সামনের বিশ্বে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারাই হচ্ছে একটি বড় সম্ভাবনা এবং একই সঙ্গে সংকটের ক্ষেত্র। নতুন প্রযুক্তিতে উন্নত দেশসমূহ যেভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না উন্নয়নশীল বিশ্ব। প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই আগামী বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিশ্বব্যবস্থার সুবিধাও আদায় করা সম্ভব। এটাই হচ্ছে প্রযুক্তির নতুন ঔপনিবেশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এটা হয়তো আরও বেশি প্রযোজ্য। নতুন বিশ্বে প্রযুক্তির মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান এখন প্রায় বাস্তব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রযুক্তিবিশ্বে মূল আলোচনার বিষয়। শুধু প্রযুক্তিবিদরাই নন, রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এটি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রত্যেকটা আন্তর্জাতিক জোটকে প্রযুক্তি আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করতে দেখা গেছে। এবারের জি-৭ সম্মেলনে শেষে উন্নত দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন সম্পর্কিত একটি নীতিপদ্ধতি প্রস্তুত করার কথা বলছে যেটাকে তারা হিরোসিমা গাইডলাইন হিসেবে উল্লেখ করছে।
ইন্টারনেট এখন আর শুধু তথ্য ও প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এটি এখন সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা ও শাসন প্রক্রিয়ার অংশ। এই প্রক্রিয়ায় অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাপানের কিওটো শহরে ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ১৮তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল যেখানে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়। যার মধ্যে অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল ইন্টারনেট বা ডিজিটাল অধিকার, যেমনটা আলোচনার বিষয় এই সময়ের মানবাধিকার। মানবাধিকারের যে অনুষঙ্গগুলো আমাদের বাস্তব জগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একই ধরনের শর্ত প্রযোজ্য সাইবার স্পেসের ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে সাইবার স্পেসে অংশগ্রহণ ও সুযোগ, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার, যেকোনো ধরনের সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মৌলিক অধিকার অর্জনের পথ সুগম করা ইত্যাদি আরও কত কত বিষয়। আর এ বিষয়গুলোই ইন্টারনেট গভর্নেন্সের অন্তর্ভুক্ত। আমরা অনুমান করতে পারি যত দিন যাবে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি বিশেষ করে সাইবার প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাপন প্রক্রিয়ায় আরও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ভূমিকা পালন করবে এবং নিঃসন্দেহে তা মানুষের জীবনযাপনকে আরও বেশি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্য করে দেবে। তাই প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণে যেকোনো ধরনের বিভক্তি ও প্রতিবন্ধকতা অধিকারের স্বীকৃতি, সুরক্ষা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের অভিজ্ঞতায় শাসনব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রায়ই অনলাইন ব্যবস্থা প্রণয়নের কথা বলি। অনেক সময় প্রচলিত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে অনলাইন ব্যবস্থায় রূপান্তরে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। বর্তমান ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি সাইবার জগতে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।
অন্যদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি অবধারিতভাবে বিশ্বব্যাপী সমতা ও ন্যায্যতাকে বাড়াবে না। অধিকন্তু তা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যকার উন্নয়ন বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক ও ক্ষমতা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ অল্প কিছু কোম্পানির হাতে চলে যেতে পারে, যারা কি না শুধু মুনাফা অর্জনেই ক্ষান্ত না, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থাকেও নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। এখনই যদি এ সম্পর্কে বহুপক্ষীয় গাইডলাইন ও নীতিমালা তৈরি করা না যায় তাহলে তার ফলাফল ভোগ করতে হবে আরও অনেক বছর। এই অবস্থায় প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষ থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ করা দরকার যেমনটা দরকার একটি ভালো ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ২০২২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরও কিছু দেশ মিলে ‘ভবিষ্যতের ইন্টারনেট’ সম্পর্কিত একটি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোসহ প্রায় ৭০টি দেশ এই ঘোষণার সঙ্গে একমত পোষণ করে। এই ঘোষণাপত্র গ্রহণে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা অস্বাভাবিক না। অধিকন্তু এই ঘোষণায় ইন্টারনেটকে উন্মুক্ত, অবাধ, ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ, নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে তৈরির প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই ঘোষণায় অনলাইন ও ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে মানবাধিকারের সুরক্ষা ও স্বীকৃতির অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। ঘোষণায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ, প্রত্যেক নাগরিকের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নিশ্চয়তা, ইন্টারনেট ব্যবস্থার অখণ্ডতা এবং এসব ক্ষেত্রে অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের ৭৫তম বছরপূর্তি উপলক্ষে ২০২১ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে ‘সামিট ফর দ্য ফিউচার’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা যেখানে ডিজিটাল ব্যবস্থায় একটি বৈশ্বিক চুক্তির ওপর বিশ্ব নেতাদের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্বে সময়ের সবচেয়ে আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনেক সম্ভাবনার পাশাপাশি এর সমালোচনাও আছে। বড় প্রশ্ন হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বব্যাপী কোনো হেজিমনি তৈরি করছে কি না? বা প্রচলিত হেজিমনির পুনর্গঠন করছে কি না? অনেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্নটি জুড়ে দেন। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির মূল বিষয় হচ্ছে ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ এই পদ্ধতিতে ভাষাগত কাঠামোর আলোকে নতুন মডেল সৃষ্টি করে থাকে। ভাষা যে ক্ষমতা চর্চার হাতিয়ার তা ইতিমধ্যে আন্তোনিও গ্রামসিসহ অনেক সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই আশঙ্কা অনেক বেশি প্রবল যেখানে ইন্টারনেটের কনটেন্টসমূহ মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট ভাষায় এবং তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রতিনিধিত্ব করে। ইন্টারনেট যেমন একটি বিশ্বায়নের হাতিয়ার একই সঙ্গে একে স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করা যেতে পারে, যা হতে পারে স্থানীয় প্রযুক্তি ও নিজস্ব ভাষায় কনটেন্ট উন্নয়নের মাধ্যমে, এটাই হয়তো ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব অর্জন ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশ সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জাতীয় কৌশলপত্র (২০১৯-২৪) প্রণয়ন করে যার শিরোনাম উদ্ভাবনী বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই কৌশলপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে আটটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে সরকারি সেবা প্রদান, উৎপাদন খাত, কৃষি খাত, স্মার্ট মবিলিটি ও ট্রান্সপোর্ট খাত, শিক্ষা ও দক্ষতা, আর্থিক খাত ও বাণিজ্য, ও স্বাস্থ্য খাত ইত্যাদি। এ খাতসমূহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহ ও সুপারিশমালা চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কৌশল বাস্তবায়নের জন্য যে পথনির্দেশিকা নির্দেশ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও উন্নয়ন, তথ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি, নৈতিকতা, তথ্যের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত স্টার্ট-আপে অর্থায়ন ও সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত প্রযুক্তির শিল্পায়ন ইত্যাদি। এই কৌশল বাস্তবায়নে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে ব্যবহারকারী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক, সরকারি তথ্যে প্রবেশাধিকার সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত ঘাটতি, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, কানেক্টিভিটি, অটোমেশনের কারণে কাজ হারানো, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গোপনীয়তার ঘাটতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত আইনি নিরাপত্তা ও নৈতিক কাঠামো ইত্যাদি।
একটি অবাধ, গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণে এই সময়ে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির ভূমিকা অনেক। সেই অর্থে ইন্টারনেট এই সময়ের সমাজ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। তবে এর জন্য ইন্টারনেট পরিচালন কাঠামোর দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি যার জন্য ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনায় বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহ এবং এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারা ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা প্রদান ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার ওপর নাগরিকদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক। আর এই ধরনের অবস্থাই ইন্টারনেটের বৈচিত্র্যমুখী ব্যবহারে নাগরিকদের উৎসাহিত করবে, তা যেমন মানবিক সম্ভাবনা বিকাশের সঙ্গে জড়িত একই সঙ্গে তার অধিকারের সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও আদায়ের একটি যুগান্তকারী অবস্থাও বটে। অনেকেই ইন্টারনেটকে ব্যক্তির ওপর নজরদারি করার উপায় হিসেবে দেখে থাকেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নজরদারি হয়তো দরকার আছে, কিন্তু তা যেন যথাযথ আইনি কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে হয় এবং নজরদারি কর্র্তৃপক্ষ যেন তাদের ক্ষমতা ও ক্ষমতার প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন থাকে। তা না হলে ইন্টারনেট নাগরিকদের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি ও ব্যবহৃত হতে পারে, যা এর সমস্ত সম্ভাবনাটাই ধ্বংস করে দেবে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com