চলাচলের দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান হবে, তিন মিনিটের ম্যাজিকে পাড়ি দেওয়া যাবে কর্ণফুলী নদী। এ নদীর তলদেশে ৩ দশমিক ৩১ কিলোমিটারের টানেল চট্টগ্রাম শহরাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে আনোয়ারা উপজেলাকে। এতে চট্টগ্রাম-আনোয়ারা যোগাযোগ সহজতর হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলের এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বিস্তারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। টানেলসহ প্রকল্পের মূল দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
গতকাল বৃহস্পতিবার দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ‘রোড টানেল’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল বাসে করে পার হয় দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদক। তখন দেখা গেছে, ২৮ অক্টোবর টানেলের উদ্বোধন উপলক্ষে সাজানো হয়েছে পুরো প্রকল্প এলাকা। সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ও সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) প্রকৌশলীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের তদারকি করতে কিছুক্ষণ পরপর গাড়িতে চড়ে টানেল পাড়ি দিচ্ছেন। তাদের তিন মিনিটে টানেল পাড়ি দিতে দেখা গেছে। আর সাংবাদিকদের বহন করা বাসটি ছবি ও ভিডিও ধারণের সুবিধার্ধে ধীরগতিতে চলেছে। তাদের গাড়ি গতকাল দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে টানেলে ঢুকে ১টা ৩৮ মিনিটে অর্থাৎ ৭ মিনিটে আনোয়ারা প্রান্তে পৌঁছায়।
বৃহস্পতিবার ‘কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন সড়ক টানেল প্রকল্প’ এলাকায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত টানেল নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।’
প্রকল্প বাস্তবায়নে কী কী চালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাঝ নদীতে কাজ করার সময় টানেলের কিছু অংশ দেবে যাচ্ছিল। এজন্য চার মাস কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরে চীনের বিশেষজ্ঞদের এনে ওই সমস্যার সমাধান করে বাকি কাজ দ্রুতই শেষ করা হয়েছে।’
টানেল নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা সমালোচনা করছেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা সমালোচনা করছেন। মনে রাখতে হবে, বইয়ে সবকিছু লেখা থাকে না। অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখতে হয়। আমার ৩৯ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমাদের কাছে তো তেমনটি মনে হচ্ছে না। তাছাড়া সব প্রকল্পে তৎক্ষণাৎ সব সুবিধা মেলে না, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। উন্নত দেশে এমন হাজারও নজির আছে। বঙ্গবন্ধু টানেল হওয়ায় চট্টগ্রাম শহরাঞ্চল বিস্তৃত হবে।’
তিনি বলেন, ‘গাড়ির গতি ৮০ কিলোমিটার ধরে টানেল তৈরি করা হয়েছে। তিন মিনিটে অনায়াসে টানেল পাড়ি দেওয়া যাবে। ২২ টনের বেশি ওজনের যানবাহনও টানেল দিয়ে চলাচল করতে পারবে। আর ৯ মাত্রার ভূমিকম্পসহনীয় করে টানেল তৈরি করা হয়েছে।’
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানায়, মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩১ কিলোমিটার, টানেল টিউবের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার, টানেল টিউবের সংখ্যা ২টি, ক্রস প্যাকেজের সংখ্যা ৩টি, পানির উপরিতল থেকে টানেলের সর্বোচ্চ গভীরতা ৪২ দশমিক ৮০ মিটার, নদীর তলদেশ থেকে টানেলের গভীরতা ৩১ মিটার, টানেলের বাইরের ব্যাস ১১ দশমিক ৮০ মিটার, টানেলের ভেতরের ব্যাস ১০ দশমিক ৮০ মিটার, টানেলের ভেতরে রয়েছে দুই লেনবিশিষ্ট সড়ক।
তারা জানান, ‘ওয়ান সিটি অ্যান্ড টু টাউন’ হিসেবে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কে সংযুক্তিসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে টানেল নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউন টাউনকে যুক্ত করা ও উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত করা, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার নতুন সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা ও কর্ণফুলী নদীর ওপরের দুটি ব্রিজের ওপর থেকে গাড়ির চাপ কমিয়ে নতুন সংযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। চীন সরকারের ঋণসহায়তা ৬ হাজার ৭০ কোটি এবং বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ ৪ হাজার ৬১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। টানেলের সব খরচ চীন সরকার বহন করেছে। জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য খরচ বাংলাদেশ সরকারের।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারা প্রান্তে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চল ও পর্যটনের বিকাশসহ চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম অক্ষুণœ রাখা। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে পলি জমার সমস্যা নিরসনে পতেঙ্গা-কাফকো মোহনায় সেতুর বদলে টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
এ টানেল নির্মাণের ফলে শহরের পূর্বপ্রান্তের সঙ্গে চট্টগ্রামবন্দর ও বিমানবন্দরের সংযোগ স্থাপিত হবে। চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে ওইসব স্থানে যাওয়া যাবে। এর ফলে চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমবে। রাজধানী ঢাকা ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের যোগাযোগ সহজ হওয়ার ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে ও রপ্তানি বাড়বে। দারিদ্র্য দূরীকরণসহ ব্যাপকমাত্রায় আর্থসামাজিক উন্নতি হবে।
২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের এক জনসভায় কর্ণফুলী নদীতে টানেল তৈরির ঘোষণা দেন। ২০১১ সালে টানেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা শুরু হয়। ২০১৪ সালের ৯ জুন চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জি-টু-জিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সমঝোতা চুক্তি সই করেন। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী টানেল বোরিং কাজের উদ্বোধন করেন। আগামীকাল শনিবার (২৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন।