ভেজালের বিরুদ্ধে ২২ বছর

২২ বছর ধরে লড়ছেন তিনি, লক্ষ্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। কোনো বাধা ভেজাল ও মানহীন খাবারের বিরুদ্ধে তার এ নিরন্তর লড়াই থেকে তাকে সরাতে পারছে না। লোভনীয় প্রস্তাব, ভয়ভীতি সবকিছু তার কাছে তুচ্ছ। আমৃত্যু এ লড়াই চালিয়ে যেতে চান তিনি। তার নাম কামরুল হাসান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য পরিদর্শক। নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ৭২৮ জনের তিনি একজন।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পশ্চিম খরন্দ্বীপ গ্রামে তার জন্ম। কামরুল হাসান আশৈশব ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে কাজ করার বাসনা পোষণ করছেন। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে যেতেন গ্রামের বাজারে। তখন কয়েকবার তিনি দেখেছেন দুধ বিক্রেতারা দুধ ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। বাবার কাছে জানতে পারেন, যারা দুধে পানি মিশিয়ে বাজারে আনে তারা সরকারি লোকের ভয়ে দৌড়ে পালায়। তখনই সরকারি লোক হওয়ার বাসনা তার মনে জাগে। শৈশবেই সামরিক বাহিনীতে চাকরি করা স্বজনদের শৃঙ্খলা ও সততা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এসব বিষয় তাকে তাড়িত ও অনুপ্রাণিত করেছে।

নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান কামরুল হাসানের স্বপ্নপূরণ পাহাড় ডিঙানোর সমান কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৭ সালে এসএসসি পাস করার পর সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। উপার্জনের জন্য আসেন রাজধানী ঢাকায়। প্রথমে স্বজনদের সঙ্গে থেকে বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করেছেন। ১১ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে পা রাখেন স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপে। নয়াবাজার শ্রমজীবী হাসপাতালে চাকরি নেন স্বাস্থ্য সহকারী পদে। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন। এরপর কর্তৃপক্ষ তাকে ওয়ার্ড সচিব হিসেবে পদায়িত করে রাজাবাজার-ফার্মগেট এলাকায়। তখন ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন বিখ্যাত ফুটবলার আবদুল গাফফার। ২০০১ সালে স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। তখন থেকে তিনি লড়ে যাচ্ছেন ভেজাল খাবার উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণনের বিরুদ্ধে। শৈশবে দেখা দুধ বিক্রেতা নয়, এখন তার ভয়ে তটস্থ থাকে শীর্ষস্থানীয় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো।

আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে কাজ করে পরিচিতি পেয়েছেন আইন, আদালত, প্রশাসন ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে। সাধারণ মানুষের কাছেও তার পরিচিতি রয়েছে। চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। বর্তমান মেয়রের সময়ে পেয়েছেন শুদ্ধাচার পুরস্কার। নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য লিখেছেন একটি বই ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা’। এটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছেন তিনি।

নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক হয়ে ওঠার গল্প শুনতে কামরুল হাসানের মুখোমুখি হয় দেশ রূপান্তর। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানান, তার বন্ধুর পথের যাত্রার নানা কথা। এখন তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-২-এর স্বাস্থ্য পরিদর্শক। সংস্থার ফুড ও স্যানিটেশন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। তিনি দুই ছেলের বাবা। তার স্ত্রী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য পরিদর্শক।

কামরুল হাসান বলেন, ‘সংসারের টানাপড়েনে এসএসসি পাস করেই চাকরি নিতে হয়েছে। চাকরি করলেও লেখাপড়ার তাড়না ছিল। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে প্রথমে ইন্টারমিডিয়েট এবং পরে ডিপ্লোমা-ইন মেডিকেল টেকনোলজি অর্থাৎ স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ অর্জন করি। তিন বছর মেয়াদি এ কোর্স সম্পন্নের পর ২০০১ সালে আমাকে স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেয় কর্তৃপক্ষ।’

শুরুর দিকে ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে সিটি করপোরেশনের কারওয়ান বাজার অঞ্চলে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সময়টা ছিল ভেজালবিরোধী অভিযানের সরব সময়। তখন ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উদ-দৌলাসহ চারজন ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকায় ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতেন। সেসব অভিযানে নিয়মিত থাকতাম। তখন ঢাকায় ভেজালের মহোৎসব চলছিল। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের কাজ কীভাবে করতে হয় তখনই হাতেকলমে শিখেছি। ওই সময়ের স্যাররা খুবই সৎ ছিলেন, তাদের কাছ থেকে আমরা উত্তম শিক্ষা পেয়েছি। তারা খুব সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতার ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘কারওয়ান বাজার এলাকার দায়িত্বে থাকার সময় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ঢুকে একবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি আমরা। সেখানে ঢোকামাত্র সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে খবর পৌঁছে যায়। আমার ঊর্ধ্বতনদের কাছে ফোন আসে, আমাদের চলে আসতে হয়। খুব মন খারাপ হয়েছিল। মনে হয়েছিল ভালো কাজে এত কেন বাধা! পরে স্যাররা বুঝিয়েছিলেন, ওই এলাকার জন্য স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ রয়েছে। এভাবে অনেক কিছু শিখেছি। এখন ওই স্মৃতি মনে পড়লে হাসি পায়। তখন এমন বোধ ছিল যে, ম্যাজিস্ট্রেট স্যারদের কেউ বাধা দিতে পারে না।’

ভেজালবিরোধী অভিযানের বিষয়ে কামরুল হাসান বলেন, ‘স্বাস্থ্য পরিদর্শক হওয়ার পর প্রায়ই ভেজালবিরোধী মোবাইল কোর্টে যেতাম। তখন ভেজাল ও নিরাপদ খাবারের বিষয়ে আমার বাস্তব ধারণা জন্মায়। আমার পরম সৌভাগ্য, এখন পর্যন্ত যত মামলার প্রস্তাব করেছি, কোনো কর্মকর্তা সেসবের বিষয়ে অসম্মতি জানাননি।’

তিনি বলেন, ‘ভেজালবিরোধী কার্যক্রমের মামলা পরিচালনা করে বুঝতে পেরেছি সততার সঙ্গে কাজ করলে বাধা টপকানো যায়। নিম্ন আদালত, উচ্চ আদালত, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, মন্ত্রীরাও বিভিন্ন সময়ে আমাকে ডেকেছেন। সততার সঙ্গে কাজ করলে কোথাও আটকাতে হয় না। তবে সাময়িক পেরেশানি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পরিদর্শককে সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে গেলে যদি কোনো অনিয়ম দেখা যায় তাহলে মামলা করার আগে ভেজাল খাবারের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে বোঝাতে হবে। সময় নিয়ে বোঝাতে হবে।’

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা কেমন জানতে চাইলে কামরুল হাসান বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের কিছু ভুল আছে। পরিদর্শকরা ভেজাল খাবারের বিষয়ে মামলা করলে ব্যবসায়ীরা নিম্ন আদালতে সঠিক বিচার পাবে না বলে মামলা উচ্চ আদালতে নিয়ে যায়। বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলায়। মামলায় হয়তো তাদের ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা হতো। অথচ তারা উচ্চ আদালতে মামলা ঝুলিয়ে রাখছে। সেখানে লাখ লাখ টাকা খরচ করছে কিন্তু দোষ স্বীকার করছে না। এটা খুবই দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, অনেক মামলা ৫ বছর, ১০ বছর ধরে চলমান রয়েছে। ২০০৮, ’০৯, ’১০ সালের মামলাও উচ্চ আদালতে চলছে।

এ নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক বলেন, ‘২০১১ সালে “শক্তি দই”য়ে ভেজাল পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিরাপদ খাদ্য আদালতে হাজিরা দেন। এরপর ওই মামলা উচ্চ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। ওই মামলা এখনো উচ্চ আদালতে চলছে।’

আরও অনেক মামলার প্রসঙ্গে বলেছেন কামরুল হাসান। কাজ করতে গিয়ে হতাশার কথাও বলেছেন। সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পরিদর্শকদের অনেক অসুবিধা। তাদের পদমর্যাদা কম। নমুনা সংগ্রহের টাকা কে দেবে তা নিয়ে তাদের ভাবতে হয়। ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আওতায়। কিন্তু তাদের জনবল নেই। বিভিন্ন সংস্থার জনবল দিয়ে কার্যক্রম চালানো হয়।’

তিনি বলেন, দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকারকে একত্রে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বিএসটিআই ইট, বালু, পাথর থেকে খাদ্যের মানও যাচাই করে। খাদ্যের বিষয়গুলো খাদ্য কর্তৃপক্ষের আওতায় দিলে ভালো হতে পারে।

কামরুল হাসান বলেন, ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শুধু ব্যবসার প্রসার করলে হবে না, নিরাপদ খাবারের বিষয়েও মনোযোগ দিতে হবে।

সহকর্মী পরিদর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সরকার পরিদর্শকদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব দিয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সরকারের কর্মী হিসেবে কাজ করলেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এজন্য মানুষ হিসেবে কাজ করতে হবে। একজন পরিদর্শকের চোখের দেখা ও মনের ভাবনা এক হতে হবে। ভয় পেলে চলবে না, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করে যেতে হবে।’

তার সম্পর্কে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেন কামরুল হাসান। খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তারা অভিযোগ করেন। কর্তৃপক্ষ তার কাজের পক্ষে সবসময় অবস্থান নেন। পরে যাচাই করেও দেখেন। কখনো বিচ্যুতি পাওয়া যায় না। কামরুল হাসানকে নিয়ে সত্যিই গর্ব করা যায়।’