রোহিতরা খেলছে তাই অষ্টমীতেও সুনসান কলকাতা

ভারতীয়দের কাছে ক্রিকেট শুধুই একটা খেলা নয়, ক্রিকেট একটা আবেগ। এই ক্রিকেটে মজে আছে বলেই দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনেও কলকাতার পাড়া-মহল্লার প্যান্ডেলগুলোতে দেখা গেল না প্রত্যাশিত ভিড়। আঙিনার বিশ্বকাপের রঙে যেন ফিকে হয়ে গেছে দুর্গোৎসবও। নিউ টাউন থেকে ওল্ড টাউনে ছুটতে ছুটতে যেতে যেতে ২২ বছরের ট্যাক্সি ড্রাইভার প্রদীপ যাদবের কণ্ঠে বিস্ময়, ‘এতদিন ধরে ট্যাক্সি চালাচ্ছি। এরকম ফাঁকা অষ্টমীর দিন দেখিনি কখনো!’

এই বাংলায় রবিবার এমনিতেই সাপ্তাহিক ছুটি। আর শনি-রবি দুদিন পথঘাটও থাকে ফাঁকা। তবে এই রবিবার যেহেতু অষ্টমী, এ দিনটিতে ট্যাক্সি ড্রাইভারদের শঙ্কা ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা কলকাতার পথে পথে যানজটে আটকে থাকার। সেটা না হয়ে বরং হয়েছে উল্টো! নিজের মনেই কারণ খুঁজতে খুঁজতে বেদিশা প্রদীপ বলে উঠলেন, ‘অষ্টমী আর নবমীর দুদিনে কলকাতার চিরচেনা দৃশ্যটা হারিয়ে গেছে। এ সময়টায় ট্যাক্সি নিয়ে বের হওয়াই ঝক্কি। তবে পেটের দায়ে বের হতে হয়। কারণ যানজট থাকলেও মানুষ খুশি হয়ে টিপস বেশি দেয় এই দিনগুলোতে। ট্রিপও থাকে বেশি। আজ সেটা নেই, ট্রিপও বেশি পাচ্ছি না।’ আসল রহস্যটা খানিকক্ষণ পর নিজেই ভেদ করলেন বাবার কিনে দেওয়া ট্যাক্সি দিয়ে সংসার চালানো ঝাড়খন্ডের এ তরুণ। তার কথা থেকেই বোঝা গেল, আঙিনার বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই এমন সুনসান দিনগুলো ফিরে ফিরে আসছে মাঝেমধ্যেই। অষ্টমীতে কলকাতা জুড়ে শত শত প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো ছেলে-ছোকরাদের দৃষ্টি যে বোকা বাক্সে আটকে আছে। রবিবার বিকেলে দূরের ধর্মশালায় স্বাগতিক ভারত খেলছিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। যে প্রান্তেই হোক, রোহিত বাহিনী মাঠে মানেই তাদের ব্যাট-বলে বুঁদ পুরো ভারত। এটা শুধু এ সময়ের পূজার শহর কলকাতায় নয়, দেশটির প্রতিটি শহরেই টিম ইন্ডিয়া মাঠে তো, সারা দেশ ক্রিকেটে মজে যাওয়া।

অষ্টমীর ভীষণ বিরক্তিকর যানজটের শঙ্কা নিয়ে নিউ টাউন থেকে ওল্ড টাউনের নিউ মার্কেট এলাকায় যাওয়ার কারণ মোবাইল সিম কিনে দ্রুত স্বাভাবিক দুনিয়ায় (পড়–ন ইন্টারনেটের মায়াজালে বন্দি হওয়া) ফেরা। সাংবাদিকতা পেশার ধরন বদলেছে। টাইপ রাইটার, নিউজপ্রিন্টে হাতে লিখে ফ্যাক্স মেশিনের দোকান খুঁজে হয়রান হওয়ার দিন শেষ। প্রযুক্তির বৃত্তে আটকে যেতে যেতে সাংবাদিকতা ল্যাপটপ থেকে ঠেকেছে মোবাইল ফোনে। ইয়া বড় ক্যামেরা চাপিয়ে ঘাড় ব্যথা করা নয় বরং পকেটে পুরে রাখা মোবাইল ফোনেই হয়ে যাচ্ছে যাবতীয় সবকিছু। তবে মোবাইল ফোনটা চালাতে চাই নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ। সেটা থাকলেই পৃথিবী আপনার হাতের মুঠোয়। উড়োজাহাজে উড়ে এসে, নিউ টাউনে কোনোমতে হোটেল চেক-ইন করেই পড়িমরি বের হতে হলো সেই পরম আরাধ্য ইন্টারনেটের দেখা পেতে। আর বের হয়েই এক অন্যরকম কলকাতার দেখা মিলল।

আলিমউদ্দিন স্ট্রিট কেবল নামেই। এটাকে পুরান ঢাকার কোনো সরু গলি বললেও ভুল হবে না। সেই গলিটাই সোজা গিয়ে পড়েছে রাফি আহমেদ খিদওয়াই রোডে। যে রোডের বুক চিরে এখনো সগৌরবে চলছে ট্রাম্প। আর শামুকগতির একখানা ট্রাম্পের আসা-যাওয়া মানেই দুপাশের রাস্তায় লেগে যাবে তীব্র যানজট। তবে কাল বিকেলে সেই রাফি আহমেদ খিদওয়াই রোডটাও বেশ ফাঁকা। আমাদের ট্যাক্সি আলিমউদ্দিন স্ট্রিটের দুপাশের সারি করে রাখা মোটরসাইকেল, ভাঙাচোরা গাড়ি আর গরুর মাংসের দোকানগুলো পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে পরিষ্কার হলো কলকাতার রূপবদলের কারণ। গলির পাশের দোকানগুলোতে রাখা টিভির স্ক্রিনে চলছে খেলা। মানুষ তার সামনে ভিড় করে দেখছে মোহাম্মদ সামির বোলিং কীর্তি। খিদওয়াই রোডে গিয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ভাড়া চুকিয়ে নেমেই ছুটতে হলো মারকুইজ স্ট্রিট দিয়ে। মহাব্যস্ত এই পথটা নিউ মার্কেটের অনেকগুলো প্রবেশ পথের একটি। এর শুরুর দিকে সারি সারি খাবারের দোকান। এরপরেই হোটেল, মানি এক্সচেঞ্জ, ওষুধের দোকানপাটে সয়লাব। কিছুদূর এগোলে আছে বিশাল কটন গ্যালারি। এই স্ট্রিটটা বাংলাদেশের মানুষের ভীষণ চেনা; প্রিয়ও বটে। এ দেশ থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি কলকাতায় আসে কেনাকাটা এবং চিকিৎসার জন্য। কেনাকাটা করতে আসাদের মূল লক্ষ্য থাকে মারকুইজ স্ট্রিটের হোটেলগুলো। তাই পথটায় সারা বছর বাংলাদেশি মানুষের আনাগোনায় হাঁটা দায়। তবে রবিবার এই পথটাতেও বিস্ময়কর নীরবতা। মাঠে খেলছে ভারত আর নিউজিল্যান্ড। দুটি দেশের সঙ্গেই খেলা এবং হারা সারা সাকিব-শান্তদের। তো এদের খেলা নিয়ে বাংলাদেশিদের আগ্রহ থাকার কথা নয়। তবে তাদের জন্য যারা সেখানে ব্যবসা জাঁকিয়ে বসেছে, তারা সব ভারতীয় এবং অবশ্যই ক্রিকেট নিয়ে তাদের মধ্যে আছে বাড়াবাড়ি রকমের উন্মাদনা। মধ্যবয়স্ক সিম বিক্রেতার কাছ থেকে জানা গেল ভারতের খেলার দিনে ব্যবসায় মন্দাভাবটা মেনে নিয়েছেন তারা, ‘রোহিত-কোহলিরা খেললে, সেদিন ব্যবসা নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা থাকে না আমাদের। দেখবেন অনেক দোকান আজ বন্ধ। অথচ দুর্গাপূজাতে নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় দোকান বন্ধ রাখার কথা কল্পনাতেও আসে না কারও। ক্রিকেটের জন্য ব্যবসার ক্ষতিও মানতে রাজি অনেকে।’

তাই বলে ব্যতিক্রম যে নেই, তা কিন্তু নয়। ক্রিকেটে সামগ্রিক মুগ্ধতার মধ্যেও কলকাতার একশ্রেণির মানুষের কাছে বেঁচে থাকার চাহিদা মেটানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পূজার শেষভাগে প্রিয় স্ত্রী-সন্তানের জন্য নতুন পোশাক কেনাটাই তাদের কাছে ক্রিকেটের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ব্রিটিশ সাহেব স্যার স্টুয়ার্ট হগের নামে গড়ে ওঠা বিশাল হগ মার্কেট রবিবার বন্ধ থাকলেও তার আশপাশের পথগুলোতে বাহারি দোকান খুলে ব্যস্ত ভ্রাম্যমাণ হকাররা। সেই দোকানগুলোকে ঘিরে প্রচ- ভিড়। কলকাতার নিম্নশ্রেণির মানুষজন অষ্টমীর সন্ধ্যায় ব্যস্ত প্রিয়জনের জন্য শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায়। ষষ্ঠী থেকে অষ্টমী না হোক। একটা নতুন পোশাক পরে তো প্রতিমাকে বিসর্জনটা দিতে পারবে ছেলেটা। আমাদের দেশে ঈদের আগে চাঁদরাতে যেমনটা হয় আর কি। ব্যস্ত এক হকারকে ক্রিকেট নিয়ে প্রশ্ন করতেই যেন বিরক্ত হলেন, ‘দাদা, এখন কি ওসব নিয়ে ভাবলে চলবে। আজ অষ্টমী। দেখছেন তো কত মানুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত। আমরাও শেষমুহূর্তে বিক্রি নিয়ে ব্যস্ত আছি। আমাদের কাছে এ মুহূর্তে বেচাকেনাই মুখ্য, ক্রিকেটসহ যাবতীয় সব কিছু গৌণ। সেটা ভারত খেলুক কিংবা জিতুক।’

নিউ মার্কেটের ভিড় ছাড়িয়ে সন্ধ্যায় ট্যাক্সিতে চড়ে হোটেলে ফিরতে ফিরতে চোখে পড়ল অগুনতি প্যান্ডেল (পূজাম-প)। প্রতিটি প্যান্ডেলের মাইকে একনাগাড়ে বেজে চলছে ঢাকের কাঠির শব্দ। বলিউডি গানগুলোই রিলে করে চলছে সমান্তরালে। তবে তাতে নেই প্রতিমাকে ঘিরে চিরচেনা ভিড়। সবাই যে তখন বুঁদ হয়ে আছে রোহিত-কোহলিদের ব্যাটে। নিউজিল্যান্ডকে হারালেই যে হবে পাঁচে-পাঁচ। তাতে আঙিনার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালটাও নিশ্চিত হয়ে যাবে চার ম্যাচ হাতে রেখে। জয়টা হয়ে গেলে যে অষ্টমীর আনন্দটাও বেড়ে যাবে বহুগুণ।

একটা অষ্টমীর উৎসব কলকাতাবাসী কয়েক ঘণ্টা পরের জন্যই তুলে রেখেছে। অন্যরকম কলকাতা দেখছি আর ভাবছি, আহা, সাকিবদের বিধ্বংসী ক্রিকেটে এভাবে কবে যে বুঁদ হবে লাল-সবুজের বাংলাদেশ! এই জাতিটাও যে ক্রিকেট খেলাটাকে ভীষণ ভালোবাসে!