দুই পক্ষের এক লক্ষ্য

হাজার গ্রেপ্তারের দাবি বিএনপির

সরকার পতনের এক দফার দাবি আদায়ে আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠিতব্য মহাসমাবেশকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দিনরাতে সার্বক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির দাবি, গত তিন দিনে সারা দেশে তাদের অন্তত এক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, রাজধানীতে গত পাঁচ দিনে বিভিন্ন মামলার পরোয়ানাভুক্ত ৩১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসার পথে পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়েন বাসযাত্রীরা। সাভার, আমিনবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বাস থামিয়ে যাত্রীদের ব্যাগ পরীক্ষা করে।

এদিকে মহাসমাবেশ ঘিরে পুলিশ ব্যাপকহারে তল্লাশি ও গ্রেপ্তার করছে বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৮ অক্টোবর কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দিনরাতে নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করছেন। এমনিতেই নেতাকর্মীরা ঘরবাড়িতে থাকতে পারছেন না। এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করছেন। তবে মহাসমাবেশ সফল করতে আমরা সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন। আত্মীয়স্বজন কিংবা নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনকে গত বুধবার গভীর রাতে রাজধানীর সিপাহীবাগের নবীনবাগ ক্যান্ট রেস্টুরেন্টের বিল্ডিংয়ে তার ভাইয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।

বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘মহাসমাবেশ সামনে রেখে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করতে দিনরাতে ২৪ ঘণ্টাই অভিযান পরিচালনা করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আশপাশের বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সাধারণ নাগরিকদের হয়রানি করছেন। গত বুধবার আমার পল্লবীর ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনার সময় বিল্ডিংয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি আশপাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের মোবাইল ফোন চেক করেছেন।’

গত বুধবার রাতে মিরপুর পল্লবীতে আমিনুল হকের বাসায় অভিযান চালিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। একই রাতে মিরপুর থানা বিএনপির সভাপতি ও মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য আবুল হোসেন আবদুল এবং তার ছেলে আবদুর রহমান রনিকে শ্যামলীর একটি বাসা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সাইদুর রহমান মিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বুধবার রাতে সাবেক যুবদল নেতা শরীফ হোসেনকে না পেয়ে তার বড় ভাই মো. জাকির হোসেনকে ওয়ারী থানার পেন্ডিং মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যদিও তার নামে কোনো মামলা নেই। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাজী মনির হোসেনকে গত বুধবার রাতে কাকরাইল মোড় থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।’

এর আগে গত রবিবার মধ্যরাতে তার খিলগাঁওয়ের বাসভবনের সামনে থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও খিলগাঁও থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইউনুস মৃধাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তবে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপারেশনস) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশকে কেন্দ্র করে আমরা কাউকে গ্রেপ্তার করি না। ঢাকা মহানগর পুলিশের আটটি বিভাগের ডিসি ও থানার ওসিদের বলা হয়েছে যারা ওয়ারেন্টের বা এফআইআরভুক্ত বা সন্দেহভাজন বা তদন্তে প্রাপ্ত আসামি, অথবা নাশকতা সৃষ্টি করতে কোনো স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স থাকে, শুধু তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য। কোনো সাধারণ জনগণকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করার সুযোগ আইনগতভাবে পুলিশের নেই এবং ডিএমপি এ ধরনের বেআইনি কাজ করে না।’

আমাদের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জেলা কৃষক দলের সদস্য মেহেদী হাসান সাকবরকে বুধবার গভীর রাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশের হেফাজতে তার মৃত্যু হয় বলে দাবি করেছে বিএনপি।

নিহত মেহেদী হাসানের স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার কাজল অভিযোগ করে বলেন, ‘বুধবার রাতে আমার স্বামী নিজ ঘরেই ঘুমাচ্ছিল, রাত আনুমানিক ২টার দিকে আমার বাড়ির গেটে জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে ডাকাডাকি করছিল। আমি সাকবরকে ডেকে তুলে বলি, পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। এ কথা শুনে সাকবর ঘর থেকে বেরিয়ে পেছনের বারান্দার দরজা খুলে পাশের বাড়িতে চলে যায়। ওই বাড়ির লোকজন বাইরের লাইট বন্ধ করে দেয়। পুলিশ ওই বাড়িতে ঢুকে যায় এবং সেখানে আমার স্বামী সাকবরকে ধরে ফেলে। পরে পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখতে পাই আমার স্বামী মাটিতে পড়ে আছে। কয়েকজন পুলিশ তাকে ঘিরে রেখেছে।’

তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর দৌলতপুর থানা পুলিশের এসআই মাসুম বিল্লাহ এবং শামসুল আলম একটি সাদা কাগজে তার স্বাক্ষর নিয়ে সাকবরকে রেখেই চলে যায়।

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গত বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য আবদুস সামাদ মিলারসহ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ১৬ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, খুলনায় দুদিনে ৫২ নেতাকর্মীকে খুলনা জেলা ও মহানগর পুলিশ আটক করেছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে ১২ জন এবং বুধবার রাতে আরও ৪০ জনকে আটক করা হয়। বিএনপির আরও অভিযোগ, নেতাকর্মীদের আটকের পর পুলিশ পেন্ডিং মামলায় গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে। খুলনার পুলিশ সুপার সাঈদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তাদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’

গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মহাসমাবেশ সফল করতে বিএনপির প্রস্তুতি সভা থেকে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করেছে টঙ্গী পূর্ব থানার পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি সালাহ উদ্দিন সরকারের টঙ্গীর বাসভবন প্রাঙ্গণ থেকে এসব নেতাকর্মীকে আটক করা হয়।

সাভার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর প্রবেশদ্বার আমিনবাজার চেকপোস্ট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে ঢাকাগামী বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। এ সময় গাড়ির ভেতরে উঠেও জিজ্ঞাসাবাদসহ সন্দেহজনক ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে থাকা ব্যাগ ও ডায়েরি তল্লাশি করছে পুলিশ। তল্লাশি চালানো যানবাহনের মধ্যে ছিল ঢাকাগামী দূরপাল্লার বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাস, গণপরিবহন, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল।

তল্লাশির বিষয়ে জানতে চাইলে আমিনবাজার চেকপোস্টে থাকা ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী ২৮ তারিখে যেহেতু রাজধানীতে দুটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ আছে, সেহেতু কেউ যেন ঢাকায় প্রবেশ করে কোনো নাশকতা কিংবা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই পুলিশের এই চেকপোস্ট কার্যক্রম চলছে। এটা চলমান থাকবে।’ তবে চেকপোস্ট থেকে কাউকে আটক করা হয়নি বলেও জানান তিনি।

পাশাপাশি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জাহাঙ্গীরনগর এলাকায় সকাল থেকেই ঢাকা জেলা ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে চেকপোস্ট বসিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি কার্যক্রম চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৪)। এ সময় চেকপোস্টে যানবাহনের ফিটনেস, বৈধ লাইসেন্স ও হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘মহাসমাবেশে যোগ দিতে ইতিমধ্যেই নেতাকর্মীরা ঢাকায় চলে এসেছেন। নিজ নিজ দায়িত্বে তারা বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যেকোনো মূল্যে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। বসে যাওয়া কিংবা ঢাকায় অবস্থান করার কোনো চিন্তাভাবনা আমাদের নেই।’