শিল্পের খেলাপি বাড়লেও কমছে কৃষিতে

দেশের ব্যবসায়ীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না। এতে খেলাপি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমান ব্যাংক খাতের খেলাপি ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। যদিও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের হিসাব করলে এটি ৩০ শতাংশের বেশি। তবে অন্যান্য ঋণের তুলনায় কৃষিতে কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে ব্যাংক। এ খাতটিতে তুলনামূলক খেলাপি কম এবং তা আরও কমতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে কৃষি খাতে খেলাপি মাত্র ৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা, যা খাতটিতে বিতরণ করা ঋণের মাত্র ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ। এক মাস আগেও এই খেলাপি ছিল ৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে কৃষি খাতে খেলাপি কমেছে দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, কৃষকরা কখনো ঋণ জালিয়াতি করেন না। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে মাঝেমধ্যে সমস্যায় পড়লেও তাদের মধ্যে ঋণ ফেরত দেওয়ার তাগিদ থাকে। দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপের মতো ঋণখেলাপির প্রবণতা তাদের মধ্যে একেবারেই নেই। মাত্র ৫ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার ঋণ আদায় চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মামলা করেছে ৭৪ হাজারের বেশি।

তথ্য বলছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৮ হাজার ৮২৪ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮ হাজার ১৪ কোটি টাকা। চলতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত

কৃষি ও পল্লী খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা বকেয়া।

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। এ সময়ে মোট ১ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। ৬৮১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক। আলোচ্য তিন মাসে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৪৮৮ কোটি টাকা, রাজশাহী

কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৪৪৬ কোটি এবং আইএফআইসি ব্যাংক ৪৩৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পল্লী ও কৃষি ঋণ বিতরণ করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৩৯৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছর ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যমাত্রার ন্যূনতম ১৩ শতাংশ ঋণ মৎস্য খাতে দিতে হবে। প্রথম তিন মাসে এই খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আর লক্ষ্যমাত্রার অন্তত ১৫ শতাংশ ঋণ দেওয়ার কথা প্রাণিসম্পদ খাতে। আলোচিত সময়ে পশুসম্পদ ও পোলট্রি খাতে বিতরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ২৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ ছাড়া তিন মাস শেষে দারিদ্র্য বিমোচনে ৬৭৭ কোটি, শস্য খাতে ৩ হাজার ৯০৭ কোটি, কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৫৯ কোটি, সেচ যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৪৭ কোটি, শস্য গুদামজাত ও বিপণন খাতে ২৮ কোটি ৪০ টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।

কৃষি ও পল্লী ঋণের চাহিদা বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে মোট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ১২ হাজার ৩০ কোটি টাকা পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংক ২১ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। তিন মাস শেষে রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত ব্যাংকগুলো ২ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকার

কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে। এ ছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৫৯৫ কোটি টাকা। সবমিলে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৭৬ কোটি টাকা।

দেশের ব্যাংকগুলো থেকে গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) কৃষকরা ৩২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। বিপরীতে তারা পরিশোধ করেছেন ৩৩ হাজার ১০ কোটি টাকা। এর আগেও কৃষকরা ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের চেয়ে বেশি পরিশোধ করেছেন। কিছু কিছু ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি বিতরণ করেছে। আবার কিছু ব্যাংক কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রায় অর্জন করতে পারেনি। এ রকম ব্যর্থ ব্যাংকের সংখ্যা আটটি। এমনকি কভিড-১৯ সৃষ্ট দুর্যোগের মধ্যেও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের চেয়ে আদায় হয়েছে বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। ওই বছর কৃষকরা ২৭ হাজার ১২৪ কোটি টাকা ব্যাংকে পরিশোধ করেছেন। দেশের কৃষকদের দেওয়া ঋণ সুবিধার বড় অংশই বিতরণ হচ্ছে এনজিওর মাধ্যমে। ব্যাংক থেকে কৃষকরা ঋণ পান সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সুদে। কিন্তু এনজিওর মাধ্যমে নেওয়া ঋণের সুদহার দাঁড়াচ্ছে ২৫-৩০ শতাংশে।