তল্লাশি তদন্তের ক্ষমতা পাচ্ছে না আনসার!

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে গ্রেপ্তার, অভিযান, মামলার তদন্ত ও মালামাল জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পুলিশ। সাধারণের মধ্যেও এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত আইনটি সংশোধন হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

গত সোমবার প্রস্তাবিত আনসার ব্যাটালিয়ন আইন-২০২৩ বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এটি তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে সংসদীয় কমিটিকে বলা হয়েছে।

আনসারকে ক্ষমতা দেওয়া প্রস্তাবিত আইন বাতিল করতে বৈঠকের পর বৈঠক করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। জাতীয় সংসদেও আইনটির ধারার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন জাতীয় পার্টির এক সদস্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যরা পুলিশকে আশ^াস দিয়ে বলেছেন, আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধান করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশ ও আনসারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক বসেছেন। বৈঠকে নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন কর্মকর্তারা। পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, শুধু সন্দেহভাজনকে আটকের ক্ষমতা রেখে সংশোধন হতে যাচ্ছে প্রস্তাবিত আনসার ব্যাটালিয়ন আইন-২০২৩। সেখানে আনসারকে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও স্থানে তল্লাশি এবং জব্দের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি বাদ দেওয়া হবে আভাস পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশ এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষার বাহিনীর (আনসার ভিডিপি) শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান বলে বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আলোচনা চলছে। বিষয়টি দ্রুত সময়ে সমাধান করা হবে বলে আশ^াস দেওয়া হয়েছে। পুলিশের তিনটি দাবির বিষয়ে অনেকেই একমত হচ্ছেন। আবার কেউ বিরোধিতা করছেন। তবে আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তন হবে বলে পুলিশকে আশ^স্ত করা হয়েছে।

এদিকে আনসার বাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। আনসার বাহিনীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে কি না প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা একটা মিস ইনফরমেশন, আপনাদের ভুল ধারণা। এ প্রশ্নটা ভুল ধারণা প্রেক্ষিতে করছেন। আনসার বাহিনীকে গ্রেপ্তার করার পারমিশন কখনো দেওয়া হয় না, আজকেও দেওয়া হয়নি এবং কোনো আইন দ্বারা সেটা দেওয়ার কোনো ক্ষমতা আমাদের নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধির আওতার ভেতরে থেকে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে হবে। এটা হলো মূল কথা। তাদের যে আইনটি আসছে, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার শেষ পর্যায়ে এখানে এসেছে। এটা আমাদের স্থায়ী কমিটিতে গেছে, স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। সেখানো কোনো শব্দ, বাক্য যদি এ ধরনের প্রশ্নের অবতারণা করে তবে সেগুলো কারেকশন (সংশোধন) হবে। এখানে প্রচলিত আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো বাক্য যদি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে সেটি তারা পরিশুদ্ধ করবেন। যেকোনো বাহিনীকে প্রচলিত ফৌজদারি আইন মেনে কাজ করতে হয়।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি একটি কথা স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, এখানে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। এখানে আমি শুনতে পাচ্ছি অনেক জায়গায় প্রচারিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে পুলিশের ক্ষমতা আনসার নিয়ে যাচ্ছে এগুলো প্রোপাগান্ডা, সব মিস ইনফরমেশন। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমরা সবসময় বলি আমাদের দুটো ফোর্সই আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সদস্য।’

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত আনসার ব্যাটালিয়ন আইন-২০২৩ নিয়ে গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দুপক্ষের সভা হয়। সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) কামরুল আহসান, এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামসহ শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ও আনসারের পক্ষে আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল একেএম আমিনুল হক এবং আনসারের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে প্রস্তাবিত ব্যাটালিয়ন আনসার আইনের খুঁটিনাটি সব বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় প্রস্তাবিত আনসার ব্যাটালিয়ন আইন-২০২৩ এর ৭ ও ৮ ধারায় গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা বিষয়ে আপত্তি করে পুলিশ। প্রস্তাবিত আইনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন আনসার মহাপরিচালক।

সভায় উপস্থিত একজন কর্মকর্তা গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আনসার মহাপরিচালক যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা গ্রেপ্তার, তল্লাশি করবে। এটা শুধু ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের জন্য। তারা পার্বত্য অঞ্চলসহ অনেক সংবেদনশীল এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। এ ক্ষমতা তাদের থাকা জরুরি। অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতাসহ যেসব ধারা পুলিশের বিভিন্ন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ওইসব বিষয়ে আপত্তি তুলে ধরা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রস্তাবিত আইনের ধারা-৮-এ ব্যাটালিয়ন সদস্যদের এখতিয়ার ও ক্ষমতা বিষয়ে বলা হয়েছে। ধারা-৭-এ বলা হয়েছে, ‘উল্লিখিত কার্যাবলি সম্পাদনকালে কোনো ব্যাটালিয়ন সদস্য তাহার সম্মুখে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমোদনক্রমে অপরাধ সংঘটনকারীকে আটক করে অবিলম্বে পুলিশের নিকট সোপর্দ করবে এবং ক্ষেত্রমতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট অথবা এদত উদ্দেশ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশক্রমে উক্ত আটক ব্যক্তির দেহ তল্লাশি, কোনো স্থানে প্রবেশ ও তল্লাশি এবং মালামাল জব্দ করতে পারবে।’

পুলিশ বলেছে, এ ধারাটির প্রয়োজনীয়তা নেই। তারা বিষয়টিকে ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে বলেছে, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আটক, তল্লাশি ও জব্দ তালিকা প্রস্তুত করতে পারেন সাব-ইন্সপেক্টরের নিম্ন নহেন এমন কোনো পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি বিচারের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রস্তুত করা জব্দ তালিকাই আদালতে গ্রহণযোগ্য। তল্লাশি ও আলামত জব্দ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ধারার আলোকে ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়ে কার্যসম্পাদন করে থাকেন।

সভায় উপস্থিত পুলিশের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৭ ও ৮ নম্বর ধারা ছাড়াও আইনে আরও বেশ কিছু বিষয় আছে, যা আনসার বাহিনীর জন্য। পুলিশ শুধু এ দুটি ধারার বিরোধিতা করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনটি যেহেতু সংসদীয় কমিটিতে আছে, তাই এটা সংশোধনের সুযোগ আছে। মন্ত্রীর ওপর পুলিশ বাহিনী আস্থা রেখেছে। তারা আশা করছে, পুলিশের আইন ও প্রবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ধারা থাকবে না।

আনসারের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পুলিশের বিশেষ ইউনিট র‌্যাবসহ অন্য ইউনিটগুলোর আদলে অপারেশন করতে দীর্ঘদিন ধরেই বাহিনীটি চেষ্টা চালাচ্ছে আইন পরিবর্তন করতে। নানা প্রতিকূলতার কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ২০১৭ সালে একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়ার পর চাপা পড়েছিল। পুলিশের কারণে ফাইলটি এতদিন সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। এখন আনসার বাহিনী চাচ্ছে তাদের প্রস্তাবগুলো সংসদে পাস করা হোক।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তো রাষ্ট্রের জন্য কাজ করছি। পুলিশ কেন বিরোধিতা করছে তা বুঝতে পারছি না। দেশের স্বার্থে পুলিশই আমাদের সহায়তা করা উচিত। এখন আমরা শুনছি হয়তো আইনের কিছু ধারা পরিবর্তন করা হবে। তার মধ্যে জব্দ ও তদন্তের বিষয়টি হয়তো বাদ দেওয়া হবে। আটকের বিষয়টি থাকবে বলে মনে হচ্ছে।’

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আপত্তি তুলে সরকারের শীর্ষ মহলকে জানিয়েছে, ধারাগুলোর প্রয়োজনীয়তা নেই। বিষয়টি ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি বিচারের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রস্তুত করা জব্দ তালিকাই আদালতে গ্রহণযোগ্য। তল্লাশি ও আলামত জব্দ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ধারার আলোকে ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়ে কার্যসম্পাদন করে থাকেন।