মাহমুদউল্লাহর ১১১

বিসর্জনের দিন বিশ্বকাপ স্বপ্নেরও বিসর্জন

গতকাল মঙ্গলবার ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গা উৎসবের শেষ দিন। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় উৎসবমুখরতা, শুরু হয় পরের বারের অপেক্ষা। সেদিনই আরব সাগরে বিসর্জন হলো ২০২৩ বিশ^কাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্নও। টানা ৪ হার, হারগুলোও বড় বড় ব্যবধানে। ভাগ্যচক্রে যদি পয়েন্ট সমানও হয়ে যায়, তখন রান-রেটে যে চতুর্থ হওয়ার লড়াইয়ে বাংলাদেশ পিছিয়েই থাকবে, সেটা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়। তাই মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে, যে স্টেডিয়ামে মহেন্দ্র সিং ধোনির ছক্কা জন্ম দিয়েছিল ক্রিকেটরূপকথার, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১৪৯ রানের হারে সেটাই হয়ে রইল বাংলাদেশের বিসর্জনের বেদি। 

আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে সাকিব আল হাসান এসে যেভাবে টস জেতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাইলেন তাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মুদ্রাভাগ্যে জয়ী হওয়াটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিপক্ষে খেলা একাদশে একটাই বদল, সাকিব ফিরেছেন আর তাকে জায়গা করে দিতে বসেছেন তাওহীদ হৃদয়। প্রোটিয়ারা লুঙ্গি এনগিদিকে বসিয়ে নামায় লিজাড উইলিয়ামসকে, টেম্বা বাভুমা থাকলেন বেঞ্চেই। টস জিতে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক এইডেন মার্করাম বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা আমরা যেভাবে খেলেছি, সেভাবেই খেলব।’ অন্যদিকে সাকিব বলেছিলেন, ‘আগে বল করতে খুব একটা অসুবিধা নেই, চেষ্টা করব ওদের যথাসম্ভব অল্পরানের ভেতর আটকে রেখে সেটা তাড়া করতে। সে জন্য আমাদের সেরা ক্রিকেটটা খেলতে হবে।’ অধিনায়কের কথা কেউ রাখেননি। সাকিব নিজেও উদাহরণ গড়ে নেতৃত্ব দিতে পারেননি সামনে থেকে।

দিনের দ্বিতীয় ওভারেই সিøপে দাঁড়িয়ে তানজিদ তামিম ছেড়েছেন রেজা হেনড্রিকসের ক্যাচ। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে কাট করতে গিয়ে সিøপে দাঁড়ানো তামিমের হাতে ক্যাচ দিয়েছিলেন, সেটা হাতে জমাতে পারেননি তামিম। যদিও জীবন পেয়ে খুব বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেননি হেনড্রিকস, সপ্তম ওভারের প্রথম বলে শরিফুল ইসলামের বলে হয়েছেন বোল্ড। করেছেন ১২ রান। ততক্ষণে অবশ্য ৩৩ রান উঠে গেছে স্কোরবোর্ডে। পরের ওভারে মেহেদি হাসান মিরাজের বলে রাসি ফন ডার ডুসেন মাত্র ১ রানে আউট হলে দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর দাঁড়ায় ৮ ওভার শেষে ৩৬ রানে ২ উইকেট। অনেকেই তখন আশা বেঁধেছিলেন, আবার বুঝি এলো সেই সোনা ঝরা দিন! কিন্তু হায়, বিশ^কাপ শেষে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া কুইন্টন ডি কক যে যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাওয়ার পণ করেছেন। এই বিশ^কাপে নিজের তৃতীয় সেঞ্চুরি করেছেন প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান, সেই সঙ্গে এবারের আসরের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিকও বনে গেছেন। ইনিংসের সূচনায় নেমে ৪৬তম ওভারের প্রথম বলে আউট হওয়ার আগে ১৪০ বলে খেলেছেন ১৭৪ রানের ইনিংস। ১৫টা চারের মারের পাশাপাশি ৭ খানা ছক্কা। ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলার পথেই হাঁটছিলেন। হাসান মাহমুদের ফুলটস বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে নাসুম আহমেদের হাতে ধরা পড়ার মাধ্যমে সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যু, ১৭৪ করেও যে তাই হতাশা ফুটে উঠেছিল আউট হওয়ার পর!

হেইনরিখ ক্লাসেন বোলারদের কাছে আতঙ্কের  প্রতিশব্দ হয়ে উঠছেন। মাত্র ৪৯ বলে ৯০ রান করেছেন, ২ খানা চারের পাশাপাশি মেরেছেন ৮ খানা ছক্কা। শেষ ওভারে গিয়ে আউট হয়েছেন ক্লাসেন। অন্য প্রান্তে ডেভিড মিলারের ১৫ বলে ৩৪* আর মার্করামের দায়িত্বশীল ৬০ রানে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ৩৮২ রান। আগের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৭টা রান বেশি করেছিল প্রোটিয়ারা, বাংলাদেশের বোলারদের এটাই হয়তো একমাত্র সান্ত¡নার জায়গা।

সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটা দক্ষিণ আফ্রিকারই। বাংলাদেশ তাদের বিপক্ষে ৩৮৩ করে ফেলবে, সেটা বম্বে ছবির কোনো চিত্রনাট্যকারও বোধ হয় ভাববেন না। এই বিশ্বকাপে যে দলের সামর্থ্য আড়াইশো রানের আশপাশে, কোনো জুটিতেই এখনো শতরান পেরোয়নি, তাদের নিয়ে ৩৮৩ তাড়ার স্বপ্ন দেখার চেয়ে অলৌকিক কিছু হয় না। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সেই স্বপ্ন দেখাতেও যাননি। শুরুতেই শেষ করে দিয়েছেন সব রোমাঞ্চ। মার্কো ইয়ানসেনের শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিলেন ১৭ বলে ১২ রান করা তানজিদ তামিম, পরের বলেই লেগসাইডে বেরিয়ে যাওয়া বলে খোঁচা লাগিয়ে আউট হলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। পরের ওভারে এগিয়ে এসে চালিয়ে খেলতে গিয়ে লিজাড উইলিয়ামসের বলে ক্যাচ দিলেন সাকিব আল হাসান। ৩১ রানেই নেই ৩ উইকেট। এরপর আসলে অন্তিম মুহূর্তের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মাঝে ব্যতিক্রম মাহমুদউল্লাহ। অনেকটা লাইফ সাপোর্টের মতো বাংলাদেশের ইনিংসের আয়ু খানিকটা বাড়িয়েছেন। সেই সঙ্গে বিশ^কাপে নিজের কিছু বাড়তি অর্জন। যদিও এই রান স্রেফ পরিসংখ্যানের খাতায় শোভা বাড়াবে, ম্যাচের প্রেক্ষাপটে কোনো সম্ভাবনাই যোগ করে না। আগের চল্লিশোর্ধ্ব ইনিংসগুলোও তাই ছিল। ২০১৯ বিশ^কাপে অস্ট্রেলিয়ার ৩৮১-৫ রান তাড়া করায় মাহমুদউল্লাহ হাফসেঞ্চুরি করেছিলেন। কাল দক্ষিণ আফ্রিকার ৩৮২-৫ তাড়া করাতে মাহমুদউল্লাহ করলেন সেঞ্চুরি (১১১ বলে ১১১ রান)। বিশ^কাপে এটি তার তৃতীয় সেঞ্চরি। অস্ট্রেলিয়ার সেই ম্যাচে ওয়ার্নারের ১৬৬ ছিল সেই বিশ^কাপে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ, কাল ডি ককের ১৭৪ রানও এই বিশ^কাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

কাল মেহেদী মিরাজের আগেই ব্যাট করতে নেমেছিলেন মাহমুদউল্লাহ, যা নিয়ে এত কথা। ওপরের দিকের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানই জলদি আউট হয়ে যাওয়ায় সেই মিরাজ, নাসুম আর হাসান মাহমুদদের নিয়েই ব্যাট করতে হয়েছে তাকে। সেই সংগ্রামটাও থেমেছে একটা সময়ে। ৪৬.৪ ওভারে ২৩৩ রান অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। হেরেছে ১৪৯ রানে।

বিশ^কাপ জয়ের স্বপ্ন দেখাদের চন্ডিকা হাথুরুসিংহে বলেছিলেন ঘুম থেকে জেগে উঠতে, সাকিব ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন একবারে বিশ^কাপ শেষে হতাশ হতে। দুঃস্বপ্নের মতো বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে ঘুম ভাঙিয়েছে অনেকের; তবে দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের মতো কুম্ভকর্ণদের ঘুম এতে ভাঙবে কি না, সন্দেহ। অন্যদিকে সাকিবের কথার উত্তরে বলা যায়, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ কার্যত শেষ। ঠিক যেন প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপূজা বিসর্জনের মতোই। প্যান্ডেল আর শামিয়ানা থাকলেই তো আর উৎসব হয় না, তেমনি বিশ্বকাপে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে পরের ম্যাচগুলোতে আর বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ থাকে না।