সেয়ানে সেয়ানে টক্কর শেষে হাসি অজিদের

বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের উইকেট ভালোবাসে ব্যাটারদের পাশে থাকতে। গতকাল শুক্রবার অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান ম্যাচেও হলো তাই। অস্ট্রেলিয়ার স্বমহিমায় ফেরা নাকি পাকিস্তানের নতুন শুরু এমন সমীকরণের সমাধান হলো রেকর্ড বইয়ের পাতায় কিছু নতুন পৃষ্ঠা জুড়ে। তবে শেষ হাসি হাসলেন অজি ক্রিকেটাররা। শ্রীলঙ্কার পর পাকিস্তানও পারল না পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের রুখতে। বাবর আজমদের ৬২ রানে হারিয়ে দিয়েছে প্যাট কামিন্স বাহিনী।

টসজয়ী বাবর আজমের আমন্ত্রণে গতকাল প্রথমে ব্যাটিংয়ে নামে অস্ট্রেলিয়া। ডেভিড ওয়ার্নার ও মিচেল মার্শের বিধ্বংসী দুই সেঞ্চুরির পরও দলীয় সংগ্রহটা খুব বেশি বড় করতে পারেনি অজিরা। শাহিন শাহ আফ্রিদির ৫ উইকেট শিকারের দিনে ৯ উইকেট হারিয়ে তারা সংগ্রহ করে ৩৬৭ রান। জবাবে ১৩৪ রানের উদ্বোধনী জুটির পরও পাকিস্তানের ইনিংস থামে ৩০৫ রানে।

ম্যাচ শেষে স্বস্তি প্রকাশ করে অজি অধিনায়ক কামিন্স বলেন, ‘খুব ভালো লাগছে। কঠিন পরিস্থিতি ছিল, জিততে পেরে আমরা খুব খুশি।’ আর ক্যাচ মিসে হতাশ পাকিস্তান অধিনায়ক বাবর আজম বলেন, ‘মাঝের দিকে জুটিগুলো আরও বড় হলে ফল অন্যরকম হতে পারত। আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে।’

প্রথম দুই ম্যাচে নিদারুণ হার। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে জয়ের পথে ফেরা। এবার পাকিস্তানের বোলারদের কড়া শাসনে রেখে গতকাল উদ্বোধনী জুটির রেকর্ড করে বসেন ওয়ার্নার ও মার্শ। তাদের ২৫৯ রানের জুটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটি। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটির রেকর্ডটি উপুল থারাঙ্গা ও তিলকারতেœ দিলশানের। ২০১১ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৮২ রানের জুটি গড়েন তারা।

ওয়ার্নার-মার্শের ২৫৯ রানের জুটি হয়তো হতোই না। যদি পঞ্চম ওভারে ওয়ার্নারের ক্যাচটি তালুবন্দি করতে পারতেন উসামা মির। ক্যাচ মিসের আক্ষেপ বাড়িয়ে দিয়ে এ দুই ব্যাটসম্যানই তুলে নেন সেঞ্চুরি। রানখরায় থাকা অজি টপ অর্ডারের সব দুশ্চিন্তা নিরসন করেন ওয়ার্নার ও মার্শ। ৩১তম ওভারে ৮৫ বল খেলে বিশ্বকাপে নিজের পঞ্চম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ওয়ার্নার। আর পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি টানা চতুর্থ সেঞ্চুরি ওয়ার্নারের। তার পরের বলেই নিজেকে জন্মদিনের উপহার দেন মিচেল মার্শ। তবে সেটা লিটন দাসের মতো ডাক মেরে নয়। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি উদযাপন করে। ওয়ানডেতে এটি তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। ইনিংস শেষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এভাবে, ‘অসাধারণ জন্মদিন। উপহার হিসেবে সেঞ্চুরি পাওয়াটা দারুণ।’

সেঞ্চুরির সুবাদে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি করা অজি অধিনায়ক রিকি পন্টিংকে ছোঁন ওয়ার্নার। দুজনেরই পাঁচটি করে সেঞ্চুরি। বিশ্বকাপে তৃতীয় সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি করা ব্যাটারদের তালিকায় কুমার সাঙ্গাকারার সঙ্গে অবস্থান এ দুই অজির। সাতটি সেঞ্চুরি নিয়ে এ তালিকার শীর্ষে রোহিত শর্মা।

পাকিস্তানের ফিল্ডারদের ক্যাচ ফসকানোর সুযোগ নিয়ে তাদের বোলারদের তুলোধুনো করতে থাকেন দুই অজি ওপেনার। এ সময় ৩৪তম ওভারে দৃশ্যপটে হাজির হন শাহিন শাহ আফ্রিদি। সাড়ে সাতের ওপর রানরেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর তখন বিনা উইকেটে ২৫৯। ওভারের শেষ দুই বলে জোড়া আঘাত হানেন আফ্রিদি। ফেরান মার্শ ও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে। মার্শ ফেরার আগে ১০৮ বলে ১২১ রান করেন। ১০টি চার ও ৯টি ছক্কা মারেন তিনি। প্রথম বলেই ফিরে গিয়ে ম্যাক্সওয়েল স্কোরারদের বিরক্ত করেননি। বাবর আজমের ক্যাচ মিসে একবার জীবন পেয়েও স্টিভেন স্মিথ তা কাজে লাগাতে পারেননি। দ্রুত ফিরে যান ৭ রান করে। চতুর্থ উইকেটে মার্কাস স্টয়নিসের সঙ্গে ৪১ রানের জুটি গড়ার পথে সপ্তমবারের মতো ওয়ানডেতে দেড়শ রান পূর্ণ করেন ম্যাচসেরা ওয়ার্নার। তার চোখ-ধাঁধানো দাপুটে ইনিংসটি থামে হারিস রউফের বলে ১৬৩ রান করে। ১২৪ বলে ১৪টি চার ও ৯টি ছক্কায় সাজানো ছিল ইনিংসটি। অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ততক্ষণে ৩২৫ রান।

এরপরই মড়ক লাগে অজি ইনিংসে। আসা-যাওয়ার স্রোতে ভেসে যায় তারা। শেষ ৪৬ বলে মাত্র ৪২ রান তুলতেই হারায় ৬ উইকেট। শাহিন শাহ আফ্রিদি ক্যারিয়ারের তৃতীয় ও বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো ৫ উইকেট শিকারের কীর্তি গড়েন। হারিস রউফ নেন ৩ উইকেট।

এই কদিন আগেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান তাড়া করার নতুন রেকর্ড গড়ে পাকিস্তান। শ্রীলঙ্কার দেওয়া ৩৪৫ রানের লক্ষ্যে ৬ উইকেট হাতে রেখেই পৌঁছে যায় তারা। মোহাম্মদ রিজওয়ানের অপরাজিত ১৩১ ও আবদুল্লাহ শফিকের ১১৩ রান ছিল সেই লক্ষ্য তাড়া করার ভিত।

ম্যাচ জয়ের জন্য নিজেদের গড়া রেকর্ডই ভাঙতে হবে এমন সমীকরণের সামনে শুরুটা দারুণ করে পাকিস্তান। অজিদের শতরানের উদ্বোধনী জুটির জবাবে ইমাম-উল-হক আর আবদুল্লাহ শফিকও চোখে চোখ রেখে জবাব দেন। ১৭তম ওভারে এ জুটি পৌঁছে শতরানের মাইলফলকে। তবে ১২তম ওভারে শফিকের ক্যাচ শন অ্যাবটের হাত ফসকে ছক্কা না হলে ৬৬ রানেই থেমে যেত পারত এ জুটি। পাকিস্তানের বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটি গড়েন দুজন। ১৩৪ রানে এ জুটি ভেঙে অজিদের ত্রাতা বনে যান স্টয়নিস। ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচে পরিণত হয়ে ফিরে যাওয়ার আগে ৬১ বলে ৭ চার ও ২ ছয়ে ৬৪ রানের ইনিংস খেলেন শফিক। নিজের পরের ওভারেই শিকার বানান ইমামকে। ১০ চারে ৭১ বলে ৭০ রানের ইনিংস খেলে সাজঘরে ফেরেন তিনি।

এরপর সৌদ শাকিলকে নিয়ে পঞ্চাশোর্ধ জুটি গড়ে ভালোভাবেই সামনে এগোচ্ছিলেন রিজওয়ান। ৫৭ রানের জুটি ভাঙেন কামিন্স। এরপর অ্যাডাম জাম্পা তার স্পিন ঘূর্ণিতে ইফতিখার (২৬) আর রিজওয়ানকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে পাকিস্তানকে খেলা থেকেই ছিটকে ফেলে দেন। রিজওয়ান ফেরেন ৪০ বলে ৪৬ রানে। এরপর শেষ উইকেটগুলো তুলতে আর বেগ পেতে হয়নি অজি বোলারদের। ২৭ বল বাকি থাকতেই ৩০৫ রানে পাকিস্তানকে গুটিয়ে দেয় তারা। জাম্পা ৪, স্টয়নিস ও কামিন্স ২টি করে উইকেট নেন।

প্রথম দুই ম্যাচে হারের পর টানা দুই জয়ে পাকিস্তানকে পাঁচে ঠেলে দিয়ে টেবিলের চারে উঠে এলো অস্ট্রেলিয়া।