গাজা দখলের চূড়ান্ত মহড়ায় ইসরায়েল

গাজা উপত্যকায় ফের ট্যাংক নিয়ে প্রবেশ করেছিল ইসরায়েলি সেনারা। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, গত বুধবার রাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালিয়েছে তারা। আর এ অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে ট্যাংক। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এ অভিযান ছিল আসন্ন মূল স্থল অভিযানের প্রস্তুতি। বুধবার রাতে গাজায় অভিযান চালানোর ব্যাপারে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, এটি যুদ্ধের পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতির অংশ। নিজেদের কার্যক্রম শেষ করে সেনারা ওই এলাকা ছেড়ে চলে আসেন।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস বলছে, বুধবার রাতে ইসরায়েলের হামলায় তাদের হাতে জিম্মিদের অন্তত ৫০ জন মারা গেছেন। গতকাল মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসাম ব্রিগেডস জিম্মিদের প্রাণহানির এ তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে গত ২২ অক্টোবর গাজার খান ইউনিসে এ ধরনের অভিযান চালাতে ট্যাংক নিয়ে প্রবেশ করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। তখন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের অতর্কিত হামলার মুখে পড়েছিল তারা। তখন হামাস জানিয়েছিল, তারা ইসরায়েলিদের দুটি সামরিক বুলডোজার ও একটি ট্যাংক লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এরপর সেখান থেকে সামরিক যান রেখে পালিয়ে যায় ইসরায়েলি সৈন্যরা।

এদিকে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল বলেছে, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর নির্বিচার হামলায় ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানির সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে গেছে। নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ৭ হাজার ২৮ জনে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৯১৩ শিশু, ১ হাজার ৭০৯ নারী ও ৩৯৭ জন বয়স্ক নাগরিক রয়েছেন।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, গাজায় নিহত মানুষের সংখ্যা নিয়ে তার সংশয় রয়েছে। তিনি ফিলিস্তিনিদের দেওয়া তথ্যে ভরসা রাখতে পারেন না।

তবে হতাহতের হিসাব রাখা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও বলছে, গত ২০ দিন ধরে চলে আসা এই যুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা হয়তো প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। এ সময় আহত হয়েছেন ১৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর হিসাব বলছে, হামাসের হামলায় ইসরায়েলিদের প্রাণহানির সংখ্যা ১ হাজার ৪০৫ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ৩০৮ সৈন্য ও ৫৮ পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। এ ছাড়া হামাসের অব্যাহত হামলায় ইসরায়েলে আহত হয়েছে আরও পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।

দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি হামলায় অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, উপত্যকার প্রায় ৩০ শতাংশ হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। এসব হাসপাতালে আহত ও মুমূর্ষু রোগীদের আর চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৩৫টি হাসপাতালের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ (১২টি) এবং ৭২টি স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের প্রায় দুই তৃতীয়াংশই (৪৬টি) বন্ধ হয়ে গেছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষয়ক্ষতির শিকার অথবা জ¦ালানি সংকটের কারণে এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ হয়ে পড়েছে।

গত ৭ অক্টোবর হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক দিন পর গাজা উপত্যকায় সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েল। এই অবরোধ আরোপের কারণে গাজায় বিদ্যুৎ, খাবার, ওষুধ, পানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর চালান সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। জাতিসংঘসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ গাজায় ইসরায়েলের সর্বাত্মক অবরোধের তীব্র সমালোচনা করে সেখানে মানবিক ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

ইতিমধ্যে কয়েক দফায় খাবার, পানি, ওষুধসহ অন্যান্য কিছু পণ্য সামগ্রীবাহী ট্রাককে মিসরের রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে ইসরায়েল। বুধবার জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, জ¦ালানির তীব্র সংকটের কারণে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে গাজা। এই উপত্যকায় জ¦ালানির সরবরাহের অনুমতি দেওয়া না হলে জাতিসংঘ ত্রাণ তৎপরতা বন্ধ করে দেবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে সংস্থাটি।