আইএমএফের দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ডলার ডিসেম্বরে

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আইএমএফের বোর্ডসভায় বাংলাদেশের জন্য বর্ধিত ঋণ সুবিধা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সুবিধা (ইএফএফ) ও স্থিতিস্থাপক ও স্থায়িত্ব সুবিধার (আরএসএফ) অধীনে ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ঋণ অনুমোদন হতে পারে। ঢাকায় আইএমএফের মিশনের শেষ দিনে প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল চলতি মাসের ৪ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকায় তাদের মিশন শেষ করেছে এবং সরকারের সঙ্গে কর্মকর্তা পর্যায়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। আইএমএফ প্রতিনিধিদল গতকাল মিশনের সর্বশেষ দিনে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে। মিশন শেষ করেই তাদের পাঠানো বিবৃতিতে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের ইঙ্গিত দেয়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার মুখপাত্র মেজবাউল হকও ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সমঝোতার বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।

মিশন শেষে আইএমএফের প্রতিনিধিদলের প্রধান রাহুল আনন্দ বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এবং আইএমএফ কর্মকর্তারা ইসিএফ, ইএফএফ ও আরএসএফের প্রথম পর্যালোচনা শেষ করে প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এবারের আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিনিধিদল প্রতিবেদন প্রণয়ন করে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য পেশ করবে। পর্ষদ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রথম পর্যালোচনা অনুমোদন পেলে ইসিএফ-ইএফএফের অধীনে প্রায় ৪৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার এবং আরএসএফের অধীনে ২১ কোটি ৯০ লাখ ডলার পাবে বাংলাদেশ। অর্থাৎ ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার অনুমোদন পেতে পারে।

বাংলাদেশে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে অগ্রগতি হয়েছে, আইএমএফের প্রতিনিধিদল তাকে স্বাগত জানিয়েছে। সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার যে নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে, তাকেও স্বাগত জানিয়েছে আইএমএফ।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সাড়া দিয়েছে আইএমএফ। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে আইএমএফ। ঋণ অনুমোদনের পর বিজ্ঞপ্তিতে আইএমএফ জানায়, ইসিএফ বা বর্ধিত ঋণসুবিধা ও ইএফএফ বা বর্ধিত তহবিল সুবিধার আওতায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ৩৩০ কোটি মার্কিন ডলার এবং নতুন গঠিত তহবিল আরএসএফের আওতায় আরও ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়। অনুমোদনের পরপরই ঋণের প্রথম কিস্তি হিসেবে বাংলাদেশ ৪৭৬ মিলিয়ন বা ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার পায়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে বলে মনে করে আইএমএফ। তাদের পূর্বাভাস, চলতি অর্থবছরের শেষার্ধে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ স্বল্প মেয়াদে ধারাবাহিকভাবে বাড়বে এবং মধ্য মেয়াদে চার মাসের আমদানির সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থাকবে বলে বিবৃতিতে পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে এই পূর্বাভাস ঘিরে উচ্চমাত্রার অনিশ্চয়তার পাশাপাশি ঝুঁকি রয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।

আইএমএফ আরও জানায়, আইএমএফের শর্তের বিপরীতে বাংলাদেশের কাঠামোগত সংস্কার করলেও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে। বিশ্বব্যাপী আর্থিক হুমকির মধ্যে বাংলাদেশেও আর্থিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে। স্বল্প মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে বাংলাদেশকে আরও কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন মুদ্রা সরবরাহ আরও সংকুচিত করা এবং তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিরপেক্ষ রাজস্ব নীতি ও মুদ্রার বিনিময় হার আরও নমনীয় করা।

স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এখনো ঝুঁকি আছে উল্লেখ করে রাহুল আনন্দ বলেন, বাংলাদেশ ২০২৪ সাল শেষে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ৬ শতাংশে রাখার লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছে। কিন্তু অনিশ্চয়তার কারণে এ মূল্যস্ফীতি অর্থবছর শেষে ৭ দশমিক ২৫ হতে পারে। এ ছাড়া অর্থনীতি যেভাবে নানা কারণে ব্যাহত হচ্ছে, তার প্রভাব যেন অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর যেন তেমন একটা না পড়ে, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংক যে ৪ অক্টোবর নীতি সুদহার ৭৫ ভিত্তি পয়েন্ট বৃদ্ধি করেছে, তাকে স্বাগত জানিয়েছে তারা।

বিবৃতিতে রাহুল আনন্দ আরও বলেন, সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত অনেক কম, এই পরিস্থিতিতে টেকসইভাবে কর সংগ্রহ বাড়াতে সমন্বিত কর নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ছাড়া ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ, ব্যয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা খাত ও প্রবৃদ্ধি সহায়ক বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে।

অর্থনীতির বহিঃস্থ খাতের ঝড়ঝাপটা মোকাবিলায় মুদ্রা ও বিনিময় হার নীতি কাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং ব্যবস্থাপনার উন্নতি গুরুত্বপূর্ণ। সুদহারের ক্ষেত্রে করিডর ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং একীভূত একক বিনিময় হার গ্রহণের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে আইএমএফ। তাদের পরামর্শ, এর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংককে সুদের হারের ‘টার্গেটিং ফ্রেমওয়ার্ক’ পুরোপুরি চালু করাসহ ধীরে ধীরে নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থায় যেতে হবে।

এদিকে দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে আইএমএফ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ হ্রাস করা, তত্ত্বাবধান বৃদ্ধি করা, শাসনব্যবস্থা জোরদার করা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর উন্নতি করা গেলে আর্থিক খাতের দক্ষতা বাড়বে। এ ছাড়া প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারের উন্নয়ন অর্থায়ন প্রক্রিয়া গতিশীল করতে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেজবাউল হক বলেন, ‘দেশের স্বার্থে আমরা রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছি। প্রয়োজনে আরও করব। কারণ আমাদের দেশের স্বার্থ সবার আগে। জ্বালানি ও সারসহ জাতীয় প্রয়োজনে ডলার না দিয়ে রিজার্ভ বাড়িয়ে আমরা কী করব। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের গ্রস রিজার্ভ ২৬ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফর হিসাবে বাংলাদেশের গ্রস রিজার্ভ ২০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। যাকে বিপিএমন্ড৬ ম্যানুয়াল নামেও অভিহিত করা হয়। তবে নিট রিজার্ভ হিসাবে আরও ৪ বিলিয়ন কম হবে।