পান্ডিয়াকে। কিন্তু কাল সংবাদ সম্মেলনে আসা বোলিং কোচ পরশ মামব্রের কথায় উড়িয়ে দেওয়ার সুর, ‘আমরা জানি সাকিব ভালো ক্রিকেটার, চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার, ভালো বল করে, পাওয়ার প্লেতে বল করে, দলের জন্য ব্যাটও করে। তবে আমাদের জন্য এসবে কিছুই আসে যায় না’। আহমেদাবাদে নীল জার্সির ঢেউয়ে আর বন্দে মাতরম গর্জনে পাকিস্তানকে ভাসিয়ে দেওয়ার পর এমন আত্মবিশ্বাস মানানসই, তবে মনে রাখা দরকার আত্মবিশ্বাস আর অতি-আত্মবিশ্বাসের পার্থক্য সামান্যই।
বাংলাদেশের অধিনায়ক খুব সম্ভবত পণ করেছেন সংবাদ সম্মেলনে আসবেন না। কাল ফের এলেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, বিশ্বকাপে এরই মধ্যে তার সংবাদ সম্মেলনের সংখ্যা হয়ে গেছে তিন। তার সমান উপস্থিতি জনাথন ট্রটের, আফগানদের এই ইংরেজ কোচ বেশি গণমাধ্যমে আসেন কারণ তার দলের অনেক ক্রিকেটারই ইংরেজি বলতে পারেন না। বাংলাদেশ দলে এই সমস্যাটা নেই, তাছাড়া বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পঞ্চাশেরও অধিক সাংবাদিকদের বহর থেকে প্রশ্ন বাংলাতেই করা হয়। ভারতীয় গণমাধ্যমেরও একটি বড় অংশ বাংলাভাষী। তবুও সিংহলী মাতৃভাষার মানুষটিকে কেন পাঠানো হলো সেই প্রশ্নের উত্তর কে দেবেন জানা নেই। তবে তার কাছেই জানা গেল, সাকিবের ভাগ্য আজ সকালে নির্ধারণ হবে, ‘সাকিবকে আজ (বুধবার) স্ক্যান করানো হয়েছে। রিপোর্ট দেখে সকালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সে গতকাল (মঙ্গলবার) লম্বা সময় ব্যাটিং করেছে, খানিকটা দৌড় অনুশীলনও করেছে। বোলিংটা করেনি। এই মুহূর্তে সে ঠিক আছে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) সকালে আবার তাকে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে’।
উইকেট সম্পর্কে হাথুরুর মন্তব্য, ‘খুব সম্ভবত এতদিন যে সব উইকেটে খেলেছি তাদের মধ্যে সেরা ব্যাটিং উইকেট। অনুশীলনের উইকেটগুলো একই রকম। খুবই ভালো’। সমস্যা হচ্ছে এরকম উইকেটে তার সামনে যে প্রতিপক্ষ, তাদের ব্যাটিং লাইনআপটাও খুবই খুবই ভালো। আর নিজের দলের ব্যাটিংটা খুবই খুবই খারাপ। তিন ম্যাচের একটিতেও তারা আড়াইশ রানও করতে পারেনি।
ফর্মের তুঙ্গে থাকা খুব ভালো ব্যাটিং লাইনআপের দলকে, খুব ভালো উইকেটে হারাতে হলে প্রথাগত কৌশলের বাইরে বাড়তি কিছু লাগবে। বাড়তি কোনো অনুপ্রেরণা যা অ্যাড্রেনালিনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেবে, ঝুঁকি নিতে শেখাবে। ছোট ছোট ব্যক্তিগত খন্ডযুদ্ধগুলো হতে পারে সেই উৎস, যার যোগফলে অসম্ভবকেও করা যেতে পারে সম্ভব। তা না হলে, এই অশ্বমেধের ঘোড়া থামবার নয়।