ঘোষিত দরের চেয়ে আড়াই শতাংশ বেশি দামে প্রবাসীদের কাছ থেকে ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এবং বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ অথরাইজড ডিলার অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা); অর্থাৎ ব্যাংকগুলো চাইলে সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি আরও আড়াই শতাংশ বেশি দামে ডলার কিনতে পারবে প্রবাসীদের কাছ থেকে। কিন্তু নির্ধারিত দামের বেশি দরে বিক্রি করতে পারবে না। ফলে কোনো ব্যাংক চাইলে অতিরিক্ত দামে ডলার কিনলেও লোকসান দিয়ে তা বিক্রি করতে হবে।
নতুন এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাংকগুলো আজ রবিবার থেকে প্রতি ডলারে ১১০ টাকার সঙ্গে আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দিতে পারবে। যদিও ডলার বিক্রির দর ১১০ টাকা ৫০ পয়সা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় গত শুক্রবার ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকের সংগঠন বাফেদার যৌথ সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল শনিবার এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে ব্যাংকগুলোতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ডলার কেনার সর্বোচ্চ দরের চেয়ে বিক্রির দর কম হওয়ার নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে এর মাধ্যমে ডলার বিক্রির আসল দর আড়াল করে আমদানিকারকদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়া বৈধতা পাবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
হু হু করে বাড়তে থাকায় গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ডলারের দর ঠিক করছে ব্যাংকগুলো। কখনোই কেনার চেয়ে বিক্রির দর কম ছিল না। এবারই প্রথম কেনার চেয়ে বিক্রির দর কম দেখানোর সুযোগ দেওয়া হলো।
বর্তমানে প্রবাসীদের আয়ে ব্যাংকে ১ মার্কিন ডলারের দাম ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। এর ওপর সরকার ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়। তাতে ১ ডলারে পাওয়া যেত ১১৩ টাকা ২৬ পয়সার কিছু বেশি।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেমিট্যান্স হাউজগুলো থেকে বেশি দামে প্রবাসী আয় কিনতে হচ্ছে। নির্ধারিত দামে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ডলার সংকট কাটাতে এমন সিদ্ধান্ত। তাদের ধারণা নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে ‘আগ্রহী হবেন’।
তবে তারা বলছেন, এটা আরও বাড়াতে হবে। তা না হলে হুন্ডি কারবারিদের সঙ্গে পারাটা মুশকিল হয়ে যাবে। তাদের মতে, বাজারের ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দেওয়াটাই হবে ‘যৌক্তিক সিদ্ধান্ত’।
বেশ কিছুদিন ধরেই ডলার-সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো বাফেদা ও এবিবির বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে পাঁচ-ছয় টাকা বেশি দামে প্রবাসী আয় কিনছে। ফলে প্রবাসী আয়ে ডলারের দাম বেড়ে হয়েছে ১১৫-১১৬ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শেই ব্যাংকগুলো ডলারের এই দাম দিচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনে প্রবাসী আয় এসেছে ৭৮ কোটি ১২ লাখ ডলার। গত বছরের অক্টোবরের প্রথম ১১ দিনে প্রবাসী আয় এসেছিল ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। চলতি মাসে প্রবাসী আয় আসার যে ধারা, তা অব্যাহত থাকলে মাস শেষে তা ১৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গত ৪১ মাসের মধ্যে বৈধ পথে সর্বনিম্ন প্রবাসী আয় দেশে এসেছে গত মাসে। সেপ্টেম্বরে বৈধ পথে দেশে প্রবাসী আয় আসে ১৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। এর আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে এত কম প্রবাসী আয় দেশে এসেছিল। ওই মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ১০৯ কোটি ডলার।
এক বছরের বেশি সময় ধরে ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছে। তাতে ডলারের আনুষ্ঠানিক দাম ৮৫ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে কিছু ক্ষেত্রে ১১১ টাকা পেরিয়েছে। আর খোলা বাজারে তা ছাড়িয়েছিল ১২০ টাকা। প্রয়োজনের সময় ডলার কিনতে হিমশিম খেতে হয়।
ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও। এমন পরিস্থিতিতে ডলারের বাজারে করণীয় নির্ধারণে শুক্রবার রাতে এবিবি ও বাফেদা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় বসে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুদ প্রতিনিয়ত কমছে। এবার এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১১ কোটি ডলার। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ কমে ২১ বিলিয়ন বা ২ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে নেমে গেছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আফজাল করিম বলেন, ‘বৈঠকে ডলার বাজারের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যাংক নিজস্ব আয় থেকে প্রবাসীদের ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা দেবে। এটা আবার আমদানিকারকদের থেকে নিতে পারবে না। দেখা গেছে লেনদেনে ভারসাম্য অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে; অর্থাৎ আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান কমে আসতে শুরু করেছে। এবিবি ও বাফেদা ডলার বাজার পর্যবেক্ষণ করে দু-এক দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাবে। ডলারের বাজার দর দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এবিবি চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ‘বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেন ঘাটতি কমিয়ে আনতেই সরকারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোও প্রবাসীদের প্রণোদনা দেবে। এ ছাড়া আমরা বাজার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। জনমানুষের সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক আয় বৈধ উপায়ে দেশে আনার লক্ষ্যেই এই প্রণোদনা।’
২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় পাঠানোর পরিমাণ বেড়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১৮.২০ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৮২০ কোটি মার্কিন ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ২৪.৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী, গত বুধবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৯৬ কোটি ডলার। এর এক সপ্তাহ আগে, অর্থাৎ ১১ অক্টোবর ছিল ২ হাজার ১০৭ কোটি ডলার। ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি বা ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। গত বছরের ১৮ অক্টোবর সেই রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬১১ কোটি ২৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। গত বুধবার তা ২ হাজার ৬৬৮ কোটি ডলারে নেমেছে।
এর বাইরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট বা প্রকৃত রিজার্ভের আরেকটি হিসাব রয়েছে, যা শুধু আইএমএফকে দেওয়া হয়। সেই হিসাব প্রকাশ করা হয় না। আইএমএফ সূত্রে জানা গেছে, সেই হিসাবে দেশের প্রকৃত রিজার্ভ এখন ১ হাজার ৭০০ কোটি বা ১৭ বিলিয়ন ডলারের কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এখন যে রিজার্ভ আছে, তা দিয়ে তিন মাসের আমদানি খরচ মেটানো যাবে। সাধারণত একটি দেশের কাছে ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমান রিজার্ভ থাকতে হয়।
বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি শর্তের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরে প্রকৃত রিজার্ভ ২ হাজার ৬৮০ কোটি বা ২৬ দশমিক ৮০ বিলয়ন ডলারে থাকতে হবে।
বাংলাদেশ অবশ্য আইএমএফকে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ রাখা সম্ভব হবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফ শর্ত শিথিল করেছে। নতুন লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকৃত (নিট) রিজার্ভ রাখতে হবে ১ হাজার ৮০০ কোটি এবং আগামী জুনে তা ২ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করতে হবে।