সংকটেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে টেলিকম খাত

দেশে ডলার ও অর্থনীতিতে বড় সংকট থাকলেও টেলিকম খাতের কোম্পানিগুলোর মুনাফায় এর কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং সংকটের এ সময়টাতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিকম খাতের দুই কোম্পানির মুনাফায় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৩ হিসাববছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। একই সময়ে টেলিকম খাতের তালিকাভুক্ত অন্য কোম্পানি রবি আজিয়াটার নিট মুনাফা ২০০ শতাংশ বেড়েছে।

চলতি ২০২৩ হিসাববছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত রবি আজিয়াটার নিট মুনাফা হয়েছে ১৭২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। একই সময়ে রবির চেয়ে গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা হয়েছে ১৬ গুণ বেশি, ২ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

চলতি বছর টেলিকম খাতের দুই কোম্পানির টার্নওভার বেড়েছে। চলতি হিসাববছরের ৯ মাস শেষে ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সেবা থেকে গ্রামীণফোনের আয় হয়েছে ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে রবি আজিয়াটার আয় হয়েছে ৭ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে গ্রামীণফোনের পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। চলতি বছরে গ্রামীণফোনের আর্থিক ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত কোম্পানিটির আর্থিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৫৩ কোটি টাকা। লিজসহ বিভিন্ন দায়ের সুদ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে বিরোধের জেরে কোম্পানিটি এ সময়ে ৪২২ কোটি টাকারও বেশি সঞ্চিতি হিসেবে রেখেছে। আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির এটিই প্রধান কারণ। তারপরও কর পরিশোধের পর গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৭ লাখ ৬১ হাজার নতুন গ্রাহক গ্রামীণফোনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, ফলে বছরের প্রথম ৯ মাস শেষে গ্রামীণফোনের গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ২০ লাখ। গ্রামীণফোনের মোট গ্রাহকের ৫৭ দশমিক ৯ শতাংশ গ্রাহক অথবা ৪ কোটি ৭৫ লাখ গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছেন।

গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমান বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও ডেটা সেগমেন্টসহ রাজস্ব ও ইবিআইটিডিএ উভয় ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির কারণে ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। সহজ ডেটা পোর্টফোলিও, পারসোনালাইজড অফার ও অত্যাধুনিক ডিজিটাল সক্ষমতার মাধ্যমে আমরা আমাদের গ্রাহকদের নানা ধরনের চাহিদা পূরণে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বারোপ করেছি, যে কারণে আমাদের গ্রাহকদের ডেটা ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।’

গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ইয়েন্স বেকার বলেন, ‘জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতিসহ সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ শক্তিশালী ইবিআইটিডিএ মার্জিন বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। আগের প্রান্তিকে ৫.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পরে বছরপ্রতি মোট রাজস্ব বেড়েছে ৬.৩ শতাংশ। সাবস্ক্রিপশন ও ট্র্যাফিক রাজস্বে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিই মূলত মোট রাজস্বের প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। ডেটা রাজস্বে ধারাবাহিক দুই সংখ্যার প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জনে মূল ভূমিকা রেখেছে। ১৮.২ শতাংশ মার্জিন নিয়ে তৃতীয় প্রান্তিকে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৪৭.২ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মোট আয়ের ৮০ শতাংশ কর, ভ্যাট, ডিউটি, লাইসেন্স ও তরঙ্গ বরাদ্দ ফি প্রভৃতি বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।’

এদিকে চলতি হিসাববছরের ৯ মাসে রবি আজিয়াটার পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি। এ সময়ে কোম্পানিটির সুদ ব্যয় বাড়লেও মুদ্রা বিনিময় হারের লোকসান কমেছে। ২০২২ সালের প্রথম ৯ মাসে মুদ্রা বিনিময় থেকে রবির লোকসান হয়েছিল ৩১১ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের একই সময়ে ১২০ কোটি টাকায় নেমেছে। এর ফলে লভ্যাংশে কর্মীর হিস্যা ও কর পরিশোধের পর কোম্পানিটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৭২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৬ কোটি টাকা।