রিজার্ভের শর্ত শিথিল করল আইএমএফ

বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণের শর্ত অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে দেশের রিজার্ভ থাকার কথা ছিল ২৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই শর্ত পূরণে বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে শর্ত শিথিল করে রিজার্ভ সংরক্ষণের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। গতকাল বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আইএমএফের দেওয়া নতুন শর্ত অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ১৯ বিলিয়ন রাখতে হবে। তবে আগামী বছরের জুনে রিজার্ভ ২০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন রাখতে হবে বাংলাদেশকে। পূর্বশর্ত অনুযায়ী, রিজার্ভ সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় আইএমএফ নতুন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র।

ইতিমধ্যেই নানা বিধিনিষেধের কারণে দেশের আমদানি ব্যয় অনেকটাই কমে এসেছে। আর আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ রয়েছে। তাই তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের পরিমাণকে আগামী ডিসেম্বরের রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ, যাতে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছে আইএমএফ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আইএমএফের কাছে রিজার্ভের শর্ত শিথিলের আবেদন করেছিলাম। সংস্থাটি সে বিষয়ে ইতিবাচক। আমাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’ তবে রিজার্ভের প্রকৃত হিসাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৩ জুলাই থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী গ্রস বা মোট রিজার্ভের হিসাব করছে। আইএমএফের পদ্ধতি অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার গ্রস রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। আগস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার কমে ২১ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। জুনের চেয়ে জুলাইয়ে কমেছিল ১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ের চেয়ে আগস্টে কমেছিল ১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।

আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্তের আলোকে সেপ্টেম্বর শেষে নিট রিজার্ভ ২৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা। তবে গ্রস রিজার্ভের চেয়ে নিট রিজার্ভ আরও ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি কম। এর মানে, বর্তমানে নিট রিজার্ভ রয়েছে ১৮ বিলিয়ন ডলারের নিচে। আগামী ডিসেম্বরে রিজার্ভ ২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার শর্ত দিয়েছে আইএমএফ, যা পরিপালন সম্ভব হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ঠিক এই সময়ে সমঝোতার বার্তা শোনা যাচ্ছে চারদিকে।

আইএমএফ ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য চলতি বছর জুন পর্যন্ত ছয়টি শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে ন্যূনতম রিজার্ভ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের শর্ত পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভের (এনআইআর) পরিমাণ ২৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রাখার কথা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু তা এখন ২১ বিলিয়ন ডলারে রয়েছে (গ্রস হিসাবে)। তবে নিট হিসাব করলে তা ১৭ বিলিয়ন থেকে সামান্য বেশি। এ ছাড়া আইএমএফের শর্তানুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। কিন্তু গত অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা কম আদায় করেছে। ব্যর্থতার জন্য চলতি অর্থবছর এনবিআরের যে স্বাভাবিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার চেয়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে।

আইএমএফের শর্তানুযায়ী, চলতি বছর জুনের মধ্যে যেসব শর্ত বাংলাদেশ পূরণ করতে পেরেছে তা হলো, সুদের হার নির্ধারণে করিডরব্যবস্থা চালু করা ও আইএমএফের বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের প্রতিবেদন প্রকাশ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রস আন্তর্জাতিক রিজার্ভের (জিআইআর) তথ্য প্রকাশ করে, নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভের (এনআইআর) প্রকাশ করে না। এ ছাড়া মুদ্রার বাজার-নির্ধারিত বিনিময় হার প্রবর্তন করা ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কর্মপরিকল্পনা শেষ করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা শর্ত ছিল সংস্থাটির। এ দুটি শর্ত পূরণ করতে পেরেছে বাংলাদেশ।