পরিবেশবান্ধব মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল উদ্বোধন হবে আগামী ২৯ অক্টোবর। পুরোদমে এই প্রকল্প চালু হলে সময়, যানবাহন পরিচালনা ও কার্বন নিঃসরণ বাবদ বছরে খরচ কমবে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। মেট্রোরেল প্রকল্পের বিভিন্ন গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করে এমন চিত্র মিলেছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশ চালু হওয়ায় যানজট, বায়ুদূষণ কমবে এবং যাত্রীদের সময় সাশ্রয় হবে। সময় সাশ্রয়ের ফলে দৈনিক ক্ষতি কমবে ৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা; যার বার্ষিক পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। আর এই করিডরে যানবাহন পরিচালনা বাবদ দৈনিক খরচ কমবে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা; যার বার্ষিক পরিমাণ ৪৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে যানবাহনের জ্বালানির কারণে বছরে ওই করিডরে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হতো মেট্রোরেল চালু হওয়ায় ২ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে। এর আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাছের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেট্রোরেল পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। এ প্রকল্প চালু হলে সময়, যানবাহন পরিচালনা ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে। মেট্রোরেলের গবেষণায় বলা হয়েছে, মেট্রোরেল চালু হলে বছরে ২ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টন কার্বন নিঃসরণ কমবে। এর আর্থিক মূল্য হিসাব করলে হতে পারে অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, মেট্রোরেল ভালো প্রকল্প; তবে ঢাকার যানজট নিরসন ও চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ফুটপাত, শৃঙ্খলিত গণপরিবহন গড়ে তোলা দরকার। পাশাপাশি রাজধানীতে সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলে মেট্রোরেলের কার্যকর সুবিধা পাওয়া যাবে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার যানজট নিরসন ও পরিবেশ উন্নয়নে ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। প্রথম প্রকল্প ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি)-৬। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার অংশের উদ্বোধন করেন গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর। শুক্রবার ছাড়া উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলাচল করছে। এই অংশে দৈনিক ৮০ হাজার যাত্রী চলাচল করে। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশও একই নিয়মে চলবে। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ চালুর পর প্রথমে ফার্মগেট, সচিবালয় ও মতিঝিল স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা করতে পারবে। উদ্বোধনের দুই সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় স্টেশন চালু করা হবে। পরে ধাপে ধাপে অন্য স্টেশনগুলো চালু করা হবে। প্রথমে সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করবে। পরের তিন মাসে ধাপে ধাপে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলাচল করবে। এরপর সময় আরও বাড়াবে এবং সপ্তাহে প্রতিদিন চলাচল করবে মেট্রোরেল।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, এমআরটি-৬ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়ের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এরই মধ্যে জাপানের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আর বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এমআরটি-৬ প্রকল্পের আওতায় উত্তরা সেন্টার স্টেশনসংলগ্ন ভূমিতে ২৮ দশমিক ৬১ একর জমিতে টিওডি বা বহুমুখী বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। টিকিটের টাকা ও ওই টিওডির টাকায় এমআরটি-৬ প্রকল্প পরিচালনা করা হবে। এ ছাড়া উত্তরা উত্তর, আগারগাঁও, ফার্মগেট ও কমলাপুরে স্টেশন প্লাজা গড়ে তোলা হবে। এসব স্টেশন প্লাজায়ও বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম থাকবে। এমআরটি-৬ প্রকল্পের যাত্রীদের ওঠানামার জন্য ১৭ স্টেশন করা হয়েছে। স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয়সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, মতিঝিল ও কমলাপুর।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ঢাকার যানজট নিরসনে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (এসটিপি) সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রথমে ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর একনেকে এমআরটি-৬ প্রকল্প অনুমোদন করে। আর মেট্রোরেলের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে ২০১৩ সালের ৩ জুনে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল) গঠন করে।
পাশাপাশি ঢাকা ও আশপাশের এলাকার পরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ২০০৫ সালের এসটিপি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। সংশোধিত ২০১৫-৩৫ মেয়াদের এসটিপিতে ৬টি মেট্রোরেল প্রকল্প যুক্ত করে। সবগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক দাঁড়াবে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। এরই মধ্যে উড়াল ৬৯ কিলোমিটার এবং পাতাল ৬১ কিলোমিটার। যানজটে ঢাকার বার্ষিক ক্ষতি ৩ দশকিম ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ, প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হলে রাজধানীবাসীর জীবনে ভিন্নমাত্রা ও গতি যোগ হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং জিডিপির গ্রোথ বাড়বে; সময় সাশ্রয়ী যানে চলাচল করবে ৫০ লাখ মানুষ। আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুসরণ করে এই যানবাহনে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী সব শ্রেণির মানুষের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।