রাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অছাত্র-ড্রপআউট

অর্ধযুগ পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী এক বছরের জন্য এই শাখায় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ‘ড্রপআউট’ শিক্ষার্থী আসাদুল্লা-হিল-গালিব দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়াও ৩৯ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে বিতর্কিত নেতারা জায়গা পেয়েছেন সবার উপরে।

শনিবার (২১ অক্টোবর) রাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, সাদ্দাম-ইনানের নেতৃত্বকে একটু অন্যরকম ভেবেছিলাম। কিন্তু তারা সেই প্রত্যাশা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

এর আগে গত মাসের ১৮ তারিখে শাখা ছাত্রলীগের ২৬তম বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর একমাসেরও বেশি সময় পর শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা হয় গত রাতে। এতো দীর্ঘ সময় পর কমিটি হওয়া নিয়ে সকলের ধারণা ছিল যাচাই-বাছাই চলছে যাতে কোনও বিতর্কিত নেতা না আসে। কিন্তু এই ধারণার ‘গুড়ে বালি’ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিব গত কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ২০১৪-১৫ সেশনে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রথম বর্ষে কৃতকার্য হয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠলেও গালিব দ্বিতীয় বর্ষ আর টপকাতে পারেননি। একাডেমিক জটিলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ড্রপ-আউট হন গালিব। ছাত্রত্ব দেখাতে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাসের ‘ভুয়া’ সনদ দেখিয়ে রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন। গত বছর (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ) তিনি ভর্তি হন এই সান্ধ্য কোর্সে। এছাড়াও অভিযোগ আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়ে অবৈধভাবে হলে থাকছেন তিনি।

আর এদিকে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন গত কমিটির গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবু। ক্যাম্পাসে গুঞ্জন ছিল তিনি এই কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য সিভি তুলেছিলেন। এমনকি একাধিক গণমাধ্যমে নিউজও হয়েছে তিনি সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তবে হয়েছেন সভাপতি।

বাবু গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৮ সালে অনার্স এবং পরের বছর মাস্টার্স শেষ করেন। দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও কমিটি হওয়ার গুঞ্জন উঠলে তিনি ফিরে আসেন। ফিরে এসেই ছাত্রত্ব ধরে রাখতে ভর্তি হন বিশ^বিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইংলিশ অ্যান্ড আদার ল্যাংগুয়েজের শর্ট কোর্সে ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রলীগ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিন থেকে রাজনীতি করে আসছি। এতো দিন রাজনীতি করে আসার ফলসরূপ আমরা এই পেলাম। একজন ইন্টার পাশ শিক্ষার্থী যে কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিই পার করতে পারেনি তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন পত্রিকায় নিউজ দেখেছি যে, নেতা নকল সনদ ব্যবহার করে সান্ধ্য কোর্সে ভর্তি হয়েছে। তারপরও তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিতে হবে। সাদ্দাম-ইনানের কাছে এটা প্রত্যাশা করিনি। এখন দেখছি ‘যেই লাউ সেই কদু’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কোনও অছাত্র, ড্রপআউট, ইন্টার পাশ নেতৃত্বের পেছনে রাজনীতি করবো না। এই কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম। এদিকে ছাত্রলীগের এই কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে দলীয় টেন্টে অবস্থান নিয়েছে শাখা ছাত্রলীগের একাংশ।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান দেশ রূপান্তরকে বলেন, 'সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় বা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমাদেরকে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হয়েছে। তবে তারপরও যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে থাকে সেটি আমরা খতিয়ে দেখবো।'

এই কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সবাইকে আহ্বান জানাবো যে, সংগঠনের সবাই সমানভাবে তো মূল্যায়ন করার সুযোগ থাকে না। তবে একটি আদর্শকে নিয়েই সবাইকে চলতে হবে। এই মানসিকতাই সবার ধারণ করা উচিৎ।

এর আগে গত বছরের ২৩ অক্টোবর বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাবি শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির জন্য জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। প্রায় সপ্তাহ না যেতেই আরেক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১২ নভেম্বর সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় কমিটি। ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ছিল পদ প্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার শেষ সময়। শীর্ষ দুই পদের জন্য ৯৪ জন প্রার্থী জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন। যার মধ্যে সভাপতি পদে ২২ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ৭২ জন সিভি জমা দেন। এর আগে ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বরের ২৫তম সম্মেলনের মাধ্যমে শাখা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে গোলাম কিবরিয়া সভাপতি ও ফয়সাল আহমেদ রুনু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।