বাঙালির অতুল রসবোধের দৃষ্টান্ত

গ্রামবাংলায় সাধারণ মানুষের আসরে প্রচলিত গল্পগুলোর এক অসাধারণ সংকলন জসীম উদ্দীনের ‘বাঙালীর হাসির গল্প’। জসীম উদ্দীন কবি হিসেবে পাঠকের কাছে পরিচিত। তার অসাধারণ গদ্যের পরিচয় পাওয়া যায় যে কয়টি বইয়ে তার মধ্যে ‘বাঙালীর হাসির গল্প’ অন্যতম। বাঙালি জাতি চড়াসুরের অনুভূতিপ্রবণ জাতি। এরা অল্পতে রেগে যায়। তুলকালাম কান্ড ঘটায়। আবার মিষ্টি করে হেসে কথা বললে আগের মনোমালিন্য ভুলেও যায়। এ বেলার খাবারের চিন্তা দূর হলে দুদ- বসে সুখ-দুঃখের আলাপ করার মতো মন তাদের আছে। এই আলাপ-গল্পের আসরে মোড় নিতে সময় লাগে না। অবিশ্বাস্য গল্পকে সত্যের মোড়কে উপস্থাপনে বাঙালির জুড়ি নেই। উপস্থিত শ্রোতা তা বুঝতে পারলেও গল্পের রসভঙ্গ হবে বলে চুপচাপ শোনে, গল্প বলায় বিঘœ ঘটায় না। এখানেই বাঙালির সৃজনশীলতা, রসবোধ ও গল্প বলার মুনশিয়ানা। সাহিত্যের এ কথ্যরূপের ইতিহাস সুপ্রাচীন। যুগ যুগ ধরে এসব গল্প মানুষের মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে সভ্যতা থেকে সত্যতায়। বাঙালীর হাসির গল্প সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। আর নতুন নতুন গল্পের জন্ম নেওয়া তো রয়েছেই। তবে এও সত্য যে, যা সহজেই মানুষের মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়ে তা সহজে হারিয়েও যেতে পারে। লিখিত যুগে তাই এসব গল্প-উপাখ্যান লিখে সংরক্ষণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বাঙালীর হাসির গল্পও এমনই একটি প্রচেষ্টা। তবু এই বইটি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। আর সে কারণেই বইটি একটি সংকলন গ্রন্থ হওয়ার পরও লেখকের নাম প্রকাশিত হয়েছে জসীম উদ্দীন। সেই বৈশিষ্ট্যটি হলো, লেখক গল্পগুলো বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শুনে গল্পকথকের কথ্যরূপকে সাধারণের বোধগম্য লিখিতরূপে প্রকাশ করেছেন। পল্লীবালার মণিমাণিক্যকে নাগরিক পাঠকের সাহিত্যরুচি অনুযায়ী পরিমার্জিত করে পরিবেশন করেছেন। এর ফলে কখনো গ্রামে না যাওয়া ও গ্রামের মজলিশে গল্প শোনার অভিজ্ঞতা না থাকা একজন বাঙালিও ‘বাঙালীর হাসির গল্প’র সঙ্গে শিকড়ের টান খুঁজে পাবেন। এই গল্পগুলো তাই নিছক হাসির গল্প নয়, বাঙালির রসবোধের দৃষ্টান্ত। বইটি বিশেষ করে শিশুদের উদ্দেশ্যেই লিখেছেন লেখক। শুধু তাই নয়, তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, বইটি ভালো লাগলে এই শিশু পাঠকরা তাদের চারপাশে প্রচলিত এমন গল্পগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করবে। নির্মল আনন্দের এই বইটি ছোট-বড় সবার ভালো লাগার মতো একটি বই।               

সুলতানা রাজিয়া